‘সুপারস্টার’ দানব!

নাইজেরিয়া। বিশ্বকাপ ফুটবলে ৩২ দলের মধ্যে একটি। প্রথম রাউন্ডে ফুটবলে এশিয়ার বাঘ ইরানের সঙ্গে ১-০ গোলে জয়লাভ করেছে। কিন্তু তারপরও দেশটিকে অনেকেই খেলার দিক দিয়ে চেনেন না। পরিচিতি খুব বেশি নয়। ব্রিটেনের সাবেক উপনিবেশ এই দেশটি বিশ্বের তেল উত্পাদনের একটি বড় দেশ। কিন্তু সব ছাপিয়ে নাইজেরিয়া আজ পরিচিত পাচ্ছে জঙ্গি গোষ্ঠী বোকো হারামের কারণে। এক সময়কার স্বল্প পরিচিত জঙ্গিগোষ্ঠী বোকো হারাম এখন বিশ্বমিডিয়ার কল্যাণে হয়ে উঠেছে ‘সুপারস্টার’। তবে সুখ্যাতির নয়, বোকো হারাম এখন নাইজেরিয়ার ‘কুখ্যাত সুপারস্টার’। এমন দিন নেই যে দেশি কিংবা আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে তাদের খবর প্রকাশিত হচ্ছে না। আর বেশিরভাগ সময় খবর প্রকাশিত হচ্ছে স্কুলছাত্রী কিংবা গৃহবধূদের দলে দলে অপহরণের কারণে। নারী অপহরণ এখন হয়ে উঠেছে এই গোষ্ঠীর পরিচিতি পাওয়ার সবচে’ সস্তা কৌশল। দেশ ছাপিয়ে একটি জঙ্গিগোষ্ঠীর পরিচিতির পেছনে দায়ী কিন্তু মিডিয়া। বিশ্ব মিডিয়াই গোষ্ঠীটিকে হলিউডের সুপারস্টার বানিয়ে দিয়েছে। এমনটা মনে করেন কমনওয়েলথ পুরস্কার বিজয়ী লেখক আদাওবি ট্রিসিয়া নাওবানি। বোকো হারাম সম্পর্কে তার মতামত এ রকম: আমার বন্ধুর আট বছরের মেয়ে ট্রিসিয়া নাওবানি। সে কান্নাকাটি করছে। কারণ সে বোকো হারামের প্রকাশিত একটি ভিডিও দেখেছে। সিনেমায় যেমন শত্রুর সঙ্গে সুপারস্টার সংঘর্ষে লিপ্ত হন তেমনি যেন বোকো হারামও করছে। গোষ্ঠীটির নেতা আবু বকর শিকৌ যেন রিয়েলিটি শোতে মেতে উঠেছেন। বলছিলেন আদাওবি ট্রিসিয়া নাওবানি। আদাওবির মতে, এটা ঠিক যে নাইজেরিয়ায় বোমা বিস্ফোরণ এবং ২৩৪ জন স্কুল ছাত্রীর অপহরণের ঘটনা মানুষ জানতে চায়। মানুষ জানতে চায় ছাত্রীদের উদ্ধার কাহিনী। একবার বোমা হামলা করে মানুষকে মারা হচ্ছে এবং আরেকবার জঙ্গিগোষ্ঠীটির ভিডিও এবং অডিও প্রকাশ করে মানুষকে দেখিয়ে আরেকবার বোমা বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। আর গণমাধ্যম এটা ভালোভাবেই প্রচার করছে। বোকো হারাম স্কুল ছাত্রীদের প্রত্যেককে ১২ ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করারও হুমকি দিয়েছে। আর গণমাধ্যমকে এক্ষেত্রে তারা ভালোভাবেই ব্যবহার করেছে। ছাত্রীদের অপহরণের কয়েক ঘণ্টা আগে তারা এর আগের দিন বাস স্টেশনে বোমা হামলার একটি ভিডিও চিত্র প্রকাশ করে। তারা প্রেসিডেন্ট গুডলাক জনাথনকে জানিয়ে দেয়, ‘আমরা তোমার শহরের মধ্যেই আছি। কিন্তু তুমি জান না আমরা কোথায় আছি। তারা এই বলে জানান দেয়, প্রেসিডেন্ট জনাথন: আমরা তোমার চেয়ে শক্তিশালী। আমাদের তুলনায় তোমরা ক্ষুদ্র। আমরা তোমাকে তেমন পাত্তা দেই না। আমরা তোমার বস মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে বোঝাপড়া করি। এমনকি ওবামাকেও অনেক সময় পাত্তা দেই না। কারণ আমরা তাদের চেয়েও বড় কিছু’। বোকো হারামের একটি ছোট্ট হামলাও সারাবিশ্বের গণমাধ্যমের নজর কাড়ে। বিশেষ করে অপহূত বালিকাদের বিষয়টি সারাবিশ্বের মানুষের মধ্যেই আবেগ সৃষ্টি করে। কতজন ছাত্রী এবং তাদের নাম পরিচয় পর্যন্ত এখনো নির্দিষ্ট করতে পারেনি নাইজেরিয়া সরকার। সব ছাত্রীই কী স্কুল থেকে অপহূত হয়েছিল কিনা সেই বিষয়টিও নিশ্চিত নয় কেউ। অথচ মিডিয়া সারা বিশ্বজুড়ে এর প্রচার চালিয়েছে। আর এতে সুযোগ পাচ্ছে বোকো হারাম। সামান্য ঘটনা ঘটিয়ে তারা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হচ্ছে। এজন্য তারা সব সময়ই কিছু একটা ঘটাতে চায়। ছাত্রীদের অপহরণ করার পরই মিডিয়ায় শিরোনাম করা হলো ‘নারী শিক্ষার প্রতি চরম আঘাত এটি’। আর মানুষও সেটি লুফে নিল। অথচ এ ধরনের অপহরণের ঘটনা বিশ্বে অনেক সময় ঘটে থাকে। ২০১২ সালে বোকো হারাম দুটি সংবাদপত্র অফিসে হামলা করে। ওই সময় পত্রিকায় শিরোনাম করা হয়, ‘এই হামলা মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হামলা’। এরপর তারা একটি ভিডিও প্রকাশ করলো এবং ভিডিওতে নাকি প্রেসিডেন্ট জনাথন সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া হলো। সব পত্রিকা এই ভুল সংবাদটি প্রকাশ করলো। অথচ ওই ভিডিওর কোথাও এ ধরনের কোনো চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়নি। আর একটি বিষয়: গুগলে সার্চ দিলেই বোকো হারামের সদস্যদের একে-৪৭ রাইফেল নিয়ে ভিন্ন ধরনের পোশাকে সজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে দেখা যায়। মনে হয় তারা নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করছে এবং তাদের নেতার কৃতিত্বের জানান দিচ্ছে। আর এর মাধ্যমে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির নিজেদের প্রচারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে। এইভাবে তাদেরকে সুপারস্টার না বানিয়ে তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে কিন্তু নানাভাবে মানুষকে জানানো যায় এবং সচেতন করা যায় বলে মনে করেন নাওবানি। বোকো হারামের মূল কাজ পশ্চিমা শিক্ষা থেকে মানুষকে দূরে রাখা। বোকো হারাম অর্থ: ‘পশ্চিমা শিক্ষা হারাম’। তাদের মতে, এই শিক্ষা গ্রহণ করা পাপ। আর এজন্যই যতো হামলা! নাইজেরিয়ার উত্তর এবং কেন্দ্রস্থলের অনেক এলাকার মানুষ এখন বেঁচে আছেন বোকো হারামের দয়ায়! দেশটিতে নিজেদের আদর্শ বাস্তবায়ন করাই তাদের মূল লক্ষ্য। কেন্দ্রের শহর জস, উত্তরের বৃহত্তম শহর কানো, বর্ণো রাজ্যের বিভিন্ন গ্রামে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বোকো হারাম। বোকো হারামের সবেচেয়ে শক্তিশালী এলাকা উত্তর-পূর্বাঞ্চল। হামলা চালিয়েছে রাজধানী আবুজায়ও। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করছে যে তারা বিভিন্ন ধরনের হামলা করতে সক্ষম। জঙ্গিগোষ্ঠীটির হামলায় বহু মানুষকে অকালে প্রাণ দিতে হয়েছে। যেসব এলাকায় সামপ্রদায়িক উত্তেজনা আছে সে সব এলাকায়ই বেশি হামলা করে। তারা খ্রিস্টান ধর্মালম্বীদের লক্ষ্য করেই হামলা চালায় এবং তাদের উচ্ছেদের চেষ্টা চালায়। তাদের হামলায় আল-কায়েদার কৌশল প্রয়োগ করতে দেখা যায়। বোকো হারাম নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা পর্যবেক্ষক জ্যাকব জেন বলেন, বোকো হারামের মূল লক্ষ্য নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা করে বাহিনীকে অকার্যকর করা। আর এতে সহযোগিতা করে ‘আনসারু’ নামের একটি জঙ্গি গোষ্ঠী। তিনি বলেন, ২০১২ সালে তাদের হামলার অন্যতম স্থান ছিল দক্ষিণ এবং মধ্যাঞ্চলে হামলা করা। কারণ এর মাধ্যমে তারা এই অঞ্চলে আনসারুর বিস্তার করতে চেষ্টা করেছিল এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা হ্রাস করতে চেয়েছিল। তিনি জানান, আনসারু ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জস, কাদুনা এবং আবুজাতে ১৫টির মতো বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়েছে। যদিও সেগুলো বোকো হারামের ওপর চাপানো হয়েছে। ওয়াশিংটনের জেমস টাউন ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষক জেন বলেন, বোকো হারাম মধ্যপ্রাচ্য থেকে মুসলিম যুবকদের ঘায়েল করে এবং বর্ণো রাজ্যে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়। তারা বাড়ি ফিরতে পারে। তবে তার আগে তারা তাদের শত্রুদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। সেটা খ্রিস্টান কিংবা সরকার যেই হোক। নাইজেরিয়ায় নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জন ক্যাম্পবেলের মতে, মনে হচ্ছে আনসারু আবার তাদের উপস্থিতির প্রমাণ দিচ্ছে। তবে তাদের দল এবং নেতা সম্পর্কে খুব বেশি একটা জানা যায় না। বোকো হারাম এবং আনসারু অপহরণ এবং ব্যাংক ডাকাতির মাধ্যমে অর্থ জোগাড় করে। এর মাধ্যমে তারা প্রচুর অর্থ আয় করে এবং যুবকদের অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করে। এমনকি নাইজেরিয়ার সরকারি অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্রও তারা চুরি করে বলে জানান ক্যাম্পবেল। জেন মনে করেন, বোকো হারাম আল-কায়েদা ইন দ্য ইসলামিক মাঘরেবের (আকিম) সঙ্গে যুক্ত যা তাদের ধনভাণ্ডারের সিন্দুক পূর্ণ করতে সহযোগিতা করে। ২০১২ সালে আনসারু ফরাসি নাগরিক প্রকৌশলী ফ্রান্সিস কল্লোম্পকে অপহরণ করে। এসময় আকিমও চারজনকে অপহরণ করে। গত বছর তাদের মুক্তি দেয়া হয়। মুক্তির বিনিময়ে আদায় করা হয় ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত বছর উত্তর ক্যামেরনে আনসারু বোকো হারাম এক ফরাসি পরিবারকে অপহরণ করে। ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে তাদের মুক্তি দেয়া হয়। আর এতে সমঝোতা করে আনসারু। প্রেসিডেন্ট জনাথন নাইজেরিয়া, চাদ, ক্যামেরন এবং নাইজারের সমন্বয়ে একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব করেছেন। কিন্তু জেন মনে করেন, এটা সংক্ষিপ্ত একটি পদক্ষেপ। এসব পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবেসিত হবে। এটাতো ইতোমধ্যেই আছে। কিন্তু ভাষাগত সমস্যা, অবিশ্বাস এবং অর্থের অভাবে এটা কাজ করতে পারছে না। নাইজেরিয়া স্বাধীনতার পর অর্ধেক সময়ই সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় ছিল। ১৯৯৯ সাল থেকে দেশটিতে গণতন্ত্র ফিরে আসে। কিন্তু ২০ বছরের কম এই গণতান্ত্রিক দেশটি আবার ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষক জেন। ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীতে কয়েকবার বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছে। ক্যাম্পবেলের মতে, সেনাবাহিনী দেশটির এই অবনতিশীল পরিস্থিতিতে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কারণ তারা ১০ থেকে ১৫ বছর আগের অবস্থানে অর্থাত্ শক্তিশালী অবস্থায় নেই। বাহিনীটি আগের চেয়ে অনেক দুর্বল। কারণ বাহিনীর উচ্চপদস্থরা রাজনীতির মধ্যে ঢুকে গেছে এবং তারা অনেকে প্রেসিডেন্টের কাছাকাছি অবস্থান করছেন। তবে বাইরের কারো সহায়তা পেলে তারা আবার শক্তি অর্জন করে নিজেদের পূর্ব কার্যের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে না এমন নয়, মনে করে ক্যাম্পবেল।