‘উল্টো পথে’ মোদী সরকার?
প্রকাশ : ২৯ জুন ২০১৪, ২২:১৫
বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ হলো ভারত। সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চার এক অনন্য দৃষ্টান্ত বললেও ভুল হয় না। এবারের লোকসভার নির্বাচনে বিরোধী দল বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের বিপুল জয় সে প্রমাণই দেয়। নির্বাচনের আগে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে বিজেপি বেশ কিছু অঙ্গীকার করেছিলো। গত ৭ এপ্রিল দলটির ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে দেখা যায়, দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নসহ দুর্নীতির রাশ টেনে ধরার অঙ্গীকার করেছিলো দলটি। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো, দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা, দেশে আরো একশোটি নতুন শহর প্রতিষ্ঠা, এমনকি বুলেট ট্রেনও চালাতে চেয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুত্ সুনিশ্চিত করা, সবার জন্য বাড়ি, বড় শিল্পের সঙ্গে ছোট ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নসহ কত প্রতিশ্রুতিই না ছিলো। কিন্তু তাদের সরকার গঠনের পর এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের তেমন কোন নজির মিলছে না। বরং বর্তমান সরকারের কিছু পদক্ষেপ হতাশার ছাপ ফেলছে।
গত ২৫ জুন সরকারের এক মাস পূর্তির আগেই রেলের যাত্রী ভাড়া ১৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং পণ্য পরিবহনের ভাড়া ৬ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। এর আগে ডিজেলের দাম লিটারে ৫০ পয়সা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জানায়। ভারতের গণমানুষের যাতায়াতের সবচেয়ে বড় যান হলো রেল। রেলের ভাড়া বৃদ্ধির কারণে সমস্যায় পড়বে ভারতের আম-জনতা। আবার তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে গণপরিবহনের ভাড়াও বাড়ছে। বিরোধীদের দাবি, বিজেপি যখন বিরোধী দলে ছিলো তখন তাদের অবস্থান এক রকম ছিলো। ক্ষমতায় আসার পর তাদের অবস্থান ও কার্যক্রম এখন ভিন্ন।
অথচ, ২০১২ সালে পার্লামেন্টকে পাশ কাটিয়ে কংগ্রেস সরকারের রেলের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছিলেন খোদ নরেন্দ্র মোদী। তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে চিঠি লিখেছিলেন তিনি। রেলের ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহবান জানিয়ে মোদী বলেছিলেন মূল্যবৃদ্ধি-পরিস্থিতি মানুষের সহনসীমা ছাড়িয়ে গেছে। এখন যাত্রী ও মাল পরিবহনের ভাড়া বাড়লে জনগণের দুর্ভোগ আরো বাড়বে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার এক মাস পূর্ণ হতে না হতেই সেই অবস্থান থেকে সরে এসে ভাড়া বাড়াচ্ছেন মোদী।
অতীতে বিজেপির মুখপাত্ররা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ইউপিএ জোট সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে গলা ফাটিয়েছে। পেঁয়াজ, সবজি, ফলের দাম বৃদ্ধির কারণে বার বার কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছে তারা। অথচ দেশটিতে মূল্যস্ফীতি যখন আশঙ্কাজনক তখনই রেলের ভাড়া ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি করা হলো। বিজেপি বলছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ দায়িত্ব তারা রাজ্য সরকারগুলোর উপরই ছেড়ে দিচ্ছে।
বিজেপির অবস্থান শুধু এক্ষেত্রে পরিবর্তিত হয়েছে তা নয়। ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের কোনো প্রধানমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানে অন্য দেশের রাষ্ট্রনেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সেই অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ। নরেন্দ্র মোদীর এ পদক্ষেপকে অনেকেই ইতিবাচক বলে বিবেচনা করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো পাকিস্তান ইস্যুতে বিজেপির এ অবস্থান তাদের বিরোধী দলে থাকার সময়কার অবস্থানের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইউপিএ জোট সরকারের সময় তারা বার বার একটি কথা বলেছে তা হলো, মুম্বাইয়ে ২৬/১১ সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িতদের যতক্ষণ না পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার বিচার করবে না ততক্ষণ তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা উচিত হবে না। অথচ, দায়িত্ব গ্রহণের পরদিন নওয়াজ শরীফের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন নরেন্দ্র মোদী।
দিল্লিতে চলন্ত বাসে যুবতী ধর্ষণের ঘটনায় সমালোচনা ঝড় উঠেছিলো। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়েছিলো ইউপিএ জোট সরকারকে। অথচ মোদী সরকারের প্রতিমন্ত্রী নিহাল চান্দ মেঘওয়ালের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে বিজেপির পক্ষ থেকে। কিন্তু অতীতে মন্ত্রীদের সামান্যতম দুর্ব্যবহারেও তাদের পদত্যাগের দাবিতে সরব ছিলো বিজেপি নেতারা।
বিজেপির এমন অবস্থানে কংগ্রেস নেতা মনীষ তিওয়ারির বক্তব্য হলো, ক্ষমতা আসার পর বিজেপি ইউ-টার্ন করেছে। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে তারা খুব দ্রুতই তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। দিন যত যাবে তাদের অবস্থানে ততটাই পরিবর্তন দেখা যাবে। যার কারণে নিজেকে রক্ষা করা বিজেপির জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, মাত্র ৩০ দিনেই পররাষ্ট্র ও অর্থনীতিতে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে বিজেপি। রেলের ভাড়া ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির অর্থ হলো তারা মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে ব্যর্থ।
সম্প্রতি চিনির দামও বৃদ্ধি করছে বিজেপি সরকার। প্রতি কেজিতে ছয় রুপি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। এলপিজি গ্যাসেরও দাম বাড়ানো হবে বাজেটে। এআইসিসির মুখপাত্র শোভা ওজা বলেন, এটাই কি ‘আচ্ছে দিন (ভালো দিন)’? যে দিনের প্রতিশ্রুতি মোদীর বিজেপি ভারতীয়দের দিয়েছিলো।