প্রগতিশীল এ বিশ্বে নারীরা ঘরে-বাইরে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছেন। ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রেও আজ নারীর বিচরণ যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে অবাক হলেও সত্য যে, সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতে তথা স্টেম শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে কেবল ৩০ শতাংশ নারী এ খাতে জড়িয়ে আছেন। যদিও বিশ্বব্যাপী নারীরা পূর্বের তুলনায় এ খাতে বেশ এগিয়ে যাচ্ছেন (বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নারী অংশগ্রহণের হার ৪২ শতাংশ, জাপানে ২৫ শতাংশ)। তবু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের চিত্রপটে খুব একটা পরিবর্তন ঘটেনি। অথচ ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের উদীয়মান সম্ভাবনাকে সার্থক করতে এবং চলমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে সাফল্য আনতে স্টেম খাতে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণ বেশি হওয়া একান্ত জরুরি।
স্টেম খাতে কেন নারীদের এমন পিছিয়ে থাকার প্রবণতা? এর কারণ বিশ্লেষকরা বেশ কিছু প্রপঞ্চকে দায়ী করেছেন। সেক্ষেত্রে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা, নারীদের অযোগ্য মনে করা, সামাজিক সংস্কৃতির বহমান রীতির বেড়াজাল, নারীবিদ্বেষী মনোভাব, বাল্যবিবাহ, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, সাইবারকেন্দ্রিক জটিলতা উল্লেখযোগ্য। পরিসংখ্যান বলছে, ‘এদেশে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিজ্ঞান শাখায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বেশ স্বাচ্ছন্দ্যময় হলেও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে গিয়ে শিথিল হয় এবং স্নাতক পর্যায়ে গিয়ে তা একেবারেই কমে যায়।’ ফলে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ স্বতঃস্ফূর্ত হয় না। তাই দেশে নারী প্রকৌশলী ও গবেষকের সংখ্যা ২০ শতাংশেরও নিচে।
চলমান বাস্তবতাকে মোকাবিলা করে স্টেম খাতে যদি নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারি তাহলে দেশের নারীর ক্ষমতায়ন যেমন পূর্ণ মাত্রা পাবে, তেমনি অন্যদিকে বিশ্ববাজারে তাদের নতুন নতুন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে, যা দেশের অর্থনীতির বুনিয়াদকে মজবুত করবে। যদিও এ সংকট নির্মূলে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু প্রকল্প প্রণয়ন ও প্রণোদনা প্রদানসহ কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং তৃণমূল পর্যায়ে এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তাই এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি নারীদের স্টেম খাতে যুক্ত করতে বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন এবং নারী গবেষকদের সংখ্যা বাড়াতে আরো প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। গতানুগতিক সমাজব্যবস্থায় পুরুষতান্ত্রিকতার শিকল ভেঙে নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন, বিশেষ করে পরিবার থেকেই এর সূচনা করতে হবে।
নারীর মেধা ও কৃতিত্ব স্টেম খাতে পুরুষের থেকে যে কোনো অংশে কম নয়, সে বিষয়ে গণমাধ্যমকেও নিয়মিত প্রচারণা চালিয়ে যেতে হবে। সেই সঙ্গে বাল্যবিবাহ নির্মূলে সবার সম্মিলিত প্রয়াসও সার্থক করতে হবে। বিভিন্ন সময়ের গবেষণায় দেখা যায়, ‘অধিকাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে তাদের আত্মবিশ্বাস হারাতে শুরু করে। কেননা তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, পুরুষরা নারী অপেক্ষা প্রযুক্তির দিক দিয়ে অধিক বুদ্ধিমান।’ এর ফলে তাদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়, যা সব সময় মনোবল দমিয়ে রাখে। তাই অনেক বেশি ওয়ার্কশপের আয়োজনের মধ্য দিয়ে মেয়েদের আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলা দরকার। মনে রাখা জরুরি, মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, কাজেই এ খাতে নারী পিছিয়ে থাকলে প্রযুক্তির যুগে সার্বিক উন্নয়নে দেশ কখনোই পূর্ণতা পাবে না।
লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়