মানুষের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হলো ভাষা। প্রাচীনকাল থেকেই প্রতিটি সম্প্রদায়, প্রতিটি গোষ্ঠীর মানুষের নিজস্ব ভাষা ছিল। ভাষা একটি পরিবর্তনশীল বিষয়। এটি স্থান-কালভেদে পরিবর্তিত হয়। ভাষার এই পরিবর্তন আদিমকাল থেকেই সংঘটিত হয়েছে, এখনো চলমান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো একটি দেশ বা সাম্রাজ্য স্বাধীন হওয়ার পর বিজয়ী পক্ষ স্থানীয় বা পরাজিতদের ওপর তাদের সংস্কৃতি ও ভাষা চাপিয়ে দেয়। যেমন আমাদের এই উপমহাদেশের কথাই বলা যাক—এখানে মোগলরা শাসনভার পরিচালনার সুবিধার জন্য তাদের নিজস্ব ভাষা ফারসি ব্যবহার করতেন। মোগলদের শাসনের অবসানের পর ইংরেজরা ক্ষমতা গ্রহণ করেই ফারসির পরিবর্তে ইংরেজি ভাষার প্রচলন করে দাপ্তরিক কাজে। এভাবে শাসকগণের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভাষার ব্যবহার ও প্রাধান্য পরিবর্তিত হয়েছে যুগে যুগে। এক্ষেত্রে শাসকগণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয়দের ভাষার স্বীকৃতি দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ দেননি।
বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে বিপত্তিটা বাধে তখনই, যখন পাকিস্তানি শাসকরা বাংলা ভাষাকে উপেক্ষা করতে থাকে। বাংলাদেশের মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা (৫৬ শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা)। অন্য দিকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের ভাষা ছিল উর্দু (মাত্র ৪ শতাংশ)। কিন্তু তার পরও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে গড়িমসি শুরু করে পাক শাসকগোষ্ঠী। অতঃপর মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯ মার্চ ১৯৪৮ সালে ঢাকায় আসেন এবং ২১ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দিতে গিয়ে ‘উর্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ বলে ঘোষণা দেন। সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত ছাত্ররা এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। সেই থেকে শুরু হয় ভাষা নিয়ে জোরালো লড়াই। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এমনি এক ফাগুনের দিনে (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮) ছাত্ররা ভাষার দাবিতে পাকিস্তান সরকারের ১৪৪ ধারা ভেঙে নেমে আসে রাজপথে। সেদিন পুলিশের গুলিতে নিহত হন সালাম, জব্বারসহ আরো অনেকে। পৃথিবীতে এই প্রথম বার কোনো জাতি উপনিবেশের ভাষা, সংস্কৃতিকে মেনে না নিয়ে নিজের মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠায় প্রাণ বিলিয়ে দেয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হলে ২১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দুকে একত্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অতঃপর ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারিকে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়, যা বাঙালি জাতির জন্য গর্বের বিষয়।
এখন প্রশ্ন হলো, বাঙালির জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত এই ভাষা কি সঠিক ও শুদ্ধভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে? এক্ষেত্রে দেখা যায়, দৈনন্দিন কাজে বলার ও লেখার ক্ষেত্রে প্রায়ই ভুল বানান লেখা এবং ভুল উচ্চারণ করার প্রবণতা যেন বেড়েই চলেছে! পাশাপাশি ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লেখার নিয়মটি দিনদিন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে অথচ পাকিস্তান আমলে ভাষা নিয়ে লড়াই করার অন্যতম একটি কারণ ছিল উর্দু হরফে বাংলা লেখা, যাতে বাঙালিরা চরম আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু একই জিনিস এত বছর পর নির্বিঘ্নে ব্যবহৃত হচ্ছে, তাহলে শহিদদের আত্মত্যাগের প্রতি কি আমরা শ্রদ্ধাশীল নই? দুঃখজনকভাবে গণমাধ্যমগুলোকে শুধু ভাষার মাসেই সরব থাকতে দেখা যায়। অথচ বাংলা ভাষার অমরত্ব ধরে রাখতে ফেব্রুয়ারি মাস তো বটেই, গণমাধ্যম, সুশীল ও সচেতন নাগরিকদের বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে সারা বছরই তৎপর থাকা উচিত।
সম্প্রতি জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার স্বীকৃতি লাভ করেছে বাংলা, যা বাঙালির দীর্ঘদিনের মনোবাসনাকে বাস্তব রূপ দিয়েছে। এতে বাংলা ভাষার গ্রহণযোগ্যতা আগের থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই এখন এই ভাষার শুদ্ধ চর্চা ও প্রমিত ভাষার ব্যবহারের প্রতি জোর দেওয়া অতি জরুরি। এক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির পাশাপাশি অন্যান্য সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষা শিক্ষার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া ভাষার প্রতিটি নতুন সংস্করণ সম্পর্কে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সর্বোপরি শুদ্ধভাবে ও প্রমিত বাংলা চর্চা করতে হবে। সবশেষ বলতে হয়, রক্তের দামে কেনা আমাদের এই বাংলা ভাষা, তাই এর স্বকীয়তা বজায় রাখার ও শুদ্ধভাবে ব্যবহার করার দায়িত্ব আমাদের সবার।
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়