স্পেশাল ইকোনমিক জোন ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন

১৯৭১ সালে দেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ জনগণ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করলেও বর্তমানে দেশে প্রায় ৩.৫ কোটি জনগণ, অর্থাৎ প্রায় ২০ শতাংশ জনগণ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। তবে এখনো দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় প্রচুরসংখ্যক দরিদ্র জনগোষ্ঠী রয়েছে। যেমন—বর্তমানে কুড়িগ্রাম জেলায় দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে প্রায় ৭১ শতাংশ জনগণ। দিনাজপুর জেলায় দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে প্রায় ৬৫ শতাংশ জনগণ। এছাড়া গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, নিলফামারী, লালমনিরহাট জেলা দেশের দরিদ্রতম অঞ্চল। মাগুরা ও শরীয়তপুর জেলায় বেকারত্বের হার এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি। সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতে দরিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে বিপুলসংখ্যক জনগণ। 

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকা জেলার জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো। এই তিন জেলায় দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে যথাক্রমে ২.৬ শতাংশ, ৬.৭ শতাংশ ও ৭ শতাংশ জনগণ। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেসব জেলার জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো, সেই জেলাগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকার ফলে বেকারত্ব কম এবং শিল্পকারখানা থাকার ফলে উত্পাদন বেশি। পক্ষান্তরে, দরিদ্র জেলাগুলোতে শিল্পকারখানা কম থাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কম এবং বেকারত্ব বেশি এবং উত্পাদন তুলনামূলকভাবে কম। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে এসব অবহেলিত অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক জোন কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন কর্তৃপক্ষ এখানে পালন করতে পারে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা। বাংলাদেশে মোট আটটি ইপিজেড রয়েছে এবং এসব ইপিজেডে মোট ইন্ডাস্ট্রির ৫৮ শতাংশ বিদেশি নাগরিকদের মালিকানাধীন। বাংলাদেশে মোট ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য কাজ করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ। এর অংশ হিসেবে ১১টি অর্থনৈতিক অঞ্চল ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল। বেজা এপ্রিল ২০২২ সাল পর্যন্ত সরকারি ৫৪টি, বেসরকারি ২৩টি এবং চীন, জাপান ও ভারতের জন্য চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দিয়েছে। ভারতের স্পেশাল ইকোনমিক জোনের জন্য প্রস্তাবিত স্থান হচ্ছে চট্টগ্রাম ও মোংলা। চীনের জন্য প্রস্তাবিত স্থান হলো চট্টগ্রাম এবং জাপানের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। তাছাড়া কোরিয়ান ইকোনমিক জোনের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে। স্পেশাল ইকোনমিক জোনে চীনের দুটি পাওয়ার সেক্টর কোম্পানির মাধ্যমে প্রায় ২৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা মূল্যের বিনিয়োগর প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশ বাংলাদেশের স্পেশাল ইকোনমিক জোনগুলোতে প্রচুর পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। 
 
ইকোনমিক জোনগুলো প্রতিষ্ঠিত হলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য উত্পাদন ও রপ্তানি করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ভুটান, উজবেকিস্তান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশে এনার্জি সেক্টর, জাহাজনির্মাণ, অটোমোবাইল, ওষুধ তৈরি প্রভৃতি খাতে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। স্পেশাল ইকোনমিক জোনগুলো কার্যকর করার জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সরবরাহ বৃদ্ধি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা প্রয়োজন।

কিছুদিন আগে সুযোগ হলো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যায়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের ছাত্রদের সঙ্গে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুর’-এর অংশ হিসেবে হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে ভ্রমণ করার। ২০১৪ সালে হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার ওলিপুরে ২২০ একর এলাকা জুড়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মাধ্যমে হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ে উঠেছে। এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে প্রায় ২২ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং এর মধ্যে ৮০ শতাংশ স্থানীয় অধিবাসী। এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কটির উৎপাদিত পণ্য বিশ্বের ১৪১টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে ফ্রুটি ড্রিংক, বেভারেজ, ক্যান্ডি, বিস্কুট, কনফেকশনারি, পাইপ, ইলেকট্রিক পণ্যসহ বিভিন্ন সামগ্রী উত্পাদন হচ্ছে।

হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক হওয়ার ফলে শায়েস্তাগঞ্জ, মাধবপুর প্রভৃতি এলাকার জমির দাম যেমন বহুগুন বেড়েছে, তেমনি এসব এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। জনগণের দারিদ্র্য অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের পার্শ্ববর্তী ওলিপুর বাজারের পরিধি বেড়েছে। বাজারে দোকানগুলোতে বিলাসী সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। ব্যাংক, বিভিন্ন ব্যাংকের বুথ স্থাপিত হয়েছে এবং রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ঘটেছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে। পার্শ্ববর্তী বাজারে উন্নতমানে সেলুন, ফার্নিচারের দোকান, বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিকস পণ্যের দোকান, রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি গড়ে উঠেছে। এলাকার জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার ফলে বিভিন্ন দোকানে বিক্রি ও মুনাফা বেড়েছে। ফ্যাক্টরিকে কেন্দ্র করে সুউচ্চ দালানকোঠা গড়ে উঠেছে। অনুরূপভাবে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলসহ মাগুরা, শরীয়তপুর প্রভৃতি অঞ্চলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক অথবা স্পেশাল ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা করা উচিত। এতে এই জেলাগুলোর নিতান্ত দরিদ্র জনগণের আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে তা বিরাট অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

লেখক :অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট