দেশপ্রেম ও বয়ফ্রেন্ড

বাসস্টপে বেশ কথা জমে যায়। কারণ এখানে মানুষ কথা বলার মতো কাউকে তেমন পায় না। শুরু হয় আবহাওয়া দিয়ে—হোয়াট এ লাভলি ওয়েদার! না হলে—হোয়াট এ বেড ওয়েদার।

এরপর এটা-সেটা। সামারে আলাপ হয় হলিডে নিয়ে। এ দেশে সবাই কোথাও না কোথাও যায়। কেউ যখন যায় না বা যেতে পারে না, বলে—এ বছর স্টপ অ্যাট হোম। দেখলাম মেরি। আমার বাড়ির রাস্তার প্রথম দিকে থাকে। আমি রাস্তার শেষ দিকে।—হাই! দেখো, কী চমৎকার আবহাওয়া। 

বাস আসতে একটু দেরি আছে। কাজেই কথা তো বলা যায়। উত্তর দিলাম—চমৎকার! তার পরের প্রশ্ন—এবার হলিডেতে কোথায় যাবে?

মেরি উত্তর দেওয়ার আগে মেরির পাশে ‘আলব্রাটস’ রোডের একজন মোটামুটি বৃদ্ধা উত্তর দিলেন—কোথায় মানে?

মানে অন্য কোনো দেশে। অন্য কোনো জায়গায়।

ধরা যাক সেই বৃদ্ধার নাম ক্যারোল। ও বলে—অন্য কোনো দেশে কেন?

কেন? আমি অবাক হয়ে বলি—সবাই তো যায়। যেমন আমি। যদি আমি টাকা ও সময় পাই তাহলে প্রতি বছর ইতালি যাব। অপূর্ব দেশ ইতালি। ফ্লোরেন্স, জেনোয়া, পিসা, ভেনিস, মিলান এবং আরো কত জায়গা। 

ক্যারোল বলে—আমার বয়স সত্তর। আমি কখনো কোনো দেশে যাইনি। যেতেও চাই না।

কেন? আমি একটু বিস্মিত। 

কেন? কী নাই আমাদের দেশে! পাহাড়, নদী, বিরাট মাঠ, অপূর্ব বাড়িঘর, লেক ডিস্ট্রিক্ট, ডোভার, ক্যালে, সমুদ্র, শালি সি-বিচ। কত যে বিচ আছে তার কোনো লেখাজোখা নাই। ব্রাইটন, ব্রডস্টেয়ার—এই বলে সে প্রায় ১০টি বিচের নাম করে। মনে হয় এই দেশের এত কিছু ফেলে যে বাইরে যায়, তার মতো বোকা গাধা আর একটিও নেই। 

আমি বলি—তুমি তো দেখি মস্ত বড় দেশপ্রেমিক। তারপর ঠাট্টা করে বলি—এখানে মরুভূমি আছে? একটাও নেই?

ও হারবার পাত্রী নয়। বলে—সেই যে ক্যামবারস্যান্ড! সেই সমুদ্রতীরে অনেক সিনেমার মরুভূমির শুটিং হয়েছে। ডেভিড লিনের ‘লরেন্স অ্যারাবিয়ার’ কিছু অংশ এখানে ক্যামেরায়িত হয়। 

সত্য-মিথ্যা জানি না। 

আমি আর তর্ক বাড়ালাম না। বাস এসে যাচ্ছে। 

পেছনের সিটে আমি আর মেরি বসলাম। আর ও সামনের সিটে। আসলে মেরি কিছু বলবে তাই। বলে—ওর মাথায় একটু দোষ আছে। সারা জীবন বিয়ে করেনি। একা বাড়িতে থাকে। ওকে সবাই জানে। কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই। কারণ, বয়ফ্রেন্ড হলিডে করতে বাইরে যাবে। ও যাবে না। কাজেই একা থাকে। 

বলি—না না, এমন দেশপ্রেম দেখা যায় না। আমার দেশে কি নেই যে আমাকে দেশের বাইরে যেতে হবে? সত্যিই আমি একটু অবাক হয়েছি। 

বাই! 

এই বলে মেরি চলে যায়। না, ওরা বাড়িতে ডাকে না। দরজায় দাঁড়িয়ে, না হলে বাগানের দেওয়াল ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করে। আর খুব বেশি হলে পাবে দেখা করতে বলে। সেখানে নানা সব ড্রিংক একে-ওকে দেয়। অনেক রাত পর্যন্ত গল্প। তারপর যে যার বাড়িতে। অনেকেই একা থাকে। কথা বলা? ওরা প্রায়শই কথা বলে বেড়াল বা কুকুরের সঙ্গে। না হলে টেলিভিশনের সঙ্গে। না হলে নিজের সঙ্গে। মেরির একটা বেড়াল আছে কার্ল। ছেলে বেড়াল। তার সঙ্গে হৃদয় উজাড় করে মেরি কথা বলে—বাইরে যাবি না কার্ল। ঐ বাড়িতে একটা নতুন কুকুর এসেছে, সাবধান! তারপর এটা-সেটা। মেরির বাবার বয়স ৮৫। একটা গার্লফ্রেন্ড হয়েছে তার। একদিন মেরি তা নিয়ে বাবাকে কথা বলতে গিয়েছিল। বাবা কেবল বলেছে—শোন মেরি, যাওয়ার সময় দরজা বন্ধ করে যাস।

মেরি তা-ই করেছে। লেপের ভেতর থেকে বাবা বলেছেন—দরজা বন্ধ করতেও তো একজনকে লাগে। তাই গার্লফ্রেন্ড। এখন আমি লেপের ভেতর থেকে উঠব? তারপর দরজা বন্ধ করব?

তোমার সেই গার্লফ্রেন্ড কোথায়?

ওর বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে আজ থিয়েটারে গেছে। 

ওর বয়ফ্রেন্ড আছে?

থাকবে না! আমি ৮৫ বছরের বুড়ো। মাঝে মাঝে ওকে যেতে দিই। ও আমাকে দেখে। খাবার বানায়। না হলে ব্যাকগার্ডেনে আমরা ব্যাকগ্যামন খেলি। চেস। লুডো। কথা বলি। ও এখানেই থাকে। 

মেরি এ দেশের মেয়ে, সে নিয়ে বেশি কিছু বলেনি।—একজন অল্পবয়স্ক গার্লফ্রেন্ড! তার সবকিছু ৮৫ বছরের বুড়ো কি সামলাতে পারবে? চমৎকার আন্ডারস্ট্যান্ডিং। মেরির বাবার কাছে মেরি থাকবে না। সে থাকবে ওর নিজের মতো।

শীত এসে গেছে। বেশ জমিয়ে বরফ পড়েছে কদিন। মেরি একদিন ভারী কোটে বাসস্টপে এসে দাঁড়ায়। বলি—অনেক দিন পরে দেখা হলো। কেমন আছো মেরি?

দেখছ না, পা দুটি কেমন ফুলে গেছে। তাই এই শীতে খুব একটা বের হই না। এখন একটু ডাক্তারের কাছে যাব। দেখি পায়ের যদি কোনো ওষুধ পাই। এরপর চলে যাবে বলে মেরি যখন দাঁড়িয়েছে, হঠাৎ সে আমার দিকে মুখ করে বলে—জানো না, ক্যারোলের কী হয়েছে?

না তো? শীতে কে কার খোঁজ রাখে! আমরা পেনশনাররা বাড়িতেই থাকি। দরকার না হলে বের হই না। বলি—কী হয়েছে?

বাড়িতে একা থাকত, সেটা তো জানো। একদিন গরম পানিতে গোসল করতে বাথে নেমেছে। হঠাত্ কী কারণে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যায়। তারপর সাত দিন ভেসে ছিল সেই বাথের ঠান্ডা পানিতে। মিল্কম্যান খোঁজ করে। দুধের বোতল কেউ তুলছে না কেন? সে-ই খবর দেয়। তারপর যা হওয়ার হয়।

আমি এই অদ্ভুত গল্পে হাঁ হয়ে গেছি। 

এত বড় একটা ঘটনা! মাত্র দুই রাস্তা পরে বলে আমি কিছুই জানি না! 

এক রাস্তার লোকই কিছু জানে না। তুমি তো দুই রাস্তা পরে। আমি ভাবছি দেশপ্রেমিক ক্যারোলিনকে। আহা! অন্য দেশে যাব কেন? এই দেশে কী নেই?

মেরি চলে গেছে। আমি বাসে উঠি। সবকিছু বড় আশ্চর্য! একজন নারী একেবারে একা। তাকে দেখার কেউ নেই। তার পরও সে বাড়ি ফেলে, দেশ ফেলে কোথাও যাবে না। আর দুই রাস্তা পরে বলে আমি কিছুই জানি না?

এরপর এক মাস পরে মেরির সঙ্গে দেখা। শীত একটু কম। ডিমপোচের মতো সূর্যটা উঠেছে। আমি দেখছি একজন মানুষ মেরির সঙ্গে। প্রায় মেরিরই বয়সি। 

ও হলো রিচার্ড। বয়ফ্রেন্ড! মেরি বলে।

কনগ্র্যাচুলেশনস!

ধন্যবাদ!

মেরি বলে—আমার বাবা একটি গার্লফ্রেন্ড সংগ্রহ করেছেন। রাতে যেন তার ঘরের দরজা কেউ বন্ধ করে, সে কারণে। এই গল্প মেরি আমাকে আগে বলেছে। এবার মেরি আমার কানের কাছে মুখ এনে বলে—সাত দিন বাথে ভেসে ডুবে থাকব। ভাবো তো, সে কেমন হবে? অন্তত ও থাকলে সে ঘটনা ঘটবে না। 

একজন দরজা বন্ধ করতে আর একজন বাথের জলে ডুবে ভেসে থাকার খবর অন্যদের দিতে বয়ফ্রেন্ড নির্বাচন করেছে। 

আমি বললাম—গুড জব মেরি। সি ইউ।

লেখক : কথাসাহিত্যিক