আগামী নির্বাচনের ভালো-মন্দ

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে একধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে কোনো ধরনের ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ক্রমশ জটিল ও সহিংস হয়ে উঠছে। এই সুযোগে পশ্চিমা বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে। তবে অনেক সময় দেশের সাধারণ মানুষের চাওয়ার সঙ্গে বিদেশিদের স্বার্থ মিলে যায়। যেমন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ও ভারতের স্বার্থ মিলে গিয়েছিল, যে কারণে ভারত মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সার্বিক সহায়তা করে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ চায় ভবিষ্যতে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, সর্বজন গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হোক। সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে এমন একটি নির্বাচনকে বোঝে, যেখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অংশগ্রহণ করবে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের কোনো একটি যদি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে, তাহলে সেই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হবে না।

পশ্চিমা যেসব দেশ বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে আগ্রহী, তারা মনে করে, জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে। কাজেই তারা চায় বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। তবে আমরা নিজেরাই বিদেশিদের আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিয়েছি। কারণ আমরা নিজেরা আমাদের সমস্যার সমাধান করতে পারছি না। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিদেশিরা বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে যেভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারছে, অন্য অনেক দেশের ক্ষেত্রে তা হয়তো সম্ভব নয়। বিশেষ করে দেশটি যদি শক্তিশালী এবং আত্মনির্ভরশীল হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্বশক্তি সেই সব দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারেই হস্তক্ষেপ করে থাকে, যারা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। শক্তিমান দেশ অনেক কিছু করে পার পেয়ে যায়। কিন্তু আমাদের মতো দেশ তা করতে পারে না। আমরা যদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত শক্তিশালী দেশ হতাম, তাহলে বিদেশি শক্তি আমাদের কোনো অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারত না। এই বাস্তবতা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। আমরা যদি এই বাস্তবতা বুঝতে না পারি, তাহলে আমাদের ক্ষতি হবে। বিদেশিরা চাইছে বাংলাদেশের আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হোক, যা বাংলাদেশের মানুষও চায়। তারা এর জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছে।

বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিএনপি আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না, এটা মোটামুটি নিশ্চত বলে ধরে নেওয়া যায়। কারণ নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বাস্তবে বিএনপির কোনো স্বার্থ নেই। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে যারা বিএনপির কমিটেড ভোটার ছিলেন বা নিরপেক্ষ যারা বিএনপিকে ভোট দিতেন, তারা ভোট দিতে পারেননি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন হলে আগামী নির্বাচনেও বিএনপির সমর্থকগণ ভোট দিতে পারবেন না। এই সংকট কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, তা আমরা জানি না। আর নিজেদের সমস্যা যদি নিজেরা সমাধান করতে না পারি, তাহলে বিদেশিরা তো সুযোগ নেবেই।

সরকার বলছে, সংবিধানের বাইরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো সুযোগ নেই। আর প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো বলছে, তারা কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। আমরা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, যারা সরকারে থাকে, পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ তাদের ইচ্ছেমতো ভোট প্রদানের সুযোগ পেলে পূর্ববর্তী সরকারকে সরিয়ে দেয়। আওয়ামী লীগ গত ১৫ বছর ধরে সরকারে আছে। এই মুহূর্তে তারা ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়াকে অপশন বলে মনে করছে না। যেহেতু দুই পক্ষই তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে, কাজেই ভবিষ্যতে দেশ একটি সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকেই ধাবিত হচ্ছে বলে মনে হয়। এমনকি যেনতেনভাবে যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েও যায়, তাহলে দেশে শান্তি ফিরে আসবে  কি না, সন্দেহ আছে।

আমরা যদি বিগত ৪০ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখব, আমরা নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করতে পারছি না বলেই বিদেশিরা বারবার আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পেয়েছে। জাতীয় নির্বাচন কীভাবে সষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত করা যায়, আমরা সে ব্যাপারে কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারিনি। ১৯৯০ সালে আন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতন হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। কিন্তু ১৯৯৬ সালে বিএনপি সেই ব্যবস্থা উলটে দেওয়ার চেষ্টা করে। বিএনপি জানত, সেই সময় নির্বাচন যদি ফ্রি-ফেয়ার হয়, তাহলে তারা পরাজিত হবে। কিন্তু যেহেতু সেই সময় গণদাবি ছিল সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে, তাই বিএনপি সেই গণদাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। ১৯৯১ সাল থেকে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে যে চারটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তার সবগুলোই গ্রহণযোগ্য হয়েছিল এবং কোনো নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন দল পুনরায় বিজয়ী হতে পারেনি। কাজেই যারাই ক্ষমতায় থাকবে, তাদের তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পছন্দ করার কোনো কারণ নেই। আমি ১৯৭৩ সাল থেকে ভোটার। জাতীয় নির্বাচন কীভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তা প্রত্যক্ষ করেছি। বিএনপি জানে, দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তাদের দল ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই তারা চাইবে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত হয়।

অনেকেই বলেন, সরকার যদি একতরফাভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে ফেলে, তাহলে পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ার আশঙ্কা আছে। আমি এ ব্যাপারে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাই না। কারণ সেটা একমাত্র ভবিতব্যই বলতে পারবে। তবে ১২টি পশ্চিমা দেশে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কিছু তৈরি পোশাক নানা অজুহাতে বাজার থেকে তুলে নিতে বলা হয়েছে। এটা আমার কাছে একটি অশনিসংকেত বলে মনে হয়। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমন তুলনামূলক শান্ত ছিল, আগামী নির্বাচনের পর তা থাকবে বলে মনে হয় না। আর সে ক্ষেত্রে চলমান অর্থনৈতিক সংকট আরো জটিল আকার ধারণ করবে নিঃসন্দেহে।

 মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কিছু নাগরিকের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং শোনা যাচ্ছে ভবিষ্যতে আরো অনেকের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। ভিসা নিষেধাজ্ঞার কারণে সাধারণ মানুষের কোনো অসুবিধা হবে না। তবে যারা প্রশাসনে এবং পুলিশ ডিপার্টমেন্টে আছেন, তাদের মিড লেভেল পর্যন্ত যদি ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, তাহলে তারা সমস্যায় পড়বেন, যেহেতু তাদের অনেকেরই ছেলেমেয়ে ও পরিবার বিদেশে থাকে। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়। পাচারকৃত অর্থ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া এখন খুব একটা কঠিন কাজ নয়। কিন্তু যেসব উন্নত দেশে অর্থ পাচার করা হয়, তারা নিজেরাও অর্থ পাচার রোধে খুব একটা আন্তরিক নয়। অর্থ পাচার কোনো একটি দেশের একক প্রচেষ্টায় বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য সব দেশকে মিলে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?’ যারা উন্নয়নশীল দেশ থেকে অর্থ পাচার করেন, তারা জানেন কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যাবেন। যেসব দেশে অর্থ পাচার করা হয়, তারা যদি পাচারকৃত অর্থ জব্দ করত, তাহলে অর্থ পাচারের প্রবণতা অনেকটাই কমে যেত। তবে যে দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়, সেই দেশকেও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। অর্থ পাচার একটি জটিল সমস্যা এবং সব দেশকে মিলেই এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালাতে হবে।

লেখক: সাবেক পররাষ্ট্রসচিব

অনুলিখন: এম এ খালেক