জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা

যে কোনো দেশের জনপ্রতিনিধিদের আচরণ সাধারণত নাগরিকদের প্রভাবিত করে থাকে। যেসব প্রতিনিধি আইন প্রণয়ন করেন, জনগণের সমস্যা সমাধানের দিকনির্দেশনা প্রণয়ন করেন, তাদের আচরণ যদি স্বাভাবিক ও উন্নতমানের না হয়, তাহলে বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়ে থাকে। জনপ্রতিনিধিদের আচরণ স্বাভাবিক ও ন্যায্য না হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। আমাদের দেশে প্রায়শই যে সমস্যাটি লক্ষ করা যায় সেটি হলো—নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্বাচন-পরবর্তী তাদের আচরণ এবং ভূমিকা কিছুটা পরিবর্তন করেন। নির্বাচনের অব্যবহিত আগে যে ধরনের আচরণ এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন জনগণের সামনে,  ঠিক সে ধরনের আচরণ এবং প্রতিশ্রুতির ব্যত্যয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই  ঘটে থাকে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের স্বেচ্ছাচারিতা বা দুর্নীতি রোধ এবং তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেওয়াসহ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন’ রয়েছে। সংসদের একটি বড় দায়িত্ব সংসদ সদস্যদের নিজেদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। সংবিধানের ৮৭ অনুচ্ছেদে সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তির বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জাতীয় সংসদের ‘কার্যপ্রণালি-বিধি’র ২২তম অধ্যায় (ধারা ১৬৩-১৭৬) ‘বিশেষ অধিকার’ সম্পর্কিত। কারো কার্যক্রমের দ্বারা সংসদ কিংবা সংসদ সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে তা তাদের বিশেষ অধিকারের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে। সাধারণ নাগরিকরা যেমন তাদের বক্তব্য ও কার্যক্রম দ্বারা সংসদ ও সংসদ সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে (যেমন, সংসদ কর্তৃক তলব হওয়ার পর তাতে সাড়া না দেওয়া কিংবা দলিল-দস্তাবেজ না দেওয়া)। তেমনিভাবে সংসদ সদস্যগণের নিজেদের আচরণের মাধ্যমেও এ অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। যেমন, তারা যদি দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন তথা অসদাচরণে (misconduct) লিপ্ত হন, যা জনসম্মুখে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা হানি ঘটাবে, তাহলেও সংসদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। ভারতসহ অনেক দেশেই অসদাচরণের অভিযোগে সংসদ সদস্যদেরকে সংসদ থেকে বহিষ্কারও করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, অর্থের বিনিময়ে সংসদে প্রশ্ন উত্থাপন করার এবং এলাকা উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রদত্ত বরাদ্দ থেকে কমিশন গ্রহণ ইত্যাদি অভিযোগে ২০০৫ সালে ভারতীয় লোক ও রাজ্যসভার ১১ জন সদস্যকে একযোগে বহিষ্কার করা হয়। স্থায়ীভাবে বহিষ্কার ছাড়াও, অসদাচরণের অভিযোগে তিরস্কার এবং সাময়িকভাবে বহিষ্কারের মাধ্যমেও সংসদ সদস্যদের শাস্তি প্রদান করা হয়। তাই নিজেদের সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সংসদের কার্যক্রমের অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সংসদের কার্যকারিতা উপরিউক্ত দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করতে হলে সংসদে সব সদস্যের উপস্থিতি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সংসদকে কার্যকর বলা যায় না। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশে বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের একটি অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এটি আমাদের পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদের কার্যকারিতা নির্ভর করে প্রণীত আইনের মানের ওপর। মানসম্মত ও যথাযথ আইন প্রণয়নের জন্য প্রয়োজন মাননীয় সংসদ সদস্যদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের খুব কম সংসদ সদস্যই এ গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রস্তুতিতে সময় ব্যয় করেন। এমনকি অনেকের এ ব্যাপারে আগ্রহও নেই। তাই অনেকে আমাদের জাতীয় সংসদকে ‘রাবার স্ট্যাম্পিং’ প্রতিষ্ঠান বলে আখ্যায়িত করেন। সংসদ প্রণীত আইনগুলোর দিকে তাকালেই এ অভিযোগের সত্যতা অনেকাংশে দৃশ্যমান। যেমন, নবম জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রণীত স্থানীয় সরকার আইনগুলোর মধ্যে অনেক গুরুতর অসামঞ্জস্য রয়েছে।

আমাদের সংবিধানে অনেকগুলো বিষয়ে আইন প্রণয়নের কথা বলা হলেও, তা বাস্তবে রূপদান করা হয়নি। সংসদে যদি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিতর্ক না হয়, তা হলেও সংসদকে কার্যকর বলা যাবে না। বিরোধী দলের উপস্থিতি ছাড়া যেমন এ বিতর্ক যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া সম্ভবপর নয়, বিরোধী দলের উপস্থিতিতেও তা নিশ্চিত করা যায় না। এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি যথাযথভাবে সম্পাদনের জন্য প্রয়োজন : মাননীয় স্পিকারের নিরপেক্ষতা, সরকারি দলের উদারতা ও সংসদ সদস্যদের যথাযথ প্রস্তুতি। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের ক্ষেত্রে এর অনেকগুলোরই অভাব রয়েছে। অতীতে অনেক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কেই সংসদে আলোচনা করতে দেওয়া হয়নি। এছাড়াও বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যগণ যদি পরস্পরের প্রতি গালিগালাজ কিংবা নেতা-নেত্রীদের বন্দনায় নিজেদেরকে লিপ্ত রাখেন, তাহলেও সংসদ কার্যকারিতা অর্জন করে না। সংসদীয় কমিটিগুলো সংসদের প্রাণ। এগুলোর মাধ্যমেই সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। আমাদের সংবিধানের ৫৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘মন্ত্রীসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকিবেন’। তাই কমিটিগুলোর সক্রিয়তার ওপরই সংসদের কার্যকারিতা বহুলাংশে নির্ভর করে। সংসদে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমেও সরকারের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সদস্যরাই বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকেন।

সংসদ সদস্যগণ এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না, যাতে তাদের সংসদীয় দায়িত্ব প্রভাবিত হতে পারে। এমনকি সংসদ সদস্যদের নৈতিক অবস্থান ও দায়দায়িত্ব, ব্যক্তিস্বার্থে আর্থিক প্রতিদান; উপঢৌকন বা সেবা, সরকারি সম্পদের ব্যবহার, গোপনীয় তথ্যের ব্যবহার, বাকস্বাধীনতা, সংসদ সদস্য বা জনগণকে বিভ্রান্ত ও ভুল পথে চালিত না করা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহিষ্ণুতা, নৈতিক কমিটি ও আচরণ আইনের প্রয়োগ, আইন লঙ্ঘনের শাস্তি, নৈতিকতা কমিটির কার্যকালসহ বিভিন্ন বিষয় সংবলিত একটি আইন আজও আলোর মুখ দেখেনি। এতে কিছু কিছু বিষয়ে সাধারণ জনগণের অধিকার বাস্তবায়নে হয়রানির শিকার হতে হয়।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়