বিশ্বায়নের এ যুগে মানবীয় ধারণা সামাজিকতা ও মুখবন্ধতা অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে থাকে। এ ক্ষেত্রে বিচক্ষণতা ধীশক্তি ও উদ্ভাবন এবং সর্বোপরি লাগসই প্রযুক্তির ব্যবহার অথনৈতিক কার্যক্রমকে সমৃদ্ধতর করে। বিশ্বায়নের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা এককভাবে নিজের খেয়াল খুশিমতো চলতে পারে না। বরং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ঘটতে সহায়তা করে, যদিও মূল্যবোধ নৈতিকতা ও সর্বোপরি ধর্মীয় ভাবনার মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে। বিশ্বায়নের অবিমিশ্র ইতিবাচক প্রভাব সবসময়ে বজায় না-ও থাকতে পারে। দেশে দেশে উন্নত বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
বিশ্ব বিনিয়োগ রিপোর্ট ২০২৪ অনুসারে দেখা যায় যে, অর্থনৈতিক মন্দা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধির ফলে ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের হার ২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে মার্কিন ডলার ১.৩ ট্রিলিয়ন হয়েছে। কয়েকটি ইউরোপীয় কনডিউট (conduit) অর্থনীতির রাষ্ট্রে ১০শতাংশ ক্রমহ্রাসমান হারে বিনিয়োগ হচ্ছে। চলতি বছর এবং ২০২৬—উভয় বছরে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির হার ৩.৩ শতাংশ, যা বৈশ্বিক দীর্ঘমেয়াদি সময় অনুসারে ৩.৭ শতাংশের নিচে। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে একটি অনিশ্চিত বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির চিত্র পরস্ফুিট হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী প্রকল্পের অর্থায়নে মন্দাবস্থা বিরাজ করছে, যা মূলত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিশেষত কৃষি, খাদ্য ও খনি প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ সার্বিকভাবে বিশ্বব্যাপী বাস্তবায়নে বাধার সৃষ্টি করেছে।
যদি বাংলাদেশে ২০২৬ সালে নাগাদ এলডিসি গ্রাজুয়েশান বাস্তবায়ন করতে চায় এবং ২০৩০ নাগাদ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চায়, এ ছাড়াও ২০৩১ সালে নাগাদ উচ্চ মধ্যম আয়ের অর্থনৈতিক রাষ্ট্র হিসাবে বিকশিত হতে চায়, তাহলে অনেকগুলো কাজ করতে হবে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—এ দেশকে উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে আর্থিক ব্যবস্থাপনা দুর্নীতিমুক্ত ভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং মানবীয় কল্যাণ বণ্টন ব্যবস্থা ও ন্যায়পরায়ণতা লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠা কর্মসংস্থান সৃষ্টি মোট দেশজ উত্পাদন বৃদ্ধি তৃণমূল থেকে অর্থপাচার বন্ধ করা। এ ছাড়াও, ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, খেলাপিঋণ থেকে মুক্তি, ব্যবসা বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে আলোচনা করে বাণিজ্যের শর্তাবলি বাংলাদেশের স্বপক্ষে আনতে হবে। অন্যদিকে, ব্যবসায়িক নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি প্রচলিত ও অপ্রচলিত পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অন্যায্যতা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে অগ্রগতি ও উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
গাজায় মানব হত্যা, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন রাষ্ট্র হিসাবে আরকান রাষ্ট্র সৃষ্টির সম্ভাবনা বিশ্বব্যাপী অপরাধ ও সহিংসতার পাশাপাশি বৈশ্বিক দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য ও সৃষ্টি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে পারে। মূলত একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রভাব একটি দেশের বাইরে ও অন্যত্র অনুভূত হয়ে থাকে। বাস্তবতায় দেখা যায় সমগ্র প্রাসঙ্গিক অর্থনৈতিক কল্যাণময় করতে হলে বিভিন্ন অর্থনীতির পথে সংশ্লিষ্ট পরিবেশ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি ব্যয় এবং আইনগত বিধি বিধান জনকল্যাণমুখী করা প্রয়োজন। আমার কুমিল্লা জেলা স্কুলের বন্ধু অর্থনীতিবিদ এম শাহ এমরান ও তার সহযোগী দুইজন লেখক আসাদুল ইসলাম এবং ফরহাদ জাহান শিল্পী বাংলাদেশের তাদের প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে, বিনামূল্যে শিক্ষা কেবল ধনীদের জন্য বিনামূল্যে এবং দরিদ্রদের বিপক্ষে সুযোগকে সংকুচিত করে তোলে। বৈশ্বিক অপরাধ ও সহিংসতার পাশাপাশি দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য ক্রমশ বেড়ে চলেছে। বিশ্বব্যাপী যদি ভিসামুক্ত বিশ্ব তৈরী করা যেত এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য দুর্নীতিমুক্ত ভাবে সুযোগ সুবিধা সরকারী ব্যবস্থাপনায় দেশে দেশে ভিজিটাল সমাধানের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও সুবিন্যাস্তভাবে সমাধান করা যায়, তবে স্বল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সমস্যসার সমাধান হতে পারে।
বিশ্বব্যাপী অনলাইন পরিষেবা এবং তথ্য পোর্টলের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির জন্য বৃহত্তর ডিজিটাল সরকারী ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করা যেতে পারে। বৈশ্বিকভাবে যে সমস্ত ঋণদাতা দেশ ভিন্ন দেশের কোনো সরকারের উপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থাকে—তা শুধু বাণিজ্যের কারণে দেয়, তা নয় বরং অন্যান্য কারণেও দিতে পারে। বাজারে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবেশ করতে না পারলে অভ্যন্তরীণ খরচের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্র সমূহের কিছু দ্বন্দ্ব উন্নত দেশসমূহের বিশেষত: মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে বিদ্যমান রয়েছে। মৌলিক দ্বন্দ্ব সমূহের মধ্যে রয়েছে মূলধন সঞ্চয়ের প্রয়োজনীয়তা এবং জনসংখ্যার কল্যাণ চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতাপশালীদের মধ্যে সংঘাত ও অন্তর্দ্বন্দ্ব। বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে রাজনীতি, বাস্তুতন্ত্র এবং বৈষম্যের জন্য বিশ্বব্যাপী সংকটসমূহ এসব দ্বন্দ্ব সংঘাতের পেছনে রয়েছে। ফলে ন্যায়সঙ্গত সামাজিক কাঠামো ও বৈষম্যমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্বব্যাপী দুর্নীতি সামাজিক কল্যাণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে। স্বাস্থ্যসেবা শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করার মতো প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলোতে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ সীমিত হয়ে থাকে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে থাকে। বৈষম্যকে আরো প্রকট করে থাকে এবং সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি জনসাধারণের আস্থা হ্রাস পায়। যার দরুন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে থাকে।
দুর্নীতি বৈষম্য বৃদ্ধি করে, জনসাধারণের জবাবদিহিতা নস্যাত্ করে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ নস্যাত্ করে এর ফলে নাগরিকদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হারে হতাশা দুঃখ ও বঞ্চনার সঞ্চার হয়। উচ্চমাত্রার দুর্নীতি অর্থপাচার, একটি রাষ্ট্রের সামাজিক বৈধতাকে দুর্বল করে থাকে। ক্রিস্টিনা বাসনা এবং নিমিত্রি গুগুশভিলি (২০২৫ খৃ.) এক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, যেসব দেশে দুর্নীতি বেশি পরিমাণে বিস্তৃত হয় সেসব দেশে একটি বিস্তৃত কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বেশি সঞ্চারিত হয়ে থাকে। অন্যদিকে ব্যাস্টিক অর্থে অনুভূত দুর্নীতি কল্যাণ নীতির প্রতি বেশি সমর্থন জুগিয়ে থাকে। অবশ্য দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা কল্যাণের প্রতি কম আগ্রহ দেখিয়ে থাকে।
ব্যক্তিস্বার্থে এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে থাকে একটি দেশের দুর্নীতি ও কল্যাণমূলক পরিবেশের ওপর বিরোধ—যা মোটেই মানব কল্যাণের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। সমস্যা থেকে উত্তরণ করতে হলে বাংলাদেশেকে আত্মসম্মান বাড়াতে ২০২৬ সালে এএলডিসি গ্র্যাজুয়েট হতে হবে।
বিশ্বব্যাপী দ্রুত বয়স জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কর্মীসংখ্যা সংকুচিত হওয়া, বয়সজনিত অসুস্থতার জন্য স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবে বৃদ্ধি পাওয়া, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হওয়া ইত্যাদি। বয়স্কদের জন্য আবাসন চাহিদা দীর্ঘদেয়াদি যত্ন সুবিধার ক্রমবর্তমানে চাহিদা ও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমানে বিশ্বে ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বেশি বয়সের প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ রয়েছে। বয়স্ক মানুষদের বেঁচে থাকার জন্য অবলম্বন সৃষ্টি করা দরকার। সমগ্র বিশ্ব দীর্ঘজীবন প্রাপ্তির ঘটনা অবিরত ঘটে চলেছে। ফলে একটি পর্যায়ে এসে তারা কর্মহীন হয়ে পড়ে। আত্মীয়স্বজন প্রতিবেশী থেকে বঞ্চিত হয়ে হতাশ ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। দারিদ্র্য, মাদক, শিশু নির্যাতন, নারী নির্যাতন দুর্নীতি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বিশ্বব্যাপী সামাজিক সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা টেকসই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সমতা বৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টি অর্থনৈতিক নীতি ও মৌলিক চাহিদা পূরণের সদিচ্ছা বিশ্ব্যাপী প্রয়োজন।
লেখক : ম্যাক্রো ফিন্যান্সিয়াল ইকোনমিস্ট