কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে আমরা এখনো অনেকেই ভবিষ্যতের প্রযুক্তি হিসেবে দেখি। অথচ বাস্তবতা হলো, এআই এখন আজকের অর্থনীতির অংশ। জাতীয় উৎপাদনশীলতা থেকে শুরু করে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছুই এরই মধ্যে এআইয়ের ছোঁয়া পেয়েছে। তাই এআই নিয়ে ভাবনার সময় আগামীকাল নয়, এখনই।
সম্প্রতি সরকার দেশের ৬৪ জেলায় তরুণদের জন্য বিনা মূল্যে দুই মাসের মৌলিক এআই প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কেবল প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিয়ে কি এআই বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব? আমার বিবেচনায়, সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও ফলাফলভিত্তিক জাতীয় কৌশল।
নীতির মাপকাঠি পৃষ্ঠা নয়, ফলাফল
জাতীয় এআই নীতিমালা ২০২৬-২০৩০-এর খসড়া তৈরি হয়েছে, এর ওপর জনমতও নেওয়া হয়েছে। যত দূর জানি, নীতিটি এখন চূড়ান্ত করার পর্যায়ে রয়েছে। আমার প্রথম পরামর্শ হলো, এআই নীতিকে কেবল তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের একটি নথি হিসেবে রেখে দেওয়া ঠিক হবে না। একে জাতীয় অর্থনৈতিক নীতির অংশ করতে হবে।
সিঙ্গাপুরের উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক। দেশটি জাতীয় এআই নীতি থেকে এক ধাপ এগিয়ে ন্যাশনাল এআই কাউন্সিল গঠন করেছে, যা এআইয়ের ব্যবহারকে সরাসরি জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। ভারতও মেধা, স্টার্টআপ ও কম্পিউটিং সক্ষমতাকে একই কাঠামোর মধ্যে এনেছে।
একটি নীতি কত পৃষ্ঠার হলো, তা দিয়ে এর মূল্যায়ন হয় না। দেখতে হবে, সেই নীতি জাতীয়ভাবে কী ফল দিল। কতগুলো কর্মসংস্থান রক্ষা পেল, কতজন কর্মীকে নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করে নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হলো, এআই ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়ল—এগুলোই আসল মাপকাঠি। আগামী পাঁচ বছরের জন্য এই ফল পেতে হলে তিনটি স্তম্ভে জোর দিতে হবে: মেধা, কম্পিউটিং সক্ষমতা এবং ডেটা।
এআই ব্যবহার আর এআই দক্ষতা এক নয়
একটি প্রচলিত ধারণা শুরুতেই ভাঙা দরকার। চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করতে পারা মানেই এআই দক্ষতা নয়। দেশের প্রয়োজন এআই ডেটা সায়েন্টিস্ট, এআই প্রোডাক্ট ডেভেলপার, এআই প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও এআই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। এআইকে ঘিরে যে নতুন কাজের ক্ষেত্রগুলো তৈরি হচ্ছে, সেখানে দক্ষ জনবল গড়ে তোলাই মূল কাজ।
এআই দক্ষতাকে তিন স্তরে ভাগ করা যায়। প্রথম স্তরে এআই ব্যবহারকারী, যাঁদের মধ্যে আজ আমরা প্রায় সবাই আছি। তাঁদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণের তেমন প্রয়োজন নেই; ব্যবহার করতে করতেই মানুষ শিখে যায়। দ্বিতীয় স্তরে এআই ইন্টিগ্রেটর, যাঁরা ব্যাংকিং, সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও ডেটার সঙ্গে এআই যুক্ত করে নতুন সেবা তৈরি করবেন। তৃতীয় স্তরে এআই ক্রিয়েটর, যাঁরা নিজেরাই মডেল তৈরি করবেন। আমাদের প্রকৃত ঘাটতি এই শেষ দুই স্তরে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকার—দুই দিক থেকেই পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
আমরা প্রায়ই শুনি, এআই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে। কথাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। এআই কাজের ধরন বদলে দেবে, একই সঙ্গে নতুন কাজের ক্ষেত্রও তৈরি করবে। তবে এআই পুরোপুরি জেঁকে বসার পর দক্ষতা উন্নয়নের কাজ শুরু করলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।
তাই তৈরি পোশাক, কৃষি, আইসিটি ও বিপিওর মতো বড় কর্মসংস্থানের খাতগুলোতে কোন কাজগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিতে, তা আগেই চিহ্নিত করতে হবে। এরপর সেই কর্মীদের এআই-সহায়ক কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের লক্ষ্য ‘এআই-প্রুফ’ চাকরি নয়, বরং ‘এআই-রেডি’ কর্মশক্তি।
একটি উদাহরণ দিই। একজন পোশাকশ্রমিককে ক্লড দিয়ে কোডিং শেখানোর প্রয়োজন নেই। তাঁর দরকার এমন এআই টুল, যা দিয়ে তিনি পণ্যের মান যাচাই করতে পারবেন। অর্থাৎ সঠিক কর্মীকে শেখাতে হবে সঠিক দক্ষতা। একই ছাঁচের গণপ্রশিক্ষণ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
কম্পিউটিং এ যুগের বিদ্যুৎ
একসময় বিদ্যুৎ ছাড়া শিল্পায়ন কল্পনা করা যেত না। আজ জিপিইউ বা উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিংয়ে প্রবেশাধিকার ছাড়া এআই উন্নয়নও কল্পনা করা যায় না। এআই ক্রিয়েটর তৈরি করতে চাইলে তাঁদের হাতে জিপিইউ পৌঁছাতে হবে। নইলে তাঁরা মডেল বানাবেন কোথায়, পরীক্ষাই-বা করবেন কোথায়?
ভারত ইন্ডিয়াএআই মিশনের আওতায় ১০ হাজারের বেশি জিপিইউভিত্তিক অবকাঠামো গড়ে তুলছে। ভারতের সঙ্গে আকারে পাল্লা দেওয়ার প্রয়োজন আমাদের নেই। তবে সরকারি পর্যায়ে একটি যৌথ এআই কম্পিউটিং অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে স্টার্টআপ, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তুকি মূল্যে কাজ করার সুযোগ পাবে।
ডেটা আছে, কিন্তু কতটা এআই-উপযোগী
এআই পুরোপুরি ডেটানির্ভর। খারাপ ডেটা থেকে তৈরি হয় খারাপ মডেল, যা কোনো কাজে আসে না। আশার কথা, আমাদের ডেটার ঘাটতি নেই। ভূমি অফিস, পরিবহন, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডার থেকে শুরু করে ব্যাংক, টেলিকম ও ই-কমার্স—সরকারি-বেসরকারি সব খাতেই বিপুল ডেটা তৈরি হচ্ছে।
কিন্তু এসব ডেটা এআই-উপযোগী কি না, সে প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। এআই-উপযোগী ডেটাকে হতে হবে পরিচ্ছন্ন, পরিমাপযোগ্য, সঠিকভাবে লেবেল করা এবং আন্তপরিচালনযোগ্য, যাতে এক প্রতিষ্ঠানের ডেটা আরেক প্রতিষ্ঠান কাজে লাগাতে পারে।
ভারতের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে আমরা ডেটাকে তিন স্তরে সাজাতে পারি। উন্মুক্ত ডেটা, যা এপিআইয়ের মাধ্যমে যে কেউ ব্যবহার করতে পারবেন; নিয়ন্ত্রিত ডেটা, যা নির্দিষ্ট অনুমতি ও নথিপত্রের মাধ্যমে পাওয়া যাবে; আর সংবেদনশীল ডেটা, যা আইনি কাঠামোর বাইরে কেউ ব্যবহার করতে পারবেন না। পাশাপাশি ডেটা সুশাসন ও নিরাপত্তাকে নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে। ডেটা সুরক্ষিত না থাকলে তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি থেকেই যাবে, আর তার খেসারত দিতে হবে নাগরিকদের।
ডিপফেক: ঢালাও নিষেধাজ্ঞা নয়
যেকোনো নতুন প্রযুক্তিতে ঝুঁকি ও সম্ভাবনা পাশাপাশি থাকে; এআইয়ের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার পাল্লাই ভারী। ঝুঁকির আলোচনায় সবার আগে আসে ডিপফেক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পথটি শিক্ষণীয়। তারা এআই দিয়ে তৈরি সব কনটেন্ট ঢালাওভাবে নিষিদ্ধ করেনি; বরং যথাযথ লেবেল দেওয়া বাধ্যতামূলক করছে, যাতে দর্শক বুঝতে পারেন কোনটি এআই দিয়ে তৈরি।
এআই দিয়ে বানানো একটি কার্টুন দেখে শিশুরা আনন্দ পেলে তাতে দোষের কিছু নেই। তাই বিচার হওয়া উচিত উদ্দেশ্য দেখে। কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে ডিপফেক তৈরি করে জনমনে বিভ্রান্তি বা অসন্তোষ ছড়ালে তার জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান থাকা উচিত।
দরকার বাস্তবায়নের রোডম্যাপ
দক্ষ মানুষ, কম্পিউটিং সক্ষমতা ও এআই-উপযোগী ডেটা—এই তিনের সমন্বয়েই আসবে উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন ও রপ্তানির সুযোগ। প্রতিটি স্তম্ভের জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট বাজেট, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য।
দুই মাসের মৌলিক প্রশিক্ষণ একটি শুরু মাত্র। লক্ষ্য হতে হবে কেবল এআই ব্যবহারকারী নয়, দক্ষ ইন্টিগ্রেটর ও ক্রিয়েটর তৈরি করা। কারণ বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এআই নয়; সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এআইয়ের দৌড়ে পিছিয়ে পড়া।
লেখক: রিয়াদ হাসনাইন, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও সরকারি খাতের সংস্কারবিষয়ক নীতি বিশ্লেষক।