ইউনিয়ন পরিষদের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করার সময় গত ১৪ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় শাসন নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন কিনা তা নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশন মাঠে রেফারির দায়িত্ব পালন করে। রেফারি খেলার নিয়ম বানান না, তিনি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী খেলা পরিচালনা করেন। নির্বাচন কমিশনকে যদি বলা হয় এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণ প্রার্থী হতে পারবেন, তাহলে কমিশন এক পদ্ধতি অনুসরণ করবে, অন্যথায় অন্য পদ্ধতি।
অনলাইন সংবাদ অনুসারে, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষেধসহ স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও ইউপি) আইন সংশোধনের বেশ কটি সুপারিশ নির্বাচন কমিশন সরকারকে দিয়েছে। কমিশন আশঙ্কা করছে যে তপশিল ঘোষণার আগে সময়ের স্বল্পতায় সুপারিশসমূহ আইনে পরিবর্তিত না-ও হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনেই ভোট হবে। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯ এ পরিষদের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা বিষয়ক ৬ষ্ঠ অনুচ্ছেদের ধারা '২৬(২) (ঙ) তিনি প্রজাতন্ত্রের বা পরিষদের বা অন্য কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কোনো কর্মে লাভজনক সার্বক্ষণিক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন'-কে অযোগ্য বলা হয়েছে। এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীগণ কি প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মে লাভজনক সার্বক্ষণিক পদে অধিষ্ঠিত নন?
এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয় নিয়ে বিতর্ক উত্থাপনের কোনো হেতু থাকতে পারে না। ব্রিটিশ শাসনাধীন বাংলায় ১৮৬৪ সালে মিউনিসিপ্যাল ও ১৮৭০ সালে গ্রাম পঞ্চায়েত আইন দিয়ে স্থানীয় শাসনের সূচনা। প্রাথমিকভাবে মিউনিসিপ্যাল ও গ্রাম পঞ্চায়েত ছিল মনোনয়নভিত্তিক। ১৮৮৫ ও ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে স্থানীয় শাসন আইনে খানিকটা করে পরিবর্তন আনা হয়। আংশিক নির্বাচনের সুযোগ রাখা হয়। ১৯১৯ সালের Bengal Village Self-Government Act-টি আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত বহাল ছিল। সেই আইন অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীরাও সাধারণভাবে ইউনিয়ন বোর্ডের সদস্য হতে পারতেন। পরবর্তীকালে ১৯৫৯ সালের মৌলিক গণতন্ত্র আইনে সরকারি কর্মচারীদের প্রার্থী হওয়া বাতিল করা হয়। এর মাধ্যমে পদটি রাজনৈতিক বলে স্বীকৃত হয়। তৎকালে দেশে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীগণের বেতনভাতা নিয়ে সরকারের কোনো দায় ছিল না। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ, অপসারণ, বেতনভাতা প্রভৃতি সব দায় পালন করত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীগণ না সরকারের না স্থানীয় শাসনের চাকরি করতেন। সরকার বা স্থানীয় শাসন কারোর সঙ্গেই শিক্ষক-কর্মচারীদের কোনো আর্থিক সম্পর্ক ছিল না। তাদের পদগুলি প্রজাতন্ত্র বা স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠানের বেতনভুক পদ ছিল না। এ কারণেই ১৯১৯ বা ১৯৫৯ সালের আইনে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীগণ স্থানীয় শাসন এমনকি জাতীয় নির্বাচনেও নির্দ্বিধায় প্রার্থী হতে পেরেছেন। আমাদের স্বাধীনতার পরও ১৯৮৪ সালের আগে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীগণ সরকারি বেতন খাতের বাহিরে থাকায় তখনো নির্বাচনে অংশ নিতে কোনো বাধা ছিল না। ১৯৮৪ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্তি শুরু হওয়ার পর এখন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী শতভাগ বেতন সরকারি তহবিল থেকে লাভ করেন এবং অবসরের পর আনুতোষিক ভাতাও পেয়ে থাকেন। ফলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেসব শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্ত, তারা এবং এমপিওভুক্ত নন এমন শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকারের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক হুবহু একরকম নয়। এমপিওভুক্ত নন, এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণের পূর্ববৎ স্থানীয় শাসনের বা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।
Representation of the People Order, 1972 (P.O. No. ১৫৫ of ১৯৭২)-এর Article 12-এর Explanation-এ লাভজনক পদ বলতে-প্রজাতন্ত্রের সার্বক্ষণিক বেতনভুক্ত অফিস, পদ বা অবস্থান, অথবা সরকারি সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ কিংবা সরকার-নিয়ন্ত্রিত ৫০%-এর বেশি শেয়ারযুক্ত পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির সার্বক্ষণিক বেতনভুক্ত অফিস, পদ বা অবস্থান বোঝানো হয়েছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীগণ লাভজনক পদে আছেন কিনা! বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির পূর্বে শিক্ষক-কর্মচারীগণ প্রজাতন্ত্রের কোনো বেতনভুক কর্মচারী হন না। ফলে তখন তাদের অবস্থান প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদের বাহিরে। অতীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি বা সরাসরি সরকারিকরণের পূর্বে শিক্ষক-কর্মচারীগণ অনায়াসে প্রার্থী হতে পারতেন। এখন এমপিওভুক্তির কারণে শিক্ষক-কর্মচারীগণ প্রজাতন্ত্রের সার্বক্ষণিক পদে নিযুক্ত। এমন নয় যে, ক্লাশ চলা কালেই কেবল শিক্ষক। একজন শিক্ষক সব সময়ের জন্যই শিক্ষক। তারা বেতনভুক সার্বক্ষণিক কর্মচারী হিসেবে গণ্য হওয়ায় স্থানীয় শাসনের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নির্বাচনে অযোগ্য করার জন্য নির্বাচন কমিশন আইন সংশোধনের যে সুপারিশ করেছে, আমার মনে হয় তার আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল না। অতীতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীগণ রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকায় ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করায় মনোজগতে এখনো সেই চিত্র বিরাজ করছে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও অনেক শিক্ষক-কর্মচারী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়ে গেছেন। অনেকেই শিক্ষক পদে থেকেও রাজনীতি করা তাদের ন্যায়সংগত অধিকার বলে মনে করেন এবং স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। অনেকের ভেতরে এই ধারণা কাজ করে যে, যেহেতু স্থানীয় শাসনের মেয়র, চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর বা সদস্যপদসমূহ লাভজনক পদ হিসেবে ঘোষিত নয়, বিধায় শিক্ষকতার পাশে স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠানের কোনো পদে অধিষ্ঠিত থাকলে নিয়ম ভঙ্গ হয় না। স্থানীয় শাসনের কোনো নির্বাচিত পদকে লাভজনক পদ ঘোষণা করা হলে মেয়াদ উত্তীর্ণের পর একই পদে থেকে পুনরায় প্রার্থী হওয়া যেত না। সে কারণেই স্থানীয় শাসনসহ জাতীয় সংসদের সদস্যপদসমূহকে লাভজনক পদের বাহিরে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯-এ পরিষদের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা বিষয়ক ৬৪ অনুচ্ছেদের ধারা ২৬(২) (৬) অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য যে কোনো সার্বক্ষণিক পদে নিযুক্ত থাকা ব্যক্তিবর্গের ন্যায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীগণও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কোনো পদে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব