অপরাধের হটস্পট টঙ্গী

রাজধানীর প্রবেশদ্বার টঙ্গী এখন অপরাধের বিস্তৃত করিডর হয়ে উঠেছে। বস্তি, রেললাইন, শিল্পকারখানার আশপাশ ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাদকের বিস্তারের সঙ্গে বাড়ছে ছিনতাই, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, সহিংসতা, হত্যা এবং নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা। পুলিশের মামলার পরিসংখ্যানেও এর প্রতিফলন রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে টঙ্গী পূর্ব থানায় ৮৪২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯৭টি মাদকসংক্রান্ত, যা মোট মামলার প্রায় ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ থানাটিতে দায়ের হওয়া প্রায় প্রতি দুই মামলার একটি মাদককে ঘিরে। ছয় মাসে ৮৪২টি মামলা হলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচটি মামলা হয়। মাদকসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা প্রতিদিন গড়ে দুইটির বেশি। একই সময়ে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, অস্ত্র, ছিনতাই, সিঁধেল চুরি ও ডাকাতির মামলাও হয়েছে।

পুলিশের হিসাবে মামলা: পুলিশের হিসাবে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত টঙ্গী পূর্ব থানায় নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৬৬টি। অস্ত্র আইনে ২৮টি, ছিনতাইয়ের ২০টি, হত্যার ১০টি, সিঁধেল চুরির ৯টি এবং ডাকাতির দুটি মামলা হয়েছে। অন্যান্য অপরাধে মামলা হয়েছে আরো ৩১০টি।

উদ্বেগজনক চিত্র: সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। গত ১ সেপ্টেম্বর গোপালপুর এলাকায় নূরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত এবং দুই পায়ের রগ কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পুলিশ-স্থানীয় সূত্রে হত্যার পেছনে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের কথা উঠে এসেছে। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত চলছে।

মাদক কেনাবেচার অভিযোগ: টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। বস্তি, রেললাইনসংলগ্ন এলাকা, শিল্পকারখানার আশপাশ ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এসব অভিযোগ বেশি। স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর এসব এলাকার কিছু অংশে অপরাধীদের আনাগোনা বাড়ে। মাদক কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গ্রুপগুলোর মধ্যে নিয়ন্ত্রণ ও লেনদেন নিয়ে বিরোধ ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য অপরাধেও। তবে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের সঙ্গে মাদকের সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না, তা তদন্তেই নিশ্চিত হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন: নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। মার্চে টঙ্গী পশ্চিম থানার বড়দেওড়া শিংবাড়ী এলাকায় ১৮ বছর বয়সি এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। পুলিশ ঐ মামলায় তিন জনকে গ্রেফতার করে। জুলাইয়ে একই থানার কলাবাগান এলাকায় এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়। আসামি গ্রেফতারে দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে।

ছিনতাইয়ের ঘটনা ছিনতাইয়ের ঘটনাও কম নয়। জুনে টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশ দক্ষিণ আরিচপুর ও বড় দেওড়া এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে ছিনতাই ও ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের তথ্যমতে, তাদের কাছ থেকে চাপাতি, ছুরিসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দুটি পৃথক মামলা হয়েছে। জুলাইয়ে টঙ্গী পূর্ব থানার গাজীপুরা এলাকায় চলন্ত অটোরিকশা থামিয়ে এক নারী যাত্রীর ওপর হামলা ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ছুরি ও চাপাতি উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ। ঐ ঘটনায় অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে টঙ্গী পূর্ব এলাকায় ৪২ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিভিন্ন সময়ে বাধার মুখে: মাদকপ্রবণ এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে 'আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিভিন্ন সময়ে বাধার মুখে পড়েছে। টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি, এরশাদনগরসহ কয়েকটি এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। এসব ঘটনায় মাদক, অস্ত্র ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ একসঙ্গে সামনে এসেছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি টঙ্গী রেল স্টেশন এলাকায় পুলিশের ওপর হামলা করে হাতকড়াসহ এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে এক পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে এ ঘটনায় কয়েক জনকে গ্রেফতার করা হয়।

মূল কারবারিদের একটি অংশ ধরাছোঁয়ার বাইরে: স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকবিরোধী অভিযান চললেও মূল কারবারিদের একটি অংশ ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে খুচরা বিক্রেতা ও সেবনকারীদের গ্রেফতার করা হলেও নতুন করে একই ধরনের কারবার গড়ে ওঠে।