মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা উপেক্ষিত

নিষিদ্ধ প্লাস্টিক ফিরল সচিবালয়ে

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০০

এক বছর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সচিবালয়ের ভেতরে পলিথিন ও সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের বোতলের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সভা-সেমিনারও ছিল প্লাস্টিকমুক্ত। মনিটরিং টিম গঠন করে প্রায় প্রতিদিন পুরো কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারকি করা হয়েছিল। সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সরকারি অফিস ও সচিবালয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়ে পরিপত্রও জারি করা হয়েছিল।

কিন্তু কয়েক মাস পরই কঠোর অবস্থান শিথিল হতে শুরু করে। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। বর্তমানে মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বৈঠকেও ব্যবহার করা হচ্ছে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের বোতলজাত পানি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগ ও করপোরেট প্রভাবের কারণে আগের কঠোরতা আর বজায় নেই। মন্ত্রিপরিষদের নির্দেশনা উপেক্ষা করেই অবাধে প্লাস্টিক  ব্যবহার হচ্ছে। তাদের মতে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক জায়গায় রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত না মানার প্রবণতা থাকলে কোনো সিদ্ধান্তই জনগণকে মানতে বাধ্য করা যাবে না। পাশাপাশি কঠোর নির্দেশনার পর বর্তমানের এই শিথিল অবস্থানে সরকারের পরিবেশ অঙ্গীকার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সচিবালয়ের ভেতরে পলিথিন ও সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়। প্রবেশমুখে তল্লাশির মাধ্যমে প্লাস্টিক বোতল নিয়ন্ত্রণ করা হতো। প্রয়োজন হলে কাগজের ব্যাগ সরবরাহ করা হতো। বিভিন্ন ভবনে সচেতনতামূলক বোর্ড টানানো হয়। সভা-সেমিনারে প্লাস্টিক বোতল, কাপ, প্লেট বা চামচ ব্যবহার বন্ধ ছিল। বিকল্প হিসেবে কাচের বোতল-গ্লাস, পাটজাত পণ্য, কাপড়ের বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহূত হয়েছে। পুরো কার্যক্রম তদারকিতে মনিটরিং টিমও কাজ করেছিল। এই উদ্যোগের নেপথ্যে ছিলেন তত্কালীন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তার উদ্যোগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সব মন্ত্রণালয়কে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধের কঠোর নির্দেশনা দেয়। সরকার নিজে উদাহরণ তৈরি করে, যাতে বেসরকারি খাতও উত্সাহিত হয়।

তবে গত কয়েক দিন সচিবালয়ে ঘুরে প্রতিটি মন্ত্রণালয়েই কর্মকর্তাদের কক্ষে প্লাস্টিকের বোতল দেখা গেছে। অতিথি আপ্যায়নের ক্ষেত্রেও জগ-গ্লাসের পরিবর্তে প্লাস্টিকের পানির বোতল সরবরাহ করা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে দেখা যায়, শুধু সিঙ্গেল ইউজ নয়, একই বোতলে বারবার পানি ঢুকিয়ে সেটাও ব্যবহার করছে। এছাড়া সচিবালয়ের ভেতরে পর্যটন রেস্টুরেন্টেসহ অন্যান্য ক্যাফেটেরিয়ায় পানির প্লাস্টিক বোতল ব্যবহার হচ্ছে। এর বাইরে সচিবালয়ের ভেতরে পলিথিনের ব্যবহারও লক্ষ্য করা গেছে। কর্মকর্তাদের জন্য সচিবালয়ের ভেতর কিংবা বাইরে থেকে খাবার আনা হয়। এসব খাবার আনার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া মন্ত্রণালয়গুলোতে কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন মিটিংয়েও বাইরের খাবারের সঙ্গে প্লাস্টিকের চামচের ব্যবহার দেখা গেছে।    

পরিবেশবিদদের মতে, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। এসব প্লাস্টিক সহজে পচে না, মাটিতে শত বছর পর্যন্ত থেকে যায়। নদী-খাল পেরিয়ে সাগরে গিয়ে সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষতি করে। প্লাস্টিক পণ্য ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে খাদ্যচক্রে ঢুকে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে। পোড়ালে নির্গত হয় বিষাক্ত গ্যাস, যা শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

সচিবালয়ে নিষিদ্ধ প্লাস্টিকের বোতল কীভাবে ঢুকছে—এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তারা কথা বলতে রাজি হননি। তবে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা এখনো চলমান। এটা সত্য যে, সচিবালয়ে বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারে শিথিলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নিষিদ্ধের শুরুর দিকে আমরা প্রতিদিন সচিবালয়ের গেটে অভিযান পরিচালনা করেছিলাম। কঠোরভাবে মনিটরিং করতাম। যা এখন বন্ধ। আর এই শিথিলতার সুযোগে আগের মতো প্লাস্টিকের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। এই কর্মকর্তা আরো বলেন, এটি একটি ভালো উদ্যোগ, এটা শুধু সচিবালয় নয়, প্লাস্টিকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। বিশেষ করে ব্যাপকভাবে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম ও পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ বিষয়ে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, সচিবালয়সহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ১৭ ধরনের সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক পণ্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচারণাও চালানো হয়। তখন মোটামুটি সব দপ্তরে নির্দেশনা মানাও হয়েছিল। কিন্তু সামপ্রতিক সময়ে আবার প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পণ্য সুলভে সহজলভ্য করতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা স্বেচ্ছায় এই পণ্যের ব্যবহার থেকে বিরত থাকে।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন