সব স্টলে চলে এসেছে। মেলায় পা রেখেছে শেষ সপ্তাহে। তাই এখন মেলায় ‘বই কিনবার বেলা’। প্রিয় লেখকদের বই যেমন বিক্রি হচ্ছে। একইসঙ্গে পাঠকরা খুঁজে নিচ্ছেন তরুণ লেখকদের। আর তরুণ লেখকরাও মেলায় এসেছেন নানা স্বাদের বই নিয়ে। এবারের মেলায় জনপ্রিয় সাহিত্যিক লেখকদের পাশাপাশি, বিশেষ আলোচিত বিষয় তরুণ লেখকদের বই। গত কয়েক বছরে বেশ ক’জন তরুণ লেখক তাদের অবস্থান পোক্ত করেছেন। দিনে দিনে প্রতিশ্রতিশীল তরুণ লেখকরাও আসছেন। তারা উপন্যাস, গল্প, কবিতা, গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করছেন। পাশপাশি বিচিত্র বিষয়ে লিখছেন। যার মধ্যে ক্যারিয়ার, উদ্দীপনামূলক লেখা, অনুবাদ, বিজ্ঞান, ইতিহাস বিষয়ক লেখা রয়েছে। মেলায় তাদের বইগুলো বিক্রিও হচ্ছে বেশ। তবে এসবের বাইরে তরুণ ও নতুন লেখকদের আরেকটি চিত্রও আছে। সেটি হলো অনেক তরুণ লিখছেন, বই প্রকাশ করছেন যাদের লেখা, বাক্যগঠনসহ নানা বিষয়ে দুর্বলতা আছে।
গত কয়েক বছরে তরুণ লেখকদের মধ্যে নিজের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন স্বকৃত নোমান। এবার মেলায় তার দুইটি বই প্রকাশ হয়েছে। এর মধ্যে উপন্যাস ‘মায়ামুকুট’ প্রকাশ হয়েছে অন্যপ্রকাশ থেকে, অন্যটি প্রবন্ধের বই ‘আঠারো দুয়ার খুলে’ প্রকাশ হয়েছে পাঞ্জেরী থেকে। তিনি বলেন, পাঠকদেরকে সবসময় নতুন কিছু দেয়ার চেষ্টা করি। বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে লিখি। বিষয়, ভাষা চূড়ান্ত না হলে লিখি না।
খ্যাতিমান তরুণ কবি পিয়াস মজিদের সাতটি নতুন বই প্রকাশ হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বই ইতিমধ্যে প্রকাশ হয়েছে। মেলায় তার গ্রন্থগুলোর মধ্যে দুইটি কাব্যগ্রন্থ- ‘ক্ষুধা ও রেস্তোরাঁর প্রতিবেশী’ (প্রথমা) ও ‘প্রেমপিয়ানো’ (পাঞ্জেরী), দুইটি প্রবন্ধের বই ‘জীবনানন্দ : আমার অসুখ ও আরোগ্য’ (ঐতিহ্য) ও ‘বঙ্গবন্ধুর বয়ানে সাহিত্য ও অন্যান্য’ (পার্ল), সাক্ষাত্কার সংকলন ‘সাক্ষাত্কার ১৭’ (মাওলা ব্রাদার্স), ব্যক্তিগত গদ্যের সংকলন ‘নির্জন নোটবুক’ (সময় প্রকাশন) এবং কিশোরতোষ বই ‘ভরদুপুরের বিভূতিভূষণ’ (কাঠপেন্সিল প্রকাশনী, পরিবেশক-অন্যপ্রকাশ)।
এই সময়ের আরেক তরুণ সাহিত্যিক মোজাফ্ফর হোসেন। পাঞ্জেরী থেকে ‘পাঠে বিশ্লেষণে বিশ্ব গল্প’ ও গ্রন্থকুটির থেকে ‘বাংলা সাহিত্যের নানা দিক’ শিরোনামে দুইটি প্রবন্ধের বই প্রকাশ হয়েছে। মেলার মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশ হবে আবুল হাসান সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া পাণ্ডুলিপি নিয়ে গল্পগ্রন্থ ‘পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা’। তার লেখনীতে যাপিত জীবনের নানা গল্পগুলো উঠে আসে ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে।
উদ্দীপনা এবং প্রেরণামূলক লেখনীতে একটি জনপ্রিয় নাম আয়মান সাদিক। অধ্যায়ন প্রকাশনা থেকে প্রকাশ হয়েছে তার লেখা ‘স্টুডেন্ট হ্যাসক’ বইটি। ইতিমধ্যে বইটি কয়েক হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। মেলায় প্রকাশ হয়েছে দৈনিক যুগান্তরের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ও কবি হক ফারুক আহমেদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নিঃসঙ্গতার পাখিরা’। তরুণ এ কবির কাব্যগ্রন্থটি বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।
এ দিকে, মেলার শেষ শুক্রবার দ্বার খুলে যায় সকাল ১১টায়। সকাল ছিল শিশুপ্রহর। বেলা ১টা পর্যন্ত শিশুরা শিশুচত্বরে আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে কাটিয়েছে। কিনেছে বই। তবে সেই সময় অন্যন্য বয়সী পাঠকদের সমাগমে মুখর ছিল মেলা। দুপুরের পর মেলায় মানুষের জনস্রোত বয়ে যায় মেলার উপর দিয়ে।
গতকাল মেলায় মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মইনুল আহসান সাবের, মোশতাক আহমেদ, কবি মুস্তাফিজ শফি প্রমুখ এসেছিলেন।
লেখক বলছি
শুক্রবার মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ‘লেখক বলছি’ মঞ্চে পাঠকের মুখোমুখি হয়েছিলেন পাঁচ লেখক। কবি আলমগীর রেজা চৌধুরী ‘উর্মিলা নগরে থাকে’, গবেষক মোস্তফা সেলিম ‘সিলেটি নাগরীলিপি সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’, গবেষক মোহাম্মদ সেলিম ‘মিডিয়া এন্ড দ্য লিবারেশন ওয়ার’, নাট্যকার সাধনা আহমেদ ‘গাঙকুমারী’, খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার ‘নক্ষত্রের নিচে’ উপন্যাস নিয়ে পাঠকের মুখোমুখি হন।
নতুন বই
বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলার ২২তম দিনে ৩১৪টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে গল্প ৪০, উপন্যাস ৩৩, প্রবন্ধ ১৮, কবিতা ১২৪, গবেষণা ৯, ছড়া ১৩, শিশুসাহিত্য ১৪, জীবনী ৮, রচনাবলি ৩, মুক্তিযুদ্ধ ৭, নাটক ৪, বিজ্ঞান ৩, ভ্রমণ ২, ইতিহাস ৮, রাজনীতি ১, স্বাস্থ্য ১, কম্পিউটার ১, রম্য/ধাঁধা ৪, ধর্মীয় ৩, অনুবাদ ২, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ৪ এবং অন্যান্য বিষয়ের উপরে আরও ১২টি নতুন বই এসেছে। এর মধ্যে অন্যপ্রকাশ থেকে এসেছে ফরিদুর রেজা সাগরের ‘এবারো হাফ ডজন ছোটকাকু’, বলাকা প্রকাশন থেকে এসেছে শরীফা বুলবুলের ‘অপারেশন ১৯৭১’, মূর্ধণ্য থেকে এসেছে ইকবাল খোরশেদের ‘বাংলার লোকঐতিহ্য পরিচয়’।
মেলামঞ্চের আয়োজন
মেলামঞ্চে সকালে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, সঙ্গীত এবং সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতার পুরস্কার প্রদান করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, শিশুরা লেখাপড়া করে কেবল ডাক্তার-প্রকৌশলী হবে এমন নয়। সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে তারা বিশ্ববিখ্যাত হতে পারে। শিশুরা একদিন তাদের মেধা ও মনন দিয়ে আমাদের দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশা করেন তিনি।
গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার শতবর্ষ : ফিরে দেখা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. মাহবুবুল হক। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন সাইফুদ্দীন চৌধুরী, আলী হোসেন চৌধুরী এবং এম আবদুল আলীম। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী।
আরও পড়ুন: নকল পণ্যের কারখানায় ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস
কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ করেন কবি মুস্তাফিজ শফি, মাহবুব আজীজ, কুমার চক্রবর্তী, জাহানারা পারভীন, তুষার কান্তি দাশ, মাজুল হাসান, প্রত্যয় জসীম এবং আয়শা ঝর্ণা। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী ফয়জুল আলম পাপ্পু ও মাহমুদুল হাকিম। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল- নটরাজ, ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী, নৃত্যজন এবং ফাল্গুনী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সংস্থার শিল্পীবৃন্দের পরিবেশনা।
ইত্তেফাক/আরকেজি

