ঢাকা বুধবার, ২২ মে ২০১৯, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
৩৫ °সে


সাগরে সাত বছরে গ্যাস জরিপই শুরু করা যায়নি

সাগরে সাত বছরে গ্যাস জরিপই শুরু করা যায়নি
ফাইল ছবি

সমুদ্রসীমা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে ২০১২ সালের মার্চে। ভারতের সঙ্গে বিরোধও শেষ হয়েছে ২০১৪ সালের জুলাইয়ে। জরিপ, অনুসন্ধান শেষ করে বিরোধ নিষ্পত্তির পরের বছরেই বাংলাদেশের সীমারেখার পাশেই গভীর সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু করেছে মিয়ানমার। সব কাজ শেষে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের সন্ধান পেয়েছে ভারতও। অথচ বাংলাদেশ আজও নিজেদের সমুদ্রসীমায় সেই জরিপ-অনুসন্ধানই শুরু করতে পারেনি। গভীর সমুদ্রে বিপুল গ্যাস-খনিজ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও আজও তা অজানা-অচেনাই রয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের স্থলভাগের প্রমাণিত মজুদ শেষ হয়ে আসছে। গ্যাস সংকটের কারণে ভুগছে শিল্প, আবাসিক ও বাণিজ্যিকসহ সব শ্রেণির গ্রাহক। সংকট মেটাতে বিদেশ থেকে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানিও শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে এ আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের; কিন্তু সমুদ্রে থাকা বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগানো হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশ বেশ দেরি করে ফেলেছে। কোন পদ্ধতির জরিপ করবে এবং কাকে দিয়ে জরিপ পরিচালনা করাবে এ নিয়েই দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করেছে। এখনো এক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির পর কেটে গেছে সাত বছর। ভারতের সঙ্গে নিষ্পত্তি হয়েছে সাড়ে ৪ বছরেরও বেশি সময় আগে। এ দীর্ঘ সময়েও গ্যাসের অনুসন্ধান করতে না পারা হতাশাজনক ও আশঙ্কাজনক।

বাংলাদেশ তৈল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলার) একাধিক কর্মকর্তা জানান, সরকার মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভে পদ্ধতিতে বঙ্গোপসাগরে জরিপ পরিচালনা করতে চায়। এটি সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। বিদেশি কোন সংস্থার মাধ্যমে এ জরিপ পরিচালনা করা হবে তা বাছাই নিয়েও সময়ক্ষেপণ হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পসকো দাইয়ু এখন এ জরিপ পরিচালনার জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এখন জরিপ পরিচালনা ও ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছে সরকার। তবে মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভে ছাড়াও অনুসন্ধান কাজ পরিচালনা করা যায়। মিয়ানমার এবং ভারতও তা-ই করেছে। তিন দেশের সমুদ্রসীমা একই বৃহত্তর কাঠামোতে রয়েছে। যেহেতু ওই দুই দেশ গ্যাসের সন্ধান পেয়েছে। বাংলাদেশও মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভে ছাড়াই সরাসরি অনুসন্ধানে নামতে পারে।

মিয়ানমার অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এন্টারপ্রাইজের ওয়েবসাইট এবং দেশটির পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু করেছে তারা। বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানা ঘেঁষে অবস্থিত মিয়া ও শোয়ে কূপ থেকে ইতোমধ্যে কয়েক ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলিত হয়েছে। সেই গ্যাস তারা নিজেদের বাজারে বিক্রি ছাড়াও চীনে রপ্তানি করছে।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যদি চলতি ফেব্রুয়ারিতেও মাল্টি-ক্লায়েন্ট সার্ভে করার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলেও এর সব আনুষঙ্গিকতা শেষ করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। এরপর যে কোম্পানিকে দিয়ে সার্ভে করাবে, তারা নিজ খরচে সার্ভে করবে; কিন্তু অন্তত ১৫ বছর প্রাপ্ত সব তথ্যের মালিকানা থাকবে তাদের। এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাও সেই তথ্য না কিনে ব্যবহার করতে পারবে না। যে কোম্পানি সার্ভে করবে তারা আগ্রহী বিদেশি কোম্পানির কাছে তথ্য বিক্রি করবে। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে কোনো কোম্পানি সম্ভাবনাময় মনে করলে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় আসতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় সরকার মাল্টি-ক্লায়েন্ট সার্ভে শুরুর পর জ্বালানি অনুসন্ধানের মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু হবে অন্তত সাত বছর পর। অন্যদিকে মিয়ানমার ও ভারতের পদ্ধতি অনুসরণ করলে এক বছরের মধ্যে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করা সম্ভব।

কোন অবস্থায় বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র

২০০৮ সালে অফশোর বিডিং রাউন্ডে বাংলাদেশের সমুদ্র অঞ্চলকে পানির গভীরতা অনুযায়ী দুই অংশে উপস্থাপন করা হয়। অগভীর সমুদ্র অঞ্চলকে ১১টি ব্লকে ও গভীর এলাকাকে ১৫টি ব্লকে ভাগ করা হয়। মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তির পর ২০১২ সালের ডিসেম্বরে কয়েকটি ব্লকের সীমানা নতুন করে নির্ধারিত হয়।

গভীর সমুদ্রের ১৫টি ব্লকের মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র একটিতে জরিপের কাজ শুরু হয়েছে। ডিএস-১২ ব্লকটিতে দ্বি-মাত্রিক জরিপ শেষে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের কাজ করছে দক্ষিণ কোরীয় কোম্পানি পসকো দাইয়ু। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের পর ত্রি-মাত্রিক জরিপের কাজ শুরু করবে প্রতিষ্ঠানটি। গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজে বাংলাদেশের অগ্রগতি এ পর্যন্তই।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে ডিএস-১২ ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে পেট্রোবাংলা। এতে যৌথভাবে দর প্রস্তাব জমা দেয় কনকোফিলিপস ও স্টাট অয়েল। পরে কনকোফিলিপস এ ব্লকে কাজ করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। পরিপ্রেক্ষিতে ব্লকটিতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজটি থেমে থাকে প্রায় দুই বছর। ২০১৭ সালে ব্লকটিতে জরিপ, খনন ও উত্তোলনে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি পসকো দাইয়ুর সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ। পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তিতে প্রথম দুই বছরে ১ হাজার ৮০০ লাইন কিলোমিটার দ্বি-মাত্রিক জরিপ, তৃতীয় বছরে ১ হাজার বর্গকিলোমিটার ত্রি-মাত্রিক জরিপ এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করার শর্ত দেওয়া হয়। যদিও বাংলাদেশের জলসীমা ঘেঁষেই একের পর এক নতুন কূপ আবিষ্কার ও সেগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলন করতে থাকে মিয়ানমার।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী মার্চে দ্বি-মাত্রিক জরিপের সময় শেষ হতে চললেও এখনো ওই জরিপের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ শেষ করেনি পসকো দাইয়ু। এজন্য আরো নয় মাস সময় দেওয়া হবে কোরীয় কোম্পানিটিকে। একই সঙ্গে তারা অনুসন্ধান কাজের জন্য অংশীদার খুঁজছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ভূতত্ত্ববিদ ড. বদরুল ইমাম বলেন, সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি। অথচ এ গ্যাস সবার আগে আমাদেরই প্রয়োজন ছিল। এটি অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। উন্নয়নের জ্বালানি সরবরাহেও এটি বড় শূন্যতা হিসেবে রয়ে যাবে।

আরও পড়ুন: পাশের ভবনে আগুন ছড়িয়েছে, নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ৩২ ইউনিট

বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ভূতত্ত্ববিদ মো. আব্দুল বাকী বলেন, গভীর সমুদ্রে গ্যাস পাওয়ার সম্ভবনা বিপুল। জরিপে সময়ক্ষেপণ না করে ভারত ও মিয়ানমারকে অনুসরণ করে সরাসরি অনুসন্ধানে যেতে পারে বাংলাদেশ। তা না হলে আরো সময়ক্ষেপণ হবে।

ইত্তেফাক/আরকেজি

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২২ মে, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন