সমাজের প্রহরী

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২১, ০২:০৩

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সংজ্ঞা-সূত্র নিয়ে রয়েছে নানা মত। ইউনেসকোর হ্যান্ডবুকে উল্লেখ রয়েছে, ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য হচ্ছে গোপন বা লুকিয়ে রাখা তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা। সাধারণত ক্ষমতাবান কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এসব তথ্য গোপন রাখে। কখনো হয়তো-বা বিপুল বা বিশৃঙ্খলভাবে তথ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, যা চট করে খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই কাজের জন্য একজন সাংবাদিককে সাধারণত প্রকাশ্যে বা গোপনে নানা উত্স ব্যবহার করতে হয়, ঘাঁটতে হয় নানা নথিপত্র।’ অর্থাত্ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় তথ্য হেঁটে আসে না, ঘেঁটেই বের করতে হয়। ডাচ-ফ্লেমিশ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সংঘ ভিভিওজের অভিমত অনুযায়ী, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কিংবা প্রতিবেদন সেসব প্রতিবেদনকেই বুঝায়, যেসব প্রতিবেদন, বিশ্লেষণাত্মক ও কোনো একটি বিষয়কে সাংবাদিক তলিয়ে দেখার চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে পেশাদার সাংবাদিকদের যে অভিমত রয়েছে তা হলো, পদ্ধতি বা পরিকল্পনামাফিক অনুসন্ধান গভীর ও মৌলিক গবেষণা, গোপন তথ্য উন্মোচন। আবার অনেকেই মনে করেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় কিংবা প্রতিবেদনে ব্যাপকভাবে তথ্য ও নথিপত্র ব্যবহার হয়ে থাকে। এ ধরনের মূল প্রতিবেদনের বিবেচ্য সামাজিক ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অত্যন্ত গভীর ও কঠিন কাজ। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ব্যাপক গবেষণা ও কঠোর পরিশ্রমের ফসল। অর্থাত্ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও প্রতিবেদন ব্যাপকার্থে একটি রাষ্ট্র কিংবা সমাজের একেবারে গভীর থেকে তুলে আনা অনেক উপাদানের সমন্বয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বৈশিষ্ট্য রয়েছে অনেক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, অনুসন্ধানের কৌশল নির্বাচন নির্ণয় করা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে, উেসর ওপর তথ্যের ব্যাপারে নির্ভর করা এবং সত্যাসত্য নির্ণয়ের জন্য গভীর থকে গভীরে যাওয়া। নিয়মানুগ অনুসন্ধানমূলক এই কাজের জন্য একজন সাংবাদিককে বরাবরই অনেক ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয় এবং এর দৃষ্টান্ত বিশ্বে অনেক আছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। রাষ্ট্র-সমাজ এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদমাধ্যম অর্থাত্ ব্যাপক অর্থে গণমাধ্যম অনেক বড় সহায়ক শক্তি। গণতান্ত্রিক সংজ্ঞা-সূত্র ও বিকশিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এ কারণেই গণমাধ্যম-সংবাদমাধ্যমে স্বাধীনতা অনেকাংশেই নিশ্চিত এবং এর সুফল ভোগ করে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক। উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুসমূহে তো বটেই, আমাদের মতো উন্নয়নশীল অনেক দেশেও সংবাদমাধ্যম এখন অনেক বিস্তৃত-সমৃদ্ধ। এর পরিসর বৃদ্ধির ফলে সাংবাদিকদের কাজের পরিধিও বেড়েছে এবং সাংবাদিকতায় যোগ হয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা, যা অনেক ক্ষেত্রেই চমকপ্রদও বটে।

ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান এবং ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার্স অ্যান্ড এডিটর্সের সাবেক নির্বাহী প্রধান ব্র্যান্ট হিউস্টন বলেছেন, ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কাজ করার নতুন পথ দেখায়। এই কৌশলগুলো ধীরে ধীরে প্রতিদিনকার সাংবাদিকতার সঙ্গে মিশে যায় এবং শেষ পর্যন্ত গোটা পেশারই মান বাড়ায়।’ জার্মান ফাউন্ডেশন কনরাড অ্যাডেনোয়ার স্টিফটুং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার একটি উল্লেখযোগ্য ম্যানুয়াল। ইংরেজি ভাষায় রচিত গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কেসবুক নামে একটি গাইডলাইনমূলক গ্রন্থে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের কর্মপন্থা এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির রূপরেখা বর্ণিত হয়েছে। এমন আরো অনেক গ্রন্থ কিংবা তথ্য অনুসন্ধানমূলক সূত্র রয়েছে যেগুলোর মাধ্যমে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করা যায় ও এর মধ্য দিয়ে প্রতিবেদন তৈরির পথ নির্ণীত হয়েছে। আমাদের দেশের বাস্তবতায় রাজনৈতিক বিষয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কম হলেও অন্য অনেক বিষয়েই তা হচ্ছে কমবেশি।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কয়েকটি কেস স্টাডি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সাংবাদিকতার ধারা কতটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। ক. ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বহুল প্রচারিত পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক সুজান স্মিথ, জেমস ভি রিমান্ডিং, আর জেফরি সংস্কারের নামে মার্কিন কংগ্রেসে ওয়াশিংটন লবিস্ট জ্যাক আব্রামোফের দুর্নীতিবিষয়ক প্রতিবেদন তৈরি করে সাড়া ফেলেছিলেন এবং এ নিয়ে তারা ব্যাপকভাবে সম্মানিতও হয়েছিলেন। অর্জন করেছিলেন শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কারও। যুক্তরাষ্ট্রের অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ড্যালিয়েন এলসবার্গ রাষ্ট্রের প্রতাপশালীদের গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন—সাপের লেজ দিয়ে কান চুলকানো খুবই বিপজ্জনক হলেও এটাই অনুসন্ধানী সাংবাদিকের কাজ। এলসবার্গের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি ও তথ্য চুরির অভিযোগ আনা হয়েছিল। ঐ ঘটনার জল গড়িয়েছিল অনেক দূর। এলসবার্গের ‘দ্য পেন্টাগন পেপারস’ ফাঁস করার চার দশক পর দেখা যায় আরেকটি যুগান্তকারী ঘটনা। আমেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির তরুণ বিশ্লেষক এডওয়ার্ক স্লোডেনের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে ২০১৩ সালের জুন মাসে অনুসন্ধানী সাংবাদিক গ্লান গ্রিনওয়াল্ড, লরা পোস্টাস, ব্রান্ট্রন জেলমে স্লোডেনের ফাঁস করা তথ্যের সূত্র ধরে অনুসন্ধান করতে গিয়ে যে আলোচিত প্রতিবেদনের জন্ম দিয়েছিলেন, আমেরিকার ওয়াশিংটন পোস্ট আর ব্রিটেনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় তা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ‘পানামা পেপারর্স’ সাম্প্রতিক কালে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এমন কোনো তথ্য নেই যা সেখানে উঠে আসেনি। জার্মানির একদল সাংবাদিক অনেক দিন অনুসন্ধান করে সাড়া জাগানো, বিস্ময়কর সব তথ্য তুলে ধরেন।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের মূল লক্ষ্য জনস্বার্থের সংরক্ষণ। আমরা বিশেষ করে মার্কিন সাংবাদিকতার ইতিহাসে সেই দৃষ্টান্ত খুব বেশি দেখি। নথি যত গুরুত্বপূর্ণ কিংবা গোপনীয়ই হোক, জনস্বার্থে তা প্রকাশযোগ্য। সরকার, রাজনীতি, রাষ্ট্র কিংবা ধর্ম কোনো আবরণেই জনগণকে ধোঁকা দেওয়া যাবে না। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির ঘটনায় প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন কীভাবে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তাও সচেতন মানুষমাত্রই অজানা নয়।

লেখক: নিবন্ধকার

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন