দেশের মোট জনসংখ্যা ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি। ২০২১ সালের মাঝামাঝি আদমশুমারি হওয়ার কথা। মোট জনসংখ্যায় নারীর সংখ্যা আনুপাতিক হারে বাড়লেও আর্থিক খাতে নারীরা এখনো পিছিয়ে। ব্যাংক ও এমএফএস সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা এখনো অনেক দূরে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারীরা দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছেন। অনেকেই নানা রকম অনলাইন ব্যবসায় যুক্ত আছেন, অনলাইনেই কেনাবেচা করছেন পণ্য বা আরো কিছু। তা ছাড়া করোনাকালে শিশুদের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে সহায়তা দিচ্ছেন তাদের মা বা অন্য স্বজনেরা।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারীরা আগের তুলনায় তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। উচ্চ শিক্ষায় ও কর্মক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি, সর্বোপরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারীরা দেশের অর্থনীতিতে এখন অকল্পনীয় ভূমিকা রাখছেন। গ্লোবাল ফিল্ড ইনডেক্সের গবেষণা অনুযায়ী ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের ক্ষেত্রে পুরুষের সংখ্যা ৬৫ শতাংশ, কিন্তু নারীর সংখ্যা ৩৫ শতাংশ। ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯ শতাংশ। কম্পিউটার নলেজের ক্ষেত্রে শহরের চেয়ে গ্রামের নিম্নবিত্ত নারীর অবস্থান বেশ দুর্বল। আবার ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ৩৬ শতাংশ ব্যবহারকারী পুরুষ। নারীর ক্ষেত্রে এ হার ১৬ শতাংশ। ফলে নারীর একটি বিরাট অংশ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারছে না।
বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে আমরা দেখতে পাই, আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও নারীরা অনেক দূরে। এর একটি কারণ হচ্ছে মোবিলিটি চ্যালেঞ্জেস। কিন্তু ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জ কমানো সম্ভব। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে বেশ কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে, যা নারীরা সহজেই এর সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন। ব্যাংকিং সেক্টর নানা আনুষঙ্গিক খরচ বহন করার ক্ষেত্রে গ্রাহকের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারে, ব্যাংকিং চাহিদা পূরণ করতে পারে এবং একই সঙ্গে সঞ্চয়ের ভালো সুযোগও তৈরি করতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে যেহেতু নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, তাই আমরা জানি নারী উপার্জন করতে পারেন, কিন্তু আয়ের ওপর কিংবা সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা অনেক কম। বাংলাদেশ সরকার আরএমজি খাতে মজুরি প্রদানের ক্ষেত্রে ডিজিটাল পেমেন্টের ওপর জোর দিয়েছে। প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন তৈরি পোশাকশ্রমিক তাদের বেতন ডিজিটাল প্রসেসের মাধ্যমেই পাচ্ছেন। ২০২১ সালে এই হার ৯০ শতাংশ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সুফল হিসেবে নারীরা সঞ্চয়ের জন্যও ডিজিটাল ব্যাংকিং কিংবা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবেন। আমরা জানি, শ্রমবাজারে নারীর সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এর জন্য নারীর আর্থিক সংগতি বাড়ছে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গেছে, ফরমাল ব্যাংক থেকে ইনফরমাল ব্যাংকে নারীর আগ্রহ বেশি। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর ভূমিকা এ ক্ষেত্রে দুর্বল।
আমাদের সমাজের অনেক পরিবারে এখনো নারী মানেই ঘরের কাজ ও সংসার সামলানোর নির্ভরক্ষেত্র। অর্থাত্, নারী বাইরের কাজে অনেকটাই যেন কন্ডিশনাল। ঘরের সামগ্রিক কাজ সেরে বাইরে তাদের অনেককেই কাজ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে পারিবারিকভাবেও ব্যাংকিং সিস্টেমের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নারীকে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কর্মক্ষম ও শিক্ষিত নারী ঘরের কাজ করতে গিয়ে তারা আয় কিংবা সঞ্চয় করতে অক্ষম হন। নারীর অর্থনৈতিক সচ্ছলতার জায়গা অনেক ক্ষেত্রেই অনেকটা পরিবারের ওপর নির্ভরশীল।
অর্থনীতি ও উন্নয়নের সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নারীর হাতের নাগালে প্রযুক্তির সব সুবিধা থাকা দরকার। নারীকে এ ব্যাপারে দক্ষ হতে হবে। নিজস্ব ফোন অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, পুরুষের তুলনায় নারীর এ ধরনের ফোনের সংখ্যা অনেক কম। পারিবারিক কিংবা সামাজিক যোগাযোগের জন্য পুরুষ হয়তো নারীর হাতে ফোন কিনে দিচ্ছেন কিংবা অন্যের সাহায্য নিয়ে নারী ফোন কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। অথচ পুরুষের বেলায় প্রায় শতভাগ সুযোগই পুরুষের নিজেদের অর্জিত টাকা দিয়ে কিনছেন, যেখানে মাত্র ১৫ শতাংশ নারী তার নিজস্ব আয় থেকে ফোন কিনে ব্যবহার করতে পারছেন।
কোভিড-১৯ দুর্যোগকালে নারী উদ্যোক্তারা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখনো এর রেশ কাটেনি। যারা ডিজিটাল প্ল্যাটফরম ধরতে পেরেছেন, শুধু সেই নারীরাই টিকে রয়েছেন। সরকার ডিজিটাল অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে নানা প্রকল্প নবায়ন করেছে এবং এ পরিকল্পনা সামনে রেখে কাজও করছে। এজন্য কম্পিউটারের ওপর দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিয়েছে সরকার। কীভাবে ডিজিটাল সুযোগের সদ্ব্যবহার করা যায়—এই লক্ষ্যে সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়নের সুফল এখন অনেক নারীই পাচ্ছেন। বিশেষ করে করোনকালে তা অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকিং কিংবা ইনডেপেন্সির ক্ষেত্রে দেখা যায়, ৬১ শতাংশ নারী নানা কারণে ঋণ নিয়ে থাকেন, যা জাতীয় পর্যায়ে ৩৫ শতাংশ প্রায়। একজন নারী যে শুধু আর্থিক জোগানই দিচ্ছেন তা-ই নয়, ঘর-সংসারও সমানভাবে সামাল দিচ্ছেন।
ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এক বিবৃতিতে বলেছেন, ব্যাংক ভাইভার জন্য লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ২০ জনের মধ্যে প্রথম সারির ১২ জনই নারী। এটাই হলো নতুন বাঁক পরিবর্তন। প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ প্রকল্পের ৬০ শতাংশই নারী। সরকার নারীকে এ ক্ষেত্রে ক্ষমতায়নের এক ধাপ তৈরি করে দিয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছাড়াও বিকাশ, নগদ, রকেট ও আরো কিছু মাধ্যমে নারীরা ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক সুবিধা পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। নারীর ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার ক্ষেত্রে যে দূরত্ব বা ব্যবধান রয়েছে, তা-ও সমাধানের চেষ্টা করছে সরকার। তবে একটি বিষয়ে লক্ষ্য দেওয়া উচিত, বিনা বেতনের নারী শ্রমিকদের স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবার মনোযোগী হওয়া জরুরি। যেমন—যারা গৃহস্থালি কাজে যুক্ত আছেন, তাদের কথা ভাবতে হবে। তাদের কাজের মূল্যায়ন আর্থিকভাবে করতে হবে।
প্রযুক্তিবিদ এম শামসুজ্জামান খানের অভিমত, প্রযুক্তির জটিলতা দূর করে যত সহজ করা যাবে, ততই এর সুফল মিলবে। একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের নারীদেরও এ ব্যাপারে উপযুক্ত হয়ে ওঠার পথ সুগম করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারকাঠামোর বিভিন্ন স্তরের সহায়তায় এই কার্যক্রম হাতে নেওয়া যেতে পারে। সমাজসেবা অফিসের মাধ্যমে তা করা যেতে পারে। প্রযুক্তির যে বিকাশ ঘটছে কিংবা ক্রমান্বয়ে তা আরো বিকাশ ঘটবে—এর সুফল অর্থনৈতিক-সামাজিকভাবে পেতে হলে পিছিয়ে থাকা নারীর দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। তাহলেই সুফলটা দৃশ্যমান হবে সর্বব্যাপী।
n লেখক :নিবন্ধকার

