অনেকের মতে, আমরা মাদকের সাগরে ভাসিতেছি। কেবল আমরা নহি, এই বিশ্বের অনেক বড়ো বড়ো দেশও মাদকের সমস্যা নির্মূলে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করিবার পরও হিমশিম খাইতেছে। বাংলাদেশে কোন কোন রুট ধরিয়া এবং কীভাবে নূতন রুট তৈরি করিয়া ইয়াবা পাচারের জাল বিছানো হইয়াছে—তাহার স্পষ্ট চিত্র পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয় প্রায়শই। সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশে এখন নানান হাত বদলের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাহাদের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম প্রধান খাত হিসাবে গড়িয়া তুলিয়াছে এই মাদক ব্যবসায়। জানা গিয়াছে, কেবল ইয়াবা বড়ির জন্যই মাদকসেবীরা বত্সরে খরচ করিয়া থাকে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা! মাদকের নেশায় ছেলের হাতে খুন হইয়াছেন শত শত বাবা-মা। স্বামীর হাতে খুন হইয়াছেন আড়াই শতাধিক নারী। মাদক সেবন লইয়া বিরোধে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটিয়াছে ছয় সহস্রাধিক।
এই সকল কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলিয়াছিলেন, আমরা আমাদের সন্তানদের এইভাবে ধ্বংস হইয়া যাইতে দিতে পারি না। এই জন্য আমরা পরবর্তী পর্যায়ে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা শুনিয়াছি। দেশব্যাপী ‘সাঁড়াশি অভিযানের’ কথা শুনিয়াছি মাদক নির্মূলে; কিন্তু অনেকের মতে, উহা আসলে মাদকের ‘বিশাল হ্রদে’ ‘সামান্য ঢেউ’ মাত্র। কাহারা মাদক ব্যবসায়ী, কাহাদের সহিত লেনদেন, কোথা হইতে কীভাবে আসিয়া দেশের একটি উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে পৌঁছাইয়া যায়—তাহা কে না জানে? প্রশাসন তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অগোচরে এই দুষ্কর্ম চালাইয়া যাওয়া অসম্ভব। মাদক ব্যবসায়ীরা অ্যামিবার মতো রূপ বদলাইতে পারে অত্যন্ত চাতুর্যের সহিত। উহারা যখন যাহারা ক্ষমতায় থাকে তাহাদের বড়ো নেতানেত্রীর ছবি-সাইনবোর্ড টাঙাইয়া কথিত অফিস খুলিয়া বসে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, উহা বাহিরের খোলস মাত্র। এই ব্যবসা চালাইবার শর্তই হইল যখন যেই দল ক্ষমতায় থাকিবে তখন তাহার ছায়ায় ঢুকিয়া পড়া। প্রশ্ন উঠিতে পারে, ছায়া চাহিলেই কি তাহা পাওয়া যায়? উত্তর রহিয়াছে মাদকের কাঁচা অর্থের নিকট। কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তা মনে করেন, ৫০ টাকার মাদক আনিয়া যদি ৫০০ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব হয়, তাহা হইলে এই ব্যবসায় কেন ছাড়িবে মাদক ব্যবসায়ীরা? এত বিপুল কাঁচা টাকার লোভ সামলাইবার মতো ইস্পাতদৃঢ় আদর্শ অনেকের মধ্যেই নাই। এমনকি ইতিপূর্বে পুলিশের অনুসন্ধানে দেখা গিয়াছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের একটি অংশও এই ব্যবসায়ের সহিত নানানভাবে জড়িত।
মাদক সম্ভবত জানে কাহাকে কীভাবে বুঁদ করিতে হয়। ষাটের দশকে ‘ড্রাগ এবিউজ’ কথাটা প্রথম প্রচার পায়। মার্কিন সমাজে মাদকাসক্তি বিষয়ে উদ্বেগের উত্থানও তখন হইতেই। আর আমাদের দেশে মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটে আশির দশকে। মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সারাদেশে দফায় দফায় সাঁড়াশি অভিযান চালাইবার পর শত মাদক ব্যবসায়ী বন্দুকযুদ্ধে নিহত এবং প্রায় অর্ধলক্ষ গ্রেফতার হইয়াছে; কিন্তু মাদকের স্রোত তাহাতে রুদ্ধ হয় নাই। তাই প্রশ্ন তোলাই যায়, মাদক নির্মূল কি এতই সোজা? সরিষার কত গভীরে ঢুকিয়া পড়িয়াছে ভূত—তাহা কে দেখিবে? কে করিবে নির্মূল?ত্

