ঢাকা সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯, ৯ বৈশাখ ১৪২৬
২৯ °সে

১৬ ডিসেম্বর বিজয় ও মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন

১৬ ডিসেম্বর বিজয় ও মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন
ছবিতে মুক্তিযোদ্ধারা।

বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরব ও অহংকারের বিষয় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাস ধরে তিল তিল করে জীবন দিয়ে, রক্ত দিয়ে, অশ্রু দিয়ে, বীর মুক্তিযোদ্ধারা নির্মাণ করে গেছেন বিজয়সৌধ। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ যে সৌধের ওপর তাঁদের স্বপ্নের তাজমহলের মতো সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে।

১৬ই ডিসেম্বরের উষালগ্নে মুক্তিযোদ্ধারা আজ স্মরণ করবে তাদের হারিয়ে যাওয়া সেই প্রিয়জনদের মুখগুলো।

মুক্তিযুদ্ধের ৪৮ বছর পরেও ক’জন জানেন যে, আমাদের ৩১৫ জন মুক্তিযোদ্ধা আটকা পড়ে চার দিন শুধু পানি খেয়ে বেঁচে ছিল? ৬নং এইচকিউ-তে বসে সেক্টর কমান্ডার খাদেমুল বাশার সাহেব পর্যন্ত প্রায় ধরে নিয়েছিলেন যে তারা মারাই গেছে। সে ইতিহাস আপনারা কেউ কি কখনো জানতে চেয়েছেন? মুক্তিযুদ্ধের সুবাদে চকচকে রাজধানীতে বসে, যারা জৌলুস বাড়াচ্ছে, ধন-সম্পদ, ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ি আর বাড়াবাড়ি করছে তাদের কাছে সেই ‘দুঃখের চার রাতের’ ইতিহাসের কি কোনো মূল্য আছে?

সেই ‘দুঃখের চার রাত’ ছিল ৩রা সেপ্টেম্বর থেকে ৬ই সেপ্টেম্বরের রাত। এই রাতের শুরু হয়েছিল আরো আগে তিস্তার গা বেয়ে শঠিবাড়ি বন্দরের বুকে।

মুক্তিবাহিনীর পজিশন ছিল শঠিবাড়ির উত্তর ও পূর্ব দিকে। তাদের এক মাইল পেছনে তিস্তা নদী বয়ে চলেছে। তিস্তা নদীর অপর পাড়ে পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে এফ এফ কোম্পানি নং ৭-এর কমান্ডার হারেসউদ্দিন সরকার (বীরপ্রতীক) ৩১৫ জন এফ এফ নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছেন। হানাদার পাকিস্তানিদের ডিফেন্স হচ্ছে শঠিবাড়ি বন্দরে দক্ষিণ এবং পশ্চিম সাইডে। এক কোম্পানি ফোর্স নিয়ে। সিমেন্টের মজবুত বাংকারে মেজর হায়াত্ শক্তিশালী ডিফেন্স নিয়ে দীর্ঘ ছয় মাস বসে আছে। তাদের সাথে আছে ইপি ক্যাপ (ইপিআর-এর ধরনের সে-সময় পাকিস্তানি ফোর্সদের গঠিত আরেকটি বাহিনী) এর ১ কোম্পানি, রাজাকার ছিল শ’ তিনেক। তার ওপর পেছনে ছিল আর্টিলারি। হেভি মেশিনগান, সিক্স ইঞ্চ মর্টার, এলএমজি, রকেট লঞ্চার থ্রি ইঞ্চি মর্টার, এসব ছিল পাকিস্তানি হানাদারদের যুদ্ধাস্ত্র। অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ছিল ৪টি এলএমজি, ১টি থ্রি ইঞ্চি মর্টার, কিছু স্টেনগান আর বাকি সব থ্রি নট থ্রি।

সেক্টর কমান্ডার খাদেমুল বাশার সাহেবের নিকট থেকে ৭নং কোম্পানি কমান্ডার নির্দেশ পান শঠিবাড়ির হানাদারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য। প্রথম দিকে মুক্তিযোদ্ধারা ‘হিট অ্যান্ড রান’ পদ্ধতি অনুসরণ করে পুরা আগস্ট মাস। সেপ্টেম্বর মাসের ২ তারিখ পর্যন্ত তাদের ব্যস্ত রাখে। ইতিমধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা গড়ে তোলে পাকা বাংকার। শঠিবাড়ি বন্দরের পূর্ব ও উত্তর দিকে পাকিস্তানি হানাদারদের এক হাজার গজ দূরে এই সব বাংকার তৈরি করে মুক্তিযোদ্ধারা মনোবল বাড়িয়ে তোলে। এবং এই সময় মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তানি হানাদাররা যার যার পজিশনে থেকে গোলাগুলি চালিয়ে যেতে থাকে।

সেপ্টেম্বরের ২ তারিখ। কোম্পানি কমান্ডার হারেসউদ্দিন সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদারদের ৬০০ গজ দূরত্বের মধ্যে চলে আসে। ২রা সেপ্টেম্বর রাত ৩টায় কমান্ডার নিজে এসএলআর নিয়ে হানাদার পজিশনে ফায়ার ওপেন করে দেয়। শুরু হয় মরণ যুদ্ধ। হারেসের ছেলেরা প্রতিজ্ঞা করে শঠিবাড়ি বন্দর দখল না করে তারা ফিরবে না।

শঠিবাড়ি হাইস্কুলের ভেতরে নির্মিত দুর্ভেদ্য ঘাঁটি থেকে শেল বর্ষণ করে খান সেনারা। শুরু হলো তুমুল যুদ্ধ। খানসেনাদের মুহুর্মুহু শেল ও রকেটের আঘাত এসে পড়েছে মুক্তিবাহিনীর ওপর। ভাঙছে বাংকার, আহত হচ্ছে মুক্তিসেনা। ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাকে পেছনে। সামনে এগুচ্ছে আরেকজন মুক্তিসেনানী, করছে আঘাত শত্রুর বাংকারে, পজিশনে। গোলাগুলি আর আর্তনাদে ভরে উঠল ডিমলা থানার শঠিবাড়ি বন্দর। সমান গতিতে যুদ্ধ চলছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কেউ এক ইঞ্চি পিছু হটছে না। সমানে সমান। একদিকে কমান্ড করছে হানাদার বাহিনীর দুর্ধর্ষ মেজর হায়াত। অন্যদিকে শ্যামল বাংলার এক তরুণ বীর হারেসউদ্দিন সরকার। এক বাহিনী ছুড়ছে কামানের গোলা, রকেট ও শেল। অন্য বাহিনী দুয়েকটি এলএমজি আর থ্রি নট থ্রি দিয়ে তার জবাব দিচ্ছে।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যাচ্ছে। ৪ তারিখ শনিবার সকাল থেকে যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে গেল। হারেসউদ্দিন সরকার কয়েকজন সাহসী সাথীকে নিয়ে পরপর কয়েকটি সম্মুখের বাংকার পার হয়ে অ্যাডভান্স করে গেলেন সম্মুখপানে। হানলেন এলএমজি’র নিখুঁত আঘাত হানাদার বাহিনীর মেন পজিশন শঠিবাড়ি স্কুলের ভেতরের বাংকারে। দুপুর বারোটার দিকে চাঞ্চল্য দেখা গেল হানাদারদের বাংকারে এবং ডিফেন্স পজিশনে। দ্বিগুণ শক্তিতে হারেসের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ছুটে যেতে লাগল সম্মুখপানে। সে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। শঠিবাড়ি বন্দর আর কয়েক মিনিটের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের করায়ত্ত হবে। প্রতিটি বাংকারের মুক্তিযোদ্ধারা বৃষ্টির ঝাঁকের মতো গুলি ছুড়ছে। হানাদার বাহিনী তাদের ডিফেন্স লাইন ছেড়ে পিছনে হটে যাচ্ছে। বীর হারেস, বীর তার বাহিনী, বুকে থ্রি নট থ্রি চেপে ধরে সম্মুখপানে গড়িয়ে গড়িয়ে দখল করছে সামনের ভূমি। মরিয়া হয়ে টিপে যাচ্ছে থ্রি নট থ্রি ট্রিগার। জয় তারা ছিনিয়ে আনবেই। হানাদারকে পালাতে হবে শঠিবাড়ি থেকে। ট্রেন্ড পাকিস্তানি বাহিনী তাজ্জব বনে গেল। এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডে এগিয়ে আসছে থ্রি নট থ্রি হাতে বাঙালি তরুণ বালক। অব্যর্থ গুলি ছুড়ছে তাদের বাংকারে। ছেড়ে যেতে হচ্ছে তাদের ডিফেন্স পজিশন।

কোম্পানি কমান্ডার হারেসউদ্দিন ঘোষণা করে দিলেন ৪ঠা সেপ্টেম্বর সূর্য ডোবার আগেই শঠিবাড়ি বন্দর মুক্ত হয়ে যাবে। তিনশ’ মুক্তিযোদ্ধা দম ধরে গুলি চালিয়ে যাচ্ছে হানাদারদের প্রত্যেকটা বাংকারে। শঠিবাড়ি বন্দরের জয় অত্যাসন্ন। আক্রমণের মুখে আর দাঁড়াতে পারছে না হানাদাররা। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে পতন হয়ে যাবে। মুক্তিযোদ্ধারা পতাকা তুলে ধরে ‘জয় বাংলা’ বলে চিত্কার করছে।

এমন সময় হানাদার এল আকাশ পথে। ৪ঠা সেপ্টেম্বরের শঠিবাড়ি বন্দরে যখন মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের জন্য উদ্যোগ নিচ্ছে, পশ্চিম গগনে সূর্য যখন ঢলে পড়েছে, ঠিক তেমন সময় গর্জন করতে করতে এল দু’টি হেলিকপ্টার। হারেসউদ্দিন ও তার বাহিনীর বাংকারের পজিশনে বৃষ্টির মতো বোমা ফেলল তারা। আক্রোশে ক্ষোভে মুক্তিযোদ্ধারা এলএমজি’র ফায়ার করল। হেলিকপ্টার দুটো চলে গেল প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন পজিশনে বোমাবর্ষণ করে। ডান পায়ে এবং ডান হাতে এবং কপালে বোমার আঘাতে আহত হলেন সেই বীর তরুণ যিনি ছিলেন সেই তিনশ’ পনের জন মুক্তিযোদ্ধার বীর নায়ক। আহত হলো আরো অনেকে। এক নিমিষেই নিভে গেল সেই মু্ক্তিযোদ্ধাদের জয়ের আশা। রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত আহতদের ব্যান্ডেজ ও ফার্স্ট এইড শুরু হলো। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল ৬নং এইচকিউ-এর সাথে সকল যোগাযোগ। খাবার ও অন্যান্য সামগ্রীর ওপর বোমা পড়ায় সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেল। যদিও অস্ত্র ও গোলাবারুদের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের বাংকার এবং ডিফেন্স থেকে গুলি বন্ধ হওয়ায় হানাদার বাহিনী শুরু করল নতুন উদ্যমে গোলাবর্ষণ। সেই অসহায় অবস্থায় ৪ঠা সেপ্টেম্বর রাত্রে অনেক মুক্তিযোদ্ধা যখন হতাশ হয়ে পড়ছিল তখন রক্তাপ্লুত কোম্পানি কমান্ডার চিত্কার করে বললেন, ‘‘যুদ্ধ চলবে, মৃত্যু পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে, কেউ এক ইঞ্চি পিছু হটবে না। কাউকে যদি পিছনে তাকাতে দেখি, এই আহত অবস্থায় তার ওপরে আমি গুলি চালাব। জন্মভূমির বুকে বীরের মতো লড়ে প্রাণ দাও সবাই। হেড কোয়ার্টার থেকে আমরা তিনশ’ জন বিচ্ছিন্ন, বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। ধরে নাও আমরা সবাই মরে গেছি”। তিনি সবাইকে অনুরোধ করে বললেন, “মৃত্যুর আগে একবার শেষ লড়াই লড়ে যাও। মুখে কলেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ তুলে নিয়ে এসো মাকে মুক্ত করার জন্য আমরা এখানে মরে যাই”। মু্ক্তিযোদ্ধারা প্রাণ ফিরে পেল। আবার ফিরে গেল বাংকারে। হাতে তুলে নিল থ্রি নট থ্রি। এমনিভাবে পার হয়ে গেল চার তারিখ রাত। পাঁচ তারিখ সারাদিন যুদ্ধ চলল। সন্ধ্যায় দু’পক্ষেই ফায়ার বন্ধ হলো। সারা রাত আহতদের সেবা-শুশ্রূষা হলো। ছয় তারিখ ভোরে হানাদার বাহিনী সিক্স ইঞ্চি মর্টার ও রকেট লঞ্চার দিয়ে তুমুল আক্রমণ শুরু করল।

একদিকে খাবার নেই। আড়াই দিন পার হয়ে যাচ্ছে। শুধু পানি খেয়ে ও লতাপাতা চিবিয়ে বেঁচে আছে তিনশ’ পনের জন মুক্তিযোদ্ধা। শুধু ব্যান্ডেজ বেঁধে আহতরা পড়ে আছে বাংকারে। সামনের দিক থেকে ছুটে আসছে পাকিস্তানি কামানের গোলা, মেশিনগানের গুলি। সবকিছু অনিশ্চিত। সবদিক দিয়ে বিচ্ছিন্ন। তবু মুক্তিযোদ্ধারা লড়াই চালিয়ে গেল। সবকিছু অনিশ্চিত জেনেও দাঁতে দাঁত কামড়ে জীবন বাজি ধরে লড়ে গেল শঠিবাড়ি বন্দরে। কেউ জানল না তাদের বীরত্বগাথা। কেউ জানতে পারল না কী অসীম বীরত্বে, ধৈর্যে অনিশ্চিত অন্ধকারের মধ্যে বিচ্ছিন্ন অভুক্ত বঙ্গ জননীর তিনশ’ বীর সন্তান কী অসীম তেজে লড়েছিল!

ছয় তারিখ রাত আটটায় শঠিবাড়ির ডান দিকের মুক্তিযোদ্ধারা আকস্মিকভাবে তিনশ’ গজ ছুটে গিয়ে হানাদারদের কয়েকটি ডিফেন্স পজিশন দখল করে নেয়। এটা ছিল একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ। সেই ডিফেন্স লাইনে ছিল প্রায় দেড়শ’ রাজাকার। তারা অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে। আহত কোম্পানি কমান্ডারের নির্দেশ মোতাবেক সেই রাজাকারদের মুক্তিযোদ্ধাদের ফ্রন্ট লাইনে বসিয়ে হানাদারদের বিরুদ্ধে গুলি চালাবার আদেশ দেয়া হয়। ধৃত রাজাকাররা সে আদেশ পালন করে। এর ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বেড়ে যায়। চাঙ্গা হয়ে ওঠে তারা। ৬ই সেপ্টেম্বর সারারাত গুলি পাল্টা গুলি চলতে থাকে। ৭ই সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ২০ মিনিটে শঠিবাড়ি বন্দরের বুকে উড়ল মুক্তির পতাকা। রণক্লান্ত হয়ে পাকিস্তানি হানাদাররা ভেগে গেল ৩/৪ মাইল পেছনে।

স্বাধীন বাংলা বেতারের ওয়ার করেসপন্ডেন্ট

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২২ এপ্রিল, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন