হতাশার এক মেটাফোরের নাম সড়ক

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৩৬

সড়কে নেমে যেসব অবিশ্বাস্য দৃশ্যের মুখোমুখি হই তাতে প্রথমেই যে কথাটি মনে হয় তা হলো সড়ক আসলে কার? এখানে পায়ে হাঁটা মানুষের অধিকারই এখন সবচেয়ে কম। কমতে কমতে শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেটাই প্রশ্ন। সড়ক আসলে তাদের যারা দলবদ্ধভাবে সমস্ত পরিবহন ব্যবস্থাটাই অচল করে দিতে পারে।

ঢাকা শহরের পুরোনো জমি, পতিত জমি, জলাভূমি, জলাশয় যখন যেখানে সম্ভব গত পাঁচ দশক ধরে সেখানেই গড়ে উঠেছে জনবসতি। যে পরিমাণ বসতি, তার তুলনায় পরিবহন নিতান্ত স্বল্প। চাহিদার চেয়ে জোগান কম হওয়ায় পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা মাস্তানিকে প্রায় বৈধ করে ফেলেছেন। কারণে-অকারণে, কখনো অতি তুচ্ছ কারণে ধর্মঘট ডাকাটা পরিবহন-সংশ্লিষ্টদের ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এই ব্যাধি থেকে প্রতিকারের পথও সহসা বের করা সম্ভব বলে মনে হয় না। কারণ হঠকারী ধর্মঘটীরা সংঘবদ্ধ কিন্তু জনগণ সংঘবদ্ধ নয়। তাই জনগণকে চরম বিপদে ফেলে তারা কথায় কথায় ধর্মঘট ডাকতে পারে আর নিরীহ জনগণ চরম বিপদগ্রস্ত হলেও সামান্য প্রতিবাদ করতে ভয় পায়। যাত্রীদের মতামতের তোয়াক্কা না করে নির্দিষ্ট নিয়মের চেয়েও শেয়ারে বেশিসংখ্যক যাত্রী তোলা, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা—এসব গণপরিবহনের যাত্রীদের কাছে এখন মামুলি সমস্যা। 

ড্রাইভার কিংবা সহকারীর সঙ্গে সামান্য বচসায় পরিবহন থেকে ধাক্কা দিয়ে যখন তখন নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফুটপাতে দাঁড়ানোর জায়গা নেই, দুটি বাসের সংকীর্ণ পরিসরের মধ্যে কোনোরকম একটু দাঁড়ানোর জায়গা করে নিতে না নিতেই আরেকটি বাস এসে চাপা দিয়ে যাচ্ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে, সেই মানুষটির সঙ্গে মরছে পুরো পরিবার—এরপর আইন দিয়ে তাদের ছুঁতে গেলে বাধিয়ে দেন ধুন্ধুমার কাণ্ড। সম্ভবত বাংলা মুল্লুকে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী মগরা তাদের স্বেচ্ছাচারিতার রিলেরেসের কাঠিটি রেখে গেছে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের হাতে। একই দেশের জনগণ একই ভাষা একই সংস্কৃতি একই গায়ের রং, তার পরও যাত্রীরা ভাগ্যলক্ষ্মী নয় প্রতিপক্ষ।

তিন

নগরায়ণের চাপে ঢাকা বহু আগেই কংক্রিট ফ্ল্যাটের জঙ্গল হয়ে উঠেছে। যে অস্বাভাবিক পরিমাণে জনস্ফীতি ঘটেছে এখানে, তার তুলনায় গণপরিবহন যেমন অপ্রতুল, রাস্তাঘাটও তেমনি অপর্যাপ্ত। মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো আছে পার্কিংয়ের সমস্যা। প্রতিদিন ঢাকা শহরে যে অর্ধকোটি যানবাহন ইঁদুরের মতো দৌড়ে বেড়ায় তাদের নেই থিতু হয়ে হাঁপ ছাড়ার কোনো জায়গা। যানবাহনও এখানে বিপদগ্রস্ত, যাত্রী তো বটেই। চালকদের সমস্যাও বুঝি। মানবেতর তাদের ডিউটি। যাত্রী-যানবাহন-চালক সম্মিলিত সমস্যার চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে পরিবহনব্যবস্থা। এই চক্র থেকে বের হতে হলে যে প্রাথমিক সদিচ্ছা দরকার তার যথেষ্ট অভাব চালকদের রয়েছে। কেন তারা ভাবেন—প্রণীত আইনটি ষড়যন্ত্রমূলক? তাদের বিপদে ফেলার জন্যই এটি করা হয়েছে? এই ভাবনা যারা ভাবেন, সবার আগে দরকার তাদের মনস্তাত্ত্বিক চিকিত্সার। সম্ভবত একটি অমানবিক রুটিনের মধ্যে দিয়ে যান বলে তারা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায় ভোগেন। 

চার

সড়কের সমস্যা বহুমাত্রিক। ফুটপাত যা আছে তা হকারদের দখলে। পুরোপুরি হকার উচ্ছেদ হয়তো কখনো সম্ভব নয় এখানে। কারণ এর সঙ্গে জড়িত বহু উদ্বাস্তু মানুষের জীবিকার প্রশ্ন। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করবেন? নির্মাণাধীন ভবন থেকে আস্ত একখানা ইট মাথায় পড়ে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের পরিবর্তে চূড়ান্ত গন্তব্যে চলে যেতে হতে পারে। গায়ের ওপর দিয়ে শাঁ শাঁ করে চলে যাবে স্মার্ট বাইক। ভাবুন একবার যে ফুটপাত তৈরি হয়েছে পথচারীর যাতায়াতকে একটু নির্বিঘ্ন করার জন্য, সেখানে চলছে ওয়েল্ডিংয়ের মতো জীবনঘাতী কার্যকলাপ। ফুটপাতের দুরবস্থা নেমে এসেছে মূল রাস্তাতে। এখানে আবার হকারদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দৌরাত্ম্য। একটি শহরের সড়কের সত্তর ভাগ পণ্যসামগ্রীর দখলে; বাকি অংশে ঝুপড়ি হোটেল, ফাস্ট ফুডের স্টল, ফল-সবজির ভ্যান। হকারবৃত্তি নিশ্চয়ই অনিবার্য কিন্তু কেন তা উপ এবং পাতি মাস্তানের কুক্ষিগত, তার কোনো উত্তর নেই। মানবিক বিবেচনায় হকারদের জীবিকা না হয় মেনে নেওয়া গেল কিন্তু এর সঙ্গে যে অন্যায় বখরা নিচ্ছে আরো কিছু সুবিধাবাদী মানুষ এবং প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্তের একটি অংশ, তা মানাটা একরকম মানসিক চাপ হয়ে দাঁড়ায়। হকারদের রুজি-রোজগারের পথ বন্ধ না করে কীভাবে পথচারীদের ফুটপাত পথচারীদের ফিরিয়ে দেওয়া যায়, সড়ককে স্বস্তিদায়ক করার জন্য সম্ভবত এ চিন্তা সবার আগে করা জরুরি। কারণ আমাদের প্রশস্ত রাস্তার দরকার। গণপরিবহন থেকে নেমে দাঁড়ানোর জায়গা না থাকাটা সড়কে মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ। অফিসপাড়া তো বটেই, এখন লোকালয়ের রাস্তা পর্যন্ত পার্কিং প্লেসে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। যেটা পার্কিং প্লেস নয়, সেখানেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে গাড়ি। জনসংখ্যার মতো গাড়ির সংখ্যাও প্রতিদিন বাড়ছে। শহরের নিজস্ব গাড়ির সঙ্গে প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা যানবাহন। জন ও যান বিস্ফোরণের এই নগরকে যখন তিলোত্তমা নামে ডাকা হয় তখন তা আর বিশেষণ মনে হয় না, মনে হয় বিদ্রুপ। কেউ কেউ বলেন যে নগর আমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করে দেয়; কেন তাকে আমরা ভালোবাসি না? নিশ্চয়ই ভালোবাসি। ভালোবাসি বলেই চাই নগরটি সত্যিকার অর্থে তিলোত্তমা হয়ে উঠুক। তিলোত্তমা হয়ে ওঠার সমস্ত সম্ভাবনাই তো ঢাকার আছে। কিন্তু বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, দৃশ্যদূষণ এই নগরের বিষফোড়া।

পাঁচ 

সমস্যার এই দুর্লঙ্ঘনীয় চক্র থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় কী? জানা নেই। আশায় আছি মেট্রোরেলের। স্বপ্ন দেখি, ২০২১ সালে পকেটে একখানা মেট্রো কার্ড থাকবে। তখন নাক উঁচু গাড়িওয়ালা বাবুদের সঙ্গে আর দেখা হবে না সড়কে। ঘাড় ধাক্কা দেওয়ার সুযোগ পাবে না নিষ্ঠুর বাস কন্ডাকটর, দেখতে হবে না বাম্পারে বাম্পারে ঠোকাঠুকি, অসহ্য ট্রাফিক জ্যাম। তবে তার আগে পর্যন্ত সড়ককে যদি হতাশার এক মেটাফোর বলি তাহলে কি খুব বাড়িয়ে বলা হয়?

n লেখক : কথাসাহিত্যিক