ঢাকা সোমবার, ২০ জানুয়ারি ২০২০, ৭ মাঘ ১৪২৭
১৯ °সে

গ্রামের পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো

গ্রামের পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম

কয়েক দিন আগে দিনাজপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত আমার গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সময়ের অভাবে প্রায় এক যুগ ধরে সেখানে যাওয়াই হয়নি। এবার গ্রামে গিয়ে যা দেখলাম তা রীতিমতো চমকে যাওয়ার মতো ঘটনা। বদলে গেছে আমার গ্রামের চিত্র। সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রার মানসহ সবকিছু। গ্রামের সর্বত্র লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। টিন এবং মাটির ঘরের বদলে উঠেছে দালান। কোথাও কোথাও বহুতলবিশিষ্ট ভবন। এখন গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে বিদ্যুত্, স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন এবং নলকূপ।

গ্রামে আগে স্কুলই ছিল না। আমি ছোটো থাকতে বাড়ি থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে হেঁটে ঈদগাহবস্তি স্কুলে যেতাম। এখন গ্রামে প্রাইমারি, মাধ্যমিকসহ বেশ কয়েকটি স্কুল এবং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ধনী-গরিব সবার ছেলেমেয়েরাই স্কুলে পড়ছে। প্রায় প্রতিটি স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়ের হাতে মোবাইল ফোন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তারা দেশ-বিদেশের খবর পাচ্ছে। আইটি সার্ভিস মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। গ্রামের ঘরে ঘরে টেলিভিশন। ডিশ অ্যান্টিনার মাধ্যমে দেশ-বিদেশের খবর পাচ্ছে।

আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীতে আগে মাঝিরা দাঁড় টেনে বৈঠা বেয়ে নৌকা চালাত। এখন ইঞ্জিন লাগিয়ে নৌকা চালায়। ফলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মানুুষ তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যেতে পারে। আগে গরু দিয়ে লাঙলের মাধ্যমে জমি চাষ করা হতো। দু-একজন বাদে এখন সবাই ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করছে। কৃষিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আমি দেখেছি আগে আমাদের গ্রামের কৃষকরা বছরে একটি মাত্র ফসল পেত। এখন তিনটি ফসল পায়। আগে ভূমি থেকে ধান আনত গরুর গাড়িতে, এখন ট্রাক্টরে। আগে বিঘা প্রতি চার-পাঁচ মণ ধান হতো, এখন ৪০ মণ পর্যন্তও হচ্ছে। আগে আমাদের গ্রামে ধান মাড়াত হাত দিয়ে কাঠের ওপরে মেড়ে। এখন মেশিন দ্বারা ধান মাড়ায়। আগে ধান কাটত হাত দিয়ে, এখন মেশিনে কাটে। অধিকাংশ কৃষকের ঘরে রয়েছে সেচযন্ত্র।

যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন অনেক উন্নত। আমাদের পুরো গ্রামে এখন পাকা রাস্তা। এসব রাস্তায় বাস, ট্রাক, রিকশা, ভ্যান ইত্যাদি চলাচল করে। আগে গ্রামে মাটির চুলায় খড়ি দিয়ে রান্না হতো। এখন প্রতিটি বাড়িতে গ্যাসের চুলায় রান্না করে। আগে ঢেঁকিতে ধান কুটে চাল বানাত। এখন মেশিনে ধান ভাঙাচ্ছে। শুধু আমার গ্রাম নয়, পুরো দিনাজপুরসহ সারা বাংলাদেশের সর্বত্রই উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। সরকারের সহায়তার পাশাপাশি মানুষ নিজের চেষ্টায়ও ভাগ্য বদল করেছে। ফলে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সঙ্গে সঙ্গে গড় আয়ু এবং মাথাপিছু আয়ও বেড়েছে। সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উেক্ষপণ করা হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে ২ নম্বর স্যাটেলাইট উেক্ষপণ হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার, নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ বৈষম্যদূরীকরণ, পোশাক ও রেমিট্যান্স খাতে সাফল্য, কৃষি বিপ্লব, শিক্ষা ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য এখন বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে রীতিমতো রহস্য। ঈর্ষান্বিত অনেক উন্নত দেশও। সামাজিক ও জীবনমানের সূচকে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্বের সর্ববৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে। এটি শুধু আমরাই বলি না, বিশ্ব বরেণ্য ভারতীয় অর্থনীতিবিদ নোবেল বিজয়ী অমর্ত্যসেনও বলেন।

জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও ইউনেস্কোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে রীতিমতো শিক্ষাবিপ্লব ঘটে গেছে। সার্বজনীন গণসাক্ষরতা, বিদ্যালয় ছাত্র বৃদ্ধির হার, ড্রপ আউটের হার প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা ছাত্রছাত্রীর সমতাসহ শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অধিকাংশ সূচকেই বাংলাদেশ এখন বিশ্বের জন্য দৃষ্টান্ত। ইউনেস্কোর হিসাব মতে, বিগত বছরে ৯৬ শতাংশ শিশুকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এখনকার বয়স্ক শিক্ষার হার ৫৯ শতাংশ। এবং এই সূচক ক্রমশ ঊর্ধ্বগামী। বছরের প্রথম দিনে কোটি শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই আজ শুধু বাংলাদেশেই নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য জ্বল জ্বলে একটি এগিয়ে যাওয়ার ফটোফ্রেম।

বাংলাদেশের শিল্প ক্রমশ বিকশিত হচ্ছে। যার পুরো ভাগে রয়েছে গার্মেন্ট শিল্প। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদেশগুলোতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস রপ্তানির গড় প্রবৃদ্ধি ১১ শতাংশের ওপর। গার্মেন্টস রপ্তানিতে চীন, ভিয়েতনামের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। প্রবৃদ্ধির হার বিবেচনায় আশা করা যায়—আগামী দশকেই বাংলাদেশ অন্তত ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে যাবে। বর্তমানে এ খাত থেকে বাংলাদেশ আয় করছে বার্ষিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালের লক্ষ্যমাত্রা ৫০ বিলিয়ন ডলার। গার্মেন্টসের পিছু পিছু এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ, জাহাজ নির্মাণের মতো কয়েকটি খাত। বাংলাদেশের ওষুধ এখন রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়ার ৮০টি দেশে। মোট দেশজ চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশ ওষুধ এখন বাংলাদেশেই উত্পাদিত হচ্ছে। আশা করা যায়, এ খাত আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাতে পরিণত হবে। বাংলাদেশের তৈরি জাহাজ এখন যাচ্ছে বিশ্বের অন্য প্রান্তরেও। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আর্থসামাজিকসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যায় উন্নয়নের ছোঁয়া। এ উন্নয়নে মানুষের জীবনে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আর্থিকভাবে প্রতিটি পরিবারই এখন সচ্ছল। বাংলাদেশের এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। উন্নয়নের এ ধারা যেন কিছুতেই ব্যাহত না হয়। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশকে জানাই ‘স্যালুট’। সাবাস বাংলাদেশ।

n লেখক : সাবেক পুলিশ ও র্যাব কর্মকর্তা

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২০ জানুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন