আবদুল মান্নান
বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র যে হচ্ছে তা আঁচ করার জন্য গণক হওয়ার প্রয়োজন নেই। চারদিকের অবস্থা বিশ্লেষণ করলে তা পরিষ্কার বোঝা যায় আর নির্দ্বিধায় বলা যায়, যারা এই কর্মের সঙ্গে জড়িত তাদের অনেকেই বঙ্গবন্ধুকন্যার অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন ও কাছের মানুষ। এই বিষয়ে যাওয়ার আগে মঙ্গলবার (১৭ ডিসেম্বর) বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা একটি সোজাসাপটা প্রশ্ন রেখেছেন, তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। এই দিন শেখ হাসিনা বলেন ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যদি কেউ সাহস করে প্রতিবাদ করত, তাহলে দেশে বারবার ক্যু হতো না; জনগণের ওপর এত অত্যাচারও হতো না। জাতিকে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করতে না পারার খেসারত দিতে হচ্ছে।’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, ‘দেশে এত বড়ো ঘটনা ঘটল, জাতির পিতাকে হত্যা করা হলো, কেউ আগে থেকে কিছু জানতে পারল না!’ প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভের সঙ্গে আরো বলেন, ‘কেউ কোনো পদক্ষেপ নিল না, কেউ কোনো প্রতিবাদ করল না! জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লাশ পড়ে থাকল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে, কেন? এত বড়ো সংগঠন, এত নেতা কোথায় ছিল?’ বঙ্গবন্ধুকন্যাকে যারা কাছ থেকে চেনেন তারা জানেন, তিনি যা বিশ্বাস করেন তা অকপটে বলেন।
মঙ্গলবার শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের সামনে রেখেছেন এমন একটি প্রশ্ন, যা যে কোনো কন্যার পক্ষে পিতা হত্যা সম্পর্কে রাখা সম্ভব। তবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তেমন একটা কঠিন নয়। বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে বিশেষ করে তার কাছের মানুষগুলোকে অতিমাত্রায় বিশ্বাস করেছিলেন, যা ছিল অনেকটা আত্মঘাতী। তাকে হত্যা করার জন্য একটি ষড়যন্ত্র যে হচ্ছে তা তাকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ একাধিকবার জানিয়েছিল এবং ‘র’-এর তত্কালীন প্রধান আর এন কাউ নিজে এসে বঙ্গবন্ধুকে এই বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন, যা তিনি বিশ্বাস করেননি। প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউদ্দিন একবার আমাকেও একটি টিভি টক শোতে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পূর্ববর্তী সময়ে তিনি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইতে কর্মরত ছিলেন। সে সময় ডিজিএফআই থেকে লিখিতভাবে বঙ্গবন্ধুকে একটি সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত করা হয়। কিন্তু সেই নোট কখনো তার হাতে পৌঁছায়নি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার আগে তার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সব সেনাসদস্য ও অফিসার ছিল পাকিস্তানফেরত। কিন্তু এই রদবদলের কাজটি করা হয়েছিল অত্যন্ত গোপনে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল আমলাতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মিশন নিয়ে ফারুক রশিদ গং যখন সেনানিবাস থেকে বের হচ্ছে, সেই খবর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দিতে দেশের সব গোয়েন্দা সংস্থা ব্যর্থ হয়েছিল অথবা জেনেও তা গোপন করেছিল; কারণ এসব সংস্থার সেই সময়কার প্রধানরা সবাই পাকিস্তানফেরত ছিলেন অথবা একাত্তরে তারা পাকিস্তানের পক্ষে এই দেশে কাজ করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর লাশকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে রেখে যারা ১৬ আগস্ট মোশতাকের ও পরবর্তী সময় জিয়ার মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন তারা সবাই বঙ্গবন্ধুর কৃপাধন্য, যাদের মধ্যে অনেকেই আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতাও ছিলেন। তাদের ইমানের জোর কম ছিল এবং তারা জীবনের মোহকে জয় করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ব্যতিক্রম ছিলেন চার জাতীয় নেতা। তাইমুদ্দিন নামের এক তরুণ ছাত্রলীগ কর্মী এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে একটি মামলা করতে থানায় গিয়েছিলেন। তাইমুদ্দিনকে থানার দারোগা এই বলে তাড়িয়ে দেন যে, এমন একটি মামলা নিলে তার এবং নিজের বিপদ হতে পারে। তাইমুদ্দিন ঢাকা বারে ওকালতি করতেন। প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, ‘এত নেতা তখন কোথায় ছিল?’ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর অনেক সুবিধাভোগী স্বঘোষিত নেতাকর্মী দুধের মাছির মতো বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ধরেছিল। উদ্দেশ্য একটাই—কোনোরকমে দু-একটা লাইসেন্স পারমিট বাগানো আর তা ব্যবহার করে কালো ধান্ধার মাধ্যমে রাতারাতি রাস্তা থেকে উপরতলায় উঠে যাওয়া। যে ব্যক্তির একটা কাগজের বিড়ি খাওয়ার পয়সা ছিল না তার পকেটে তখন দামি বিদেশি সিগারেট শোভা পাচ্ছিল। তারাই আবার পনেরোই আগস্টের পর মোশতাক ও জিয়ার বরকন্দাজ হয়েছিল।
১৯৭৫ সালের তুলনায় বর্তমান আওয়ামী লীগ অনেক বিশাল। নেতাকর্মীর অভাব নেই। কিন্তু এটি নিশ্চিন্তে বলা যায়, বিপদের সময় এদের অনেককে পাওয়া যাবে না। এক-এগারোর পর এই অবস্থা দেখা গেছে। সে সময় সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে ছাত্রলীগ।
এবার আসি ষড়যন্ত্র বিষয়ে কিছু আলোচনায়। গত সোমবার দেশে প্রথমবারের মতো রাজাকারদের একটি তালিকা প্রকাশিত হলো মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে। এই তালিকা নিয়ে সারা দেশে ধিক্কার উঠেছে। সেই তালিকায় যেমন আছে শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম, তেমনি আছে রাষ্ট্রীয় খেতাবপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নাম। আছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাম। তালিকা থেকে পাওয়া গেল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতি করা সংসদ সদস্যদের নামও। গোলাম আরিফ টিপু, যিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌশলী, রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত, তার নামও আছে তালিকায়। এমন তালিকা কারা তৈরি করলেন? নিশ্চয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী নন? প্রস্তুত করেছেন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের আমলারা। এবং এই তালিকা যারা প্রস্তুত করেছেন, তাদের একমাত্র পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি তা বোঝার মতো ক্ষমতা তাদের নেই, তারা বাংলাদেশকে বিশ্বাস করে না এবং এই তালিকা করে তারা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের সমগ্র কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছেন, যা একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে বিশ্বাস না করার কোনো কারণ নেই। তারা মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করেছেন, ৩০ লাখ শহিদের গালে চপেটাঘাত করেছেন, সরকার ও শেখ হাসিনাকে বিব্রত করেছেন আর দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করেছেন। তারা এক ঢিলে অনেক পাখি মারার চেষ্টা করেছেন। কথায় বলে, আমলাতন্ত্র সব সময় পরবর্তী সরকারের জন্য কাজ করে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই কাজের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা কি এমন কিছুর আলামত পেয়েছেন, যা দেশের মানুষ জানে না? মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, এই তালিকা পাকিস্তানিরা তৈরি করেছিল এবং তা তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পেয়েছেন। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, তার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী এই তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। এমন পরস্পরবিরোধী মন্তব্য নিশ্চয় যে কোনো সরকারের জন্য বিব্রতকর। আ ক ম মোজাম্মেল হক বর্তমান মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠতম মন্ত্রী। একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তার কাছ থেকে তালিকা সম্পর্কে ব্যাখ্যাটি মোটেও সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, প্রয়োজনে এই তালিকা সংশোধন করা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই কাজও কি শুধু সেই অর্বাচীন আমলাদের দ্বারা করানো হবে? তাহলে তা কি ভিন্ন কিছু হবে? মনে তো হয় না।
প্রতিদিন কোথাও না কোথাও আগুন লাগছে, ট্রেন দুর্ঘটনা হচ্ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে। গত সোমবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মুখোশ পরিহিত একদল দুর্বৃত্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য তৈরি একটি প্যান্ডেল ভাঙচুর করেছে। একই সঙ্গে পেঁয়াজের সরবরাহ ও দাম সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের আগাম সতর্ক না হওয়া, পরিবহন শ্রমিকদের নৈরাজ্য সৃষ্টির লাইসেন্স দেওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্যের দামের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকা—এই সবকিছুর কোনোটাই ভালো লক্ষণ নয়। শেখ হাসিনার সামনে এই মুহূর্তে বড়ো কোনো প্রতিপক্ষ নেই, তবে প্রতিপক্ষ দাঁড় করাতে অনেকেই মনে হয় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত হলেও একটা কথা বলতে হয়, ‘বঙ্গবন্ধু তার চারপাশের মানুষগুলোকে খুব বিশ্বাস করতেন। আপনি যেন সেই ভুল না করেন সেই প্রত্যাশা করি। আপনি সব সময় ভালো থাকুন সেই প্রার্থনাই করি।’ রাজাকারদের তালিকা স্থগিত করা হোক। তা কারা করল তাদের খুঁজে বের করা হোক এবং তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একটি নির্ভুল তালিকা যাচাই-বাছাই করে আবার প্রকাশ করা হোক।
n লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক। ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯

