ড. মো. নাছিম আখতার
একটি বহুতল শিল্প প্রতিষ্ঠানের বেইজমেন্টে কর্মরত ব্যক্তিরা প্রায়ই অভিযোগ করতে লাগলেন যে সেখানে তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ দ্রুতগতিতে বেইজমেন্টে অক্সিজেনের মাত্রা মাপার জন্য বিশেষজ্ঞ নিয়ে আসলেন। নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তারা রিপোর্ট দিলেন যে, সেখানে অক্সিজেনের কোনো ঘাটতি নেই। এই রিপোর্ট সবাই জানল। কিন্তু এর পরও কর্মচারীদের শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যার অভিযোগ থেকেই গেল। এমতাবস্থায় কর্তৃপক্ষ একজন প্রোডাকশন ইজ্ঞিনিয়ারের পরামর্শ অনুযায়ী বেইজমেন্টের যে পয়েন্টগুলো দিয়ে বাতাস প্রবেশ করে সেই পয়েন্টগুলোতে সরু পাতলা কাগজ ঝুলন্ত অবস্থায় সেঁটে দিলেন। এতে ভেন্টিলেটর দিয়ে বাতাস আসার সময় কাগজগুলো নড়তে লাগল এবং এই নড়াচড়া কর্মীদের দৃষ্টি গোচরীভূত হলো। এরপর থেকে সেখানে কর্মরত কেউই আর অক্সিজেনের ঘাটতির বিষয়ে অভিযোগ করেননি।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় তা হলো মানসিক সন্তুষ্টির জন্য পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের চাইতে বাস্তব প্রমাণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বেইজমেন্টে কাজ করার কারণে কর্মচারীদের মধ্যে একটি বিষয় মানসিকভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, সেখানে অক্সিজেনের স্বল্পতা আছে। পরীক্ষায় অক্সিজেনের সঠিক পরিমাণ পাওয়ার পরও মনের দিক দিয়ে তারা নিশ্চিত হতে পারছিল না। আঠা দিয়ে কাগজ সেঁটে দেওয়ার পর বাতাস প্রবেশের কারণে সেগুলোর নড়াচড়া কর্মরত ব্যক্তিদের সম্পূর্ণরূপে মানসিক চিন্তামুক্ত করল। তারা সমস্যাটি থেকে মুক্তি পেল।
আমরা প্রায়ই শিক্ষার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পরীক্ষামূলক অনেক পদ্ধতি অবলম্বন করছি। নীতি নির্ধারকরা বিষয়গুলো গ্রহণ করেন উন্নত বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে। আমি লেখনীর মাধ্যমে নানাভাবে বোঝাতে চেষ্টা করেছি আমাদের স্কুল, কলেজের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা প্রত্যয়ী নাগরিক তৈরির জন্য মোটেও উপযোগী নয়। কিন্তু নীতিনির্ধারক ও পাঠ্যসূচি প্রণয়নকারীরা হয়তো মুচকি হাসেন এই ভেবে যে, প্রফেসর দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করেন, কোনটি দেশের জন্য ভালো তা বুঝবেন কী করে? বিষয়টি প্রথমে বর্ণিত বেইজমেন্টের ঘটনার মতো। কিছুতেই নীতিনির্ধারকদের বোঝানো যাচ্ছে না যে, আমরা ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি। সংখ্যার বিচারে আমাদের শিক্ষিতের হার বাড়ছে কিন্তু মানের বিচারে আমরা দ্রুতগতিতে পিছিয়ে পড়ছি। একটি গবেষণালব্ধ পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণী পেয়েও শতকরা ২৮ থেকে ৩৪ জন বেকার। আবার যারা চাকরি পান তাদের ৭৫ শতাংশের বেতন ৪০ হাজার টাকার কম। এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, শিক্ষার ইতিবাচক নেতিবাচক যে কোনো ধরনের পরিবর্তন শিক্ষকরাই সর্বপ্রথম বুঝতে পারেন। উন্নয়নশীল দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের মধ্যে একধরনের মানসিক বোধ তৈরি হয়েছে, তা হলো আমেরিকা যা করে তাই করতে হবে। কিন্তু বিষয়টি কী সবসময় ঠিক? আমি ঠিক নয় বললে কেউ বিশ্বাস করবেন না। তাই সবার সঠিক মানসিকবোধ সৃষ্টির জন্য আমার স্কুলজীবনের আমেরিকা প্রবাসী এক বন্ধুর বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরছি। পেশায় তিনি একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তার বেশ কিছু মৌলিক গবেষণার প্যাটেন্ট রয়েছে। গবেষণাপ্রেমী এই অধ্যাপক ২০১৯ সালে নাসা কর্তৃক প্রদত্ত ‘ফ্যাকাল্টি মেন্টর অব দি ইয়ার’ পুরস্কারে ভূষিত হন। গত ২৮/১১/২০১৯ তারিখে একটি জাতীয় দৈনিকে ‘মানসম্মত শিক্ষার অন্তরায় কোথায়?’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখি। লেখাতে আমার উপলব্ধি থেকে অন্তরায়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করি। লেখাটি পড়ে আমার সেই অধ্যাপক বন্ধু যে মন্তব্য লিখেছেন তা হুবহু তুলে ধরছি। “প্রফেসর নাছিম, আমিও শিক্ষকতার ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের ক্লাসরুমে একই সমস্যার সম্মুখীন। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ একেবারেই কমে গেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নোট লেখার পরিবর্তে তারা হোয়াইট বোর্ডের ছবি তুলে নিচ্ছে যা তাদের ক্লাসরুমের অনুশীলনকে ব্যাহত করছে। পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনাকে ছাত্রদের জন্য আমি নিঃশব্দ ঘাতক বলে মনে করি। বিশেষ করে প্রকৌশল এবং অঙ্ক ক্লাসের জন্য কথাটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য। আমি সেকালের মানুষ তাই মার্কার এবং হোয়াইট বোর্ড ব্যবহার করি।” তার মতো একজন যোগ্যতাসম্পন্ন আমেরিকান শিক্ষকের মন্তব্য আমাদেরকে ভিন্নভাবে চিন্তা করার সুযোগ করে দেবে বলে আমি মনে করি। আমেরিকার ছাত্ররা অমনোযোগী হলে অসুবিধা নেই। কারণ, তারা গরিব দেশগুলো থেকে মেধা আমদানি করবে। চাকরি না পেলেও বেকারভাতা পাবে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব ভেবে দেখেছেন কি?
দেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক সময় শিক্ষকরা ছাত্রদের ক্লাস নেওয়ার সময় ফুরিয়ার সিরিজ (Fourier Series)-এর মতো জটিল বিষয়ের ক্লাস পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইডের মাধ্যমে নেন। এতে শিক্ষার্থীরা পড়ে উভয় সংকটে। না পারে শিক্ষককে তাদের অসুবিধার কথা বলতে, না পারে ক্লাসের জটিল বিষয়গুলো ঠিকমতো অনুধাবন করতে। ফলে জ্ঞানের পরিপূর্ণতা তাদের অধরাই থেকে যাচ্ছে। আমার মতে, পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন কোনো একটি বিশেষজ্ঞ ফোরামে বিশদ কোনো বিষয়ের গবেষণালব্ধ ফলাফল অল্প সময়ে প্রকাশ করার চমত্কার একটি মাধ্যম। তবে শিক্ষার্থীদের প্রারম্ভিক পর্যায়ের ভিত্তি জ্ঞান তৈরির জন্য এর ব্যবহার না করাই উত্তম। প্রযুক্তির ব্যবহারের সুফল পেতে স্থান কাল এবং উদ্দেশ্য সব সময় বিবেচনায় আনতে হবে। হোয়াইট বোর্ড লেকচার ও পাওয়ার পয়েন্ট লেকচারের সুবিধা-অসুবিধার ওপর অনেক গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে। এগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইডের চেয়ে হোয়াইট বোর্ড লেকচার শিক্ষার্থীদের জন্য বেশি কার্যকরী। অঙ্ক ও বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো শুধু বুঝলেই চলে না, সঠিকভাবে উপস্থাপনের জন্য চাই অনুশীলন। আমরা সৃজনশীল প্রশ্নের মাধ্যমে এমন একটা আবহ তৈরি করেছি, যেখানে ছাত্ররাও যা খুশি তাই লিখছে, শিক্ষকরাও নম্বর
জনসম্পদ তৈরির মূলমন্ত্র হলো মানুষের মধ্যে সততা, ধৈর্য, সহিঞ্চুতা ও নিপুণতা সৃষ্টি করা। মানবীয় এই গুণগুলো একদিনের অর্জন নয়। দিনের পর দিন সাধনা ও অনুশীলনের মাধ্যমে এগুলো অর্জিত হয়। অনুশীলন ও নিপুণতার ঘাটতির কারণেই বাড়ছে পরীক্ষাভীতি ও উত্কণ্ঠা। ফলে তৈরি হচ্ছে না প্রত্যয়ী মানবসম্পদ। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে একমাত্র উদ্বৃত্ত সম্পদ হলো মানবসম্পদ। মানবসম্পদকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের জন্য দরকার মানসম্মত টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা। সেই সঙ্গে প্রয়োজন স্থান, কাল, উদ্দেশ্য ভেদে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার।
n লেখক :অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

