বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মসূচি ও দারিদ্র্য বিমোচন প্রসঙ্গ

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৪২

ড. এ কে আবদুল মোমেন

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের বিস্ময়। পাকিস্তানি দুঃশাসনের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভ করার পর মাত্র কয়েক কোটি টাকার বাজেট নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল যে ছোট্ট দেশটি, সেই দেশের বাজেট আজ পাঁচ লাখ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। ছোট্ট অর্থনীতির দেশটা আজ পরিচিতি পেয়েছে এশিয়ার ‘টাইগার ইকোনমি’ হিসেবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের যে কোনো সূচকের বিচারে গত দুই দশকের বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে অভূতপূর্ব। ১৯৯০-এর পর সার্বিকভাবে প্রবৃদ্ধিতে উন্নয়নশীল দেশের গড় হারের তুলনায় অনেক এগিয়েছে বাংলাদেশ। দারিদ্র্যের হার কমে অর্ধেক হয়ে গেছে। মেয়েদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদানের হার দ্রুত বেড়েছে। জনসংখ্যা, গড় আয়ু, শিশুমৃত্যুর হার, মেয়েদের স্কুলে পড়ার হার, সক্ষম দম্পতিদের জন্মনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গ্রহণের হার ইত্যাদি সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ সমপর্যায়ের উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশ, এমনকি প্রতিবেশী ভারতকে পেছনে ফেলতে সমর্থ হয়েছে। যে পাকিস্তানের হাত থেকে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ, সেই পাকিস্তানিরা আজ বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে দেখে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা।

যে সোনার বাংলার স্বপ্ন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন, যে অর্থনৈতিক মুক্তি চেয়েছিলেন মানুষের, যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন সবার জন্য, তারই সুযোগ্য কন্যা সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে সে পথেই তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন—এইচএসবিসির সর্বশেষ গ্লোবাল রিসার্চে বলা হয়েছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) নিরিখে বিশ্বের ২৬তম বৃহত্ অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান যেখানে ৪২তম। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইন ২০৩০ : আওয়ার লং-টার্ম প্রজেকশনস ফর ৭৫ কান্ট্রিজ’ শিরোনামের এই রিপোর্টে দেখানো হয়েছে, ২০১৮ সাল থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ১৬ ধাপে উন্নীত হবে। যা অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় অধিক। অর্থনৈতিক উন্নয়নের এ তালিকায় বাংলাদেশের পরেই ফিলিপাইন, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার নাম এসেছে। প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিক থেকে উন্নত দেশ নরওয়ের চেয়েও বাংলাদেশের অধিক সম্ভাবনা রয়েছে বলে এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যেমন বেড়েছে দেশের অর্থনীতির আকার, তেমনই বিস্তৃত হয়েছে বৈদেশিক বাণিজ্য। বৈদেশিক পণ্য রফতানি আয়ে অর্জিত হয়েছে নতুন মাইল ফলক। এ সরকারের আমলে গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পণ্য রফতানি হয়েছে ৪০ বিলিয়ন বা ৪ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। যা এখন পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ পণ্যরফতানি আয়। এইচএসবিসির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন মডেলে দেখানো হয়েছে, ২০৩০ পর্যন্ত প্রতিবছর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গড়ে ৭ দশমিক ১ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। যা রিপোর্টে উল্লিখিত ৭৫টি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ বছরে এডিবি বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দেখিয়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ যা এশিয়া প্যাসিফিকে ৪৫টি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। স্পেকট্যাটোর তথ্য বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের পর্যালোচনা বলছে, এই সময়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ১৮৮ শতাংশ। একই সময়ে ইথিওপিয়া ১৮০ শতাংশ, চীন ১৭৭ শতাংশ, ভারত ১২১ শতাংশ ও ফ্রান্সের প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ। 

এ ধারা অব্যাহত থাকলে বর্তমান বাংলাদেশের ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ২০৩০ সালে পৌঁছে যাবে ৭০০ বিলিয়ন ডলারে। জিডিপির হিসাবে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪৪তম বৃহত্ অর্থনীতির দেশ। ক্রয়ক্ষমতার বিবেচনায় ৩৩তম| আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বিবেচনায় বিশ্বে বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় অবস্থানে|

সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট মি. শি জিনপিং বাংলাদেশের উন্নয়ন ম্যাজিক নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে, একটি জনবহুল ও নিম্ন আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যেভাবে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং বৈষম্য কমানোকে সংযুক্ত করেছে, তা উল্লেখযোগ্য। সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন উদাহরণ দেওয়ার মতো একটি দেশ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবেও বাংলাদেশের এ অগ্রগতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিশেষভাবে। সম্প্রতি তারা একটি টেবিল উপস্থাপন করে দেখিয়েছে উন্নয়নের প্রধান ১২টি সূচকের মধ্যে ১০টিতেই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং অন্যান্য নিম্ন আয়ের দেশের তুলনায় এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম-ডব্লিউইএফের ‘ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট ইনডেস্ক’—আইডিআই ২০১৮ র্যাংকিংয়ে দেখা যায়—অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সূচকে (আইডিআই) দক্ষিণ এশিয়ার বড়ো দেশ ভারতের চেয়ে ২৮ ধাপ এবং পাকিস্তানের চেয়ে ১৩ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বের ১০৩ দেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিচার করে সুইজারল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাভোসে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে ডব্লিউইএফ। অর্থনীতির তিনটি মানদণ্ড—‘প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন’, ‘অন্তর্ভুক্তিকরণ’ এবং ‘আন্তঃপ্রজন্ম সমতা, প্রাকৃতিক ও আর্থিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা’র ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করে তারা।

নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে বারবার লিখেছেন। তিনি তার সর্বশেষ প্রকাশিত ‘অ্যান আনসারটেইন গ্লোরি : ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইটস কনট্রাডিকশনস’ বইয়ে বাংলাদেশ নিয়ে আলাদা একটি অধ্যায়ও রেখেছেন।

স্বল্পন্নোত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ এখন নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পৌঁছে যাবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। শুধু যে মানুষের আয় বেড়েছে তা নয়, বেড়েছে মানুষের গড় আয়ু। বাজেট বাস্তবায়নে পরনির্ভরতাও কমছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে দৃশ্যমান। বড়ো বড়ো প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সক্ষমতাও বাড়ছে। পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রজেক্ট নিজেদের টাকায় করার মতো দুঃসাহস এখন বাংলাদেশ দেখাতে পারে। আকাশে উড়িয়েছে নিজস্ব স্যাটেলাইট। নিজস্ব স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি দিয়েই চলছে দেশের সম্প্রচার কার্যক্রম। তথ্য প্রযুক্তি খাতেও বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। গত এক দশকে কেবল তথ্য প্রযুক্তি খাতেই কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১০ লাখ মানুষের। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আরো ১০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান এ খাতে হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে আসছে দারিদ্র্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, ২০০৯ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি মানুষ ছিল চরম দরিদ্র অবস্থায়। এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে সোয়া ৩ কোটিরও কম মানুষ| আর চরম দারিদ্র্যে আছে ১ কোটির কিছু বেশি মানুষ। যেসব উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার, তা বাস্তবায়ন হলে এই সংখ্যা দ্রুতই কমে আসবে আরো।

১৯৯০-এর দশকেও বাংলাদেশে ৫৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। এখন করছে মাত্র ২১ দশমিক ৩ শতাংশ। অতি দারিদ্র্যের হার কমে নেমেছে ১১ দশমিক ৩ শতাংশে। ২০১৭ সালে দেশের সার্বিক দারিদ্র্যের হার ছিল ২৩ দশমিক ১ শতাংশ, আর অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ১২ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি যে হারে হচ্ছে, তাতে ২০২৩ সালের আগেই দারিদ্র্য হার শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। অতি দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশের কম হলেই তা শূন্য দারিদ্র্য হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১০ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, তখন দেশের সার্বিক দারিদ্র্যের হার ছিল সাড়ে ৩১ শতাংশ। ২০১৬ সালের জরিপে তা কমে নেমে আসে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে। বিগত এক দশকে দারিদ্র্য হার কমেছে ব্যাপক ভাবে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিই মূলত মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে এর পেছনে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ধারাবাহিকতা অর্জন গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছে। মূলত বিপুল পরিমাণ প্রবাসীর পাঠানো আয়, তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এবং কৃষির সবুজবিপ্লব দারিদ্র্য কমিয়ে গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড়ো ধরনের ভূমিকা রেখেছে। সরকারও পিছিয়ে পড়া ও অতিদরিদ্রদের জন্য সামাজিক কর্মসূচি খাতে অব্যাহতভাবে বাজেট বাড়িয়েছে। দেশের ৪০ শতাংশেরও অধিক অতি দরিদ্র মানুষ এখন এই কর্মসূচির আওতায়। কারণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর যথাযথ কর্মসংস্থান করতে না পারলে উন্নয়নের ফল সুদূর প্রসারী হয় না। শেখ হাসিনার উন্নয়নবান্ধব সরকার এদিকেও গুরুত্ব দিয়েছে যথার্থ পরিমাণ।

n লেখক :পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার