‘ভারপ্রাপ্ত’ দিয়ে কতকাল চালানো সমীচীন

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২২:১৮

বিমল সরকার

কেউ কি বিশ্বাস করবেন, নাকি সহজে কাউকে বিশ্বাস করানো যাবে যে দেশের অত্যন্ত সুপরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সুদীর্ঘ এক যুগ (১২ বছর) ধরে চলছে একজন ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দিয়ে? যত বিস্ময়কর আর কৌতূহলোদ্দীপকই হোক, ঘটনা বা বিষয়টি বাস্তবে এমনই। একদিক থেকে বেশ মজারই ব্যাপার। আমাদের দেশে উপদেষ্টা, সিইসি (প্রধান নির্বাচন কমিশনার), পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-র চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান-এমডি-জিএম বা ম্যানেজার, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চেয়ারম্যান—সব পাওয়া যায়, কেবল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ছাড়া!

শুধু পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তর নয়, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন, রেজিস্ট্রার, কলেজ পরিদর্শন, গ্রন্থাগার দপ্তর, অর্থ ও হিসাব দপ্তর, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা দপ্তরসহ এমন আরো অন্তত এক ডজন দপ্তর চালানো হচ্ছে ভারপ্রাপ্ত বা অস্থায়ী হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তি দিয়ে এবং তা বছরের পর বছর ধরে। সবারই জানা যে বছর জুড়ে ডিগ্রি (পাশ), অনার্স, মাস্টার্সসহ বিভিন্ন কোর্সে ও শ্রেণিতে একের পর এক পরীক্ষা লেগেই থাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ নিয়ে হিমশিম খেতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আর ভোগান্তি হয় শিক্ষার্থীদের।

‘অস্থায়ী’ ও ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দ দুটি একমাত্র আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকার এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য ও যথার্থ বলে আমি মনে করি। বঙ্গবন্ধু পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। পঁচিশে মার্চ রাত থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠনসহ ব্যাপক তাণ্ডবে কেবল গোটা বাঙালি জাতি নয়, বলতে গেলে সারা বিশ্ব হতবাক। অবরুদ্ধ দেশের মাটিতে চলছে অসম শক্তির বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই। সাধারণ মানুষ দিশেহারা। সম্পূর্ণ বৈরী এবং এমনই দুঃসহ এক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করে ১০ এপ্রিল ‘মুজিবনগর সরকার’ গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাঁধে বর্তায় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার। তার নেতৃত্বে অস্থায়ী বা বিপ্লবী সরকার ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করে। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশের মাটিতে পা রাখার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত সৈয়দ নজরুল ইসলামই ছিলেন রাষ্ট্রের ‘ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি’। জাতির ক্রান্তিকালে এর চেয়ে ভালো কোনো সিদ্ধান্ত বা বন্দোবস্ত আর সামনে ছিল না।  

১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন সাহাবুদ্দীন আহমদ। এর আগে তিনি ছিলেন দেশের প্রধান বিচারপতি। দায়িত্বভার গ্রহণের আগে তিনি শর্ত দেন যে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব বুঝে নিলে তিনি স্বপদে (প্রধান বিচারপতি) ফিরে যাবেন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। ৫ এপ্রিল নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। প্রদত্ত উদ্বোধনী ভাষণে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ বলেন যে তিনি দায়িত্বভার হস্তান্তর করে অব্যাহতি পেতে চান। সংসদকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তিন জোটের যুক্ত ঘোষণা বা রূপরেখা অনুযায়ী সার্বভৌম সংসদের কাছে আমার ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ছিল।’

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদকে চলতি অধিবেশনেই ক্রান্তিকালীন একটি বিধান সংবিধানের চতুর্থ তপশিলে যোগ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘তাহলে আমি অতি সত্বর বর্তমান দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেতে পারি।’     

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বছরের পর বছর ধরে ‘ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক’  রয়েছেন। তার নাকি কোনো ‘মেয়াদ-টেয়াদ’ নেই! আছেন তো আছেনই। কখন থেকে তার ওপর বর্তেছে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বভার, এ ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা ছিল না। তবে বছর দুই আগে (২০১৮) একবার বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গেলে বাইরে ফাঁকা জায়গায় সাধারণ দুই জন কর্মচারীর মধ্যে কথোপকথনের সময় কিছুটা আঁচ করতে পারি। বেশ ক্ষোভের সঙ্গে অধীনস্ত তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির দুই জন কর্মচারীর মধ্যকার কথোপকথনের রেশ যেন আমার কানে আজও ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হয়। জেনে খুবই বিস্মিত হয়েছি যে ২০০৮ সাল থেকে ঐ কর্মকর্তা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ভারপ্রাপ্ত’ রয়েছেন। সে হিসেবে পুরো এক যুগ ধরে একই ব্যক্তি দায়িত্বে। যে কারো মনে কৌতূহল ও বিস্ময়ের উদ্রেক হতেই পারে যে দীর্ঘদিনে কেন একজন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নিয়োগ দেওয়া হয় না; নতুন কাউকে খুঁজে একেবারেই না পাওয়া গেলে যিনি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন, তাকেই স্থায়ী করে নেওয়া হয় না কেন? কৌতূহল আর ধরে রাখতে পারিনি। নিজের চোখে দেখার জন্য সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে, তৃতীয় তলায়। এ সময় তিনি ভেতরে না থাকায় কক্ষটি বন্ধ রয়েছে। বাইরে দেওয়ালে খুব মজবুত করে সাঁটানো সোনালি রঙে লেখা নাম ও পদবি দেখলে যে কেউ আন্দাজ করতে পারবেন যে এ কোনো সাময়িক নয়, একেবারে শক্ত ও পাকাপাকি বন্দোবস্ত।

আমাদের দেশে চাকরিতে সেই ইংরেজ আমল থেকেই বদলির ব্যবস্থা চালু আছে। চিকিত্সক বা শিক্ষকদের বদলির প্রসঙ্গটি মাঝে মাঝেই বেশ বড়ো পরিসরে আলোচনা-সমালোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। আলোচনা হয় অন্যান্য ক্ষেত্র নিয়েও। খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা নিচের স্তরের অনেক প্রতিষ্ঠানেও ভারপ্রাপ্ত হিসেবে বহাল রয়েছেন অনেকে। তাই বলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশাল একটি প্রতিষ্ঠানে একই ব্যক্তি একই পদে টানা ১২ বছর ‘ভারপ্রাপ্ত’! ভারপ্রাপ্ত মানে তো সাময়িক কাজ চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মত একটি প্রতিষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে দু-চার মাস চালানো যেতে পারে। একযুগ কী করে ভারপ্রাপ্ত রাখা হয়?

n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক