বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ কীভাবে কোভিড-১৯ মোকাবিলা করবেন?

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২০, ২২:০২

বাংলাদেশের জনগণের কাছে দুর্যোগ অথবা বড়ো ধরনের মানবিক বিপর্যয় নতুন কিছু নয়। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত নদীবিধৌত এই বদ্বীপের মানুষেরা একদিকে যেমন দীর্ঘকাল ধরে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করে আসছে, অন্যদিকে দক্ষিণ সীমান্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো শরণার্থীর দায় গ্রহণ করেছে। দেশের ৪৯ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশ এবং এর জনগণ ধৈর্যের সঙ্গে, সহনশীলতার সঙ্গে কেবল যে বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের মোকাবিলা করেছে তা-ই নয়, সেই সঙ্গে মনুষ্যসৃষ্ট সংকটগুলোকেও মোকাবিলা করেছে। যেমন, ১৯৯৭ সালে এশিয়ার অর্থনৈতিক সংকট এবং ২০০৮ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা।

কিন্তু কোভিড-১৯ সংকট এসেছে সংকটের ভিন্ন মাত্রা নিয়ে এবং এটি এমনই এক সমস্যা, যা মোকাবিলা করতে হবে এমন এক মাত্রায়, যা আগে কখনো করতে হয়নি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সরকার এবং বেসরকারি খাতের নেতৃবৃন্দকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং দীর্ঘ অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলার জন্য।

সরকারের উদ্যোগ কী ছিল  

বাংলাদেশ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত করেছিল ৮ মার্চ। ১০ এপ্রিল পর্যন্ত করোনা শনাক্ত রোগী পাওয়া গেছে ৪২৪ জন এবং মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭ জনে।

এর আগে ফ্রেব্রুয়ারি মাসে সরকার চীন থেকে ৩০০ বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। সেই সঙ্গে সরকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং স্থলবন্দরে স্ক্রিনিং মেশিন স্থাপন করে যা দিয়ে ৬ লাখ ৫০ হাজার যাত্রীকে স্ক্রিনিং করা হয়। এর মধ্যে ৩৭ হাজার যাত্রীকে কোয়ারেন্টাইন বা অবরুদ্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়। সরকার দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্রে পরিণত করে। এছাড়াও সরকার প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পরপরই স্কুলগুলো বন্ধ করে দেয় এবং সব ধরনের অ-জরুরি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠানকে অনলাইনে কার্যক্রম চালানোর পরামর্শ দেয়। এরপর সরকার প্রাথমিকভাবে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে ছুটি ঘোষণা করে এবং পরবর্তীকালে তা ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

ইউরোপের বাংলাদেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর বসবাসস্থল হলেও বাংলাদেশ সরকার দৃঢ় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সব ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার মোবাইল অপারেটরদের মাধ্যমে শক্ত সচেতনতা প্রচার চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের সহযোগিতায় বেসরকারি খাতও এগিয়ে আসে। তাদের সঙ্গে নিয়ে সরকার ৫০০ সেবামূলক হটলাইন চালু করে। স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কর্মীদের পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইক্যুইপমেন্ট বা পিপিই প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বিজিএমইএর অধীনে ৫ লাখ পিপিই তৈরির কাজে হাত দিয়েছে।

অর্থনৈতিক হুমকি

সরকারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়, তথাপি এই বৈশ্বিক বিষয়টি অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের সম্মুখীন করে তুলেছে।  বহু দেশ শুরুতেই অর্থনীতিকে উজ্জীবিত রাখতে দ্রুত প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা বিলম্বিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ২৫ মার্চ প্রাথমিকভাবে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। সেটা ৪ এপ্রিল বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ করা হয়, যা জিডিপির ২ দশমিক ৫ সমপরিমাণ। 

২৬ মার্চ প্রকাশিত ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের হিসাব অনুযায়ী বৈশ্বিক অর্থনীতি ২০২০ সালেই -২ দশমিক ২ শতাংশ সংকুচিত হবে। এর প্রভাব বিশেষ করে জি২০-এর বড়ো অর্থনীতির দেশগুলো, যেমন জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পড়বে। এই সব দেশই বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক বাণিজ্যের বড়ো বাজার। গোটা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার এই দেশগুলোতে বর্তমানে লকডাউন চলছে। এই লকডাউন চলবে কমপক্ষে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত। এই দেশগুলোর বাজারে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কমপক্ষে মধ্য জুন পর্যন্ত সময় লেগে যাবে। এর প্রভাব বাংলাদেশের ৬০ লাখ শ্রমিকের, বিশেষ করে পোশাক প্রস্তুতের ক্ষেত্রে পড়বে এবং স্থিতিশীলতা আসতে আরো সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।

তেলের বাজারের মন্দা মধ্যপ্রাচ্য এবং  উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলবে। এই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস করে, যারা প্রতি বছর প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার দেশে প্রেরণ করে। কোনো সন্দেহ নেই যে, সামনের মাসগুলোকে রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমে যাবে। এর পরোক্ষ প্রভাব পড়বে দেশে। বিশেষ করে, গ্রামাঞ্চলে এর নেতিবাচক প্রভাব অনুভূত হবে বেশি, যেখানে জীবনধারণের জন্য ভীষণভাবে এই রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। 

আরো যা যা করা দরকার

প্রধানমন্ত্রী-ঘোষিত বর্ধিত প্রণোদনা প্যাকেজ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং তিনি এই পদক্ষেপগুলো সঠিক পথেই নিয়েছেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের শিল্পের জন্য মূলধনের অংশ হিসেবে অর্থায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের  যে প্যাকেজটি বরাদ্দ করেছেন, তা অবশ্যই এই খাতে নিযুক্ত মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার জন্য একটি সাহসী পদক্ষেপ। এটি এই সংকটের ব্যাপ্তি এবং বিশালতার যেই দিকটি রয়েছে, তার বিপরীতে এই প্রণোদনা প্যাকেজকে অন্তর্বর্তীকালীন নিয়ন্ত্রণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী বলা যায় যে, অনানুষ্ঠানিক খাতে বাংলাদেশে ৫ কোটির বেশি শ্রমিক রয়েছে। এই পরিসংখ্যানটি নিঃসন্দেহে আরো উদ্বেগজনক। আনুষ্ঠানিক অর্থ খাতের কর্মীদের জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে যদি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় প্রভাব পড়ে, তাহলে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীরা আরো ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণভাবে প্রধানমন্ত্রী এটিকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বাংলাদেশের বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে দুস্থ জনগোষ্ঠীর জন্য খাবার সংস্থান এবং অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিকাশের মাধ্যমে ছয় মাসের জন্য খাদ্য সহায়তা বিতরণের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাতেই হবে।

সরকারের আনুষ্ঠানিক নগদ অর্থ প্রদান কর্মসূচিটি তিন মাসের প্রাথমিক সময়ের জন্য মাসে ৯৫ ডলার হারে বিবেচনা করা উচিত, যা বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক খাতের ন্যূনতম মজুরির সঙ্গে মিলে যায়। এতে সরকারের ব্যয় হবে মোটামুটি ১৪ বিলিয়ন ডলার, যা মোট জিডিপির ৪ শতাংশ। এ ধরনের নগদ অর্থ ট্রান্সফারের প্রোগ্রাম প্রকৃত ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। তবে বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত পরিশীলিত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আর্থিক পরিষেবা নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা এই প্রোগ্রামটি বাস্তবায়নে দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বেসরকারি সংস্থাগুলো, মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এবং সরকার জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় এই সামাজিক সহায়তা প্রদানের জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে পারে। 

এজাতীয় আক্রমণাত্মক ও ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণের অর্থ হলো জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে বাজেট ঘাটতি বজায় রাখার চেষ্টা করা—যা বাংলাদেশের বিচক্ষণ ও সুশৃঙ্খল আর্থিক নীতিকে বহাল রাখবে। লো ডেবিট থেকে জিডিপি অনুপাতের মাধ্যমে এই সংকটের অর্থনৈতিক ও মানবিক দিক থেকে লড়াই করতে হবে। সেই লক্ষ্যে স্বল্প মেয়াদে একটি সম্প্রসারণমূলক পদ্ধতি অবলম্বনের মতো পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্য রূপান্তর করতে বাংলাদেশের রয়েছে। এই সম্প্রসারণমূলক ব্যবস্থার জন্য বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এর অর্থায়নের সন্ধান করা যেতে পারে।

আর্থিক দিকের পদক্ষেপ তথা প্রণোদনা প্যাকেজগুলো আর্থিক নীতির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত ছয় মাসের জন্য ঋণ পরিশোধ মুলতুবি করেছে এবং ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাণিজ্য লেনদেনের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার নিয়ম শিথিল করে রেখেছে। এটি মোবাইল আর্থিক পরিষেবায় লেনদেনের সীমাও বাড়িয়েছে এবং আর্থিক নীতিমালার হারকে ২৫ পয়েন্ট কমিয়েছে। এগুলো নিঃসন্দেহে যথাযথ পদক্ষেপ, বৈশ্বিক মহামারিটির অর্থনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে এই লড়াইটা খুব একটা চেনাপথের পথের নয়। 

বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি প্রত্যাশিতভাবে হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত হবে বিশ্ব জুড়ে তার সমকক্ষদের নেওয়া পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করা। এজন্য স্যাচুটোরিটি লিকুইডিটি রেশিও হ্রাস করে এবং তার নীতিমালা হার আরো কমিতে আরো তারল্য বাড়ানো যেতে পারে। এটি কেবল ব্যাংকিং খাতের মধ্যে তরলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে না বরং দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের উদ্যোক্তাদের তাদের ব্যবসাকে চালিত রাখতে সহজে মূলধন সরবরাহ করবে।

সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা হবে নিয়ামক শক্তি

স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিক থেকে প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই মহামারিটিকে রুখতে বাংলাদেশ কিছুটা বাড়তি সময় পেতে সক্ষম হয়েছে। কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সরকার একা চালাতে পারে না। এর জন্য স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি অভূতপূর্ব সমন্বয় প্রয়োজন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি আদেশ নিয়ে, মহামারিটি মোকাবিলায় ‘কোভিড অ্যাকশন প্ল্যাটফরম’ চালু করেছে। বাংলাদেশের নিজস্ব বেসরকারি খাতের জন্য সমর্থন বাড়ানোর জন্য এই প্ল্যাটফরমটির ওপর নজর দেওয়া উচিত এবং COVID-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াই করার এবং এর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে নিজস্ব কিছু অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া উচিত।

( লেখাটি ইংরেজি থেকে অনূদিত)

n লেখকদ্বয় :শেখ তানজিব ইসলাম ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের কমিউনিটি প্রধান, আঞ্চলিক এজেন্ডা, এশিয়া প্যাসিফিক এবং ইয়াশ নিতীন ডিভাড়কার হলেন কমিউনিটি প্রধান, বিজনেস এনগেজমেন্ট, ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া