গবেষণা প্রকৃতপক্ষে কী? প্রকৃতি ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চলছে এক নির্দিষ্ট নিয়মে। অনাদিকাল ধরে এই নিয়মের কোনো ব্যত্যয় নেই। প্রকৃতির এই নিয়মকে বারংবার বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জানার চেষ্টাই হলো গবেষণা। গবেষণার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান হলো বিজ্ঞান। পৃথিবীতে মনের ভাব প্রকাশের জন্য ৬ হাজার ৫০০টি ভাষা থাকলেও প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন ও আবিষ্কারের ভাষা মাত্র একটি। আর তা হলো অঙ্ক। অঙ্ককে বিধাতার ভাষাও বলা যেতে পারে। কারণ, প্রত্যেক সৃষ্টিরই রয়েছে গাণিতিক মডেল। পাখি কেন আকাশে উড়তে পারে, মানুষ কেন দুই পায়ে চলতে পারে, বিড়াল কেন উঁচু জায়গা থেকে লাফ দিলেও আহত হয় না—এসব কিছু অঙ্কের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। প্রাকৃতিক রহস্যের সবকিছুরই গাণিতিক ব্যাখ্যা রয়েছে। তাই গণিতে যে জাতি যত উন্নত, সে জাতি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে তত বেশি অগ্রসরমাণ। তাই জ্ঞানবিজ্ঞানে অনুকরণের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া উচিত জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও শিল্পে সমৃদ্ধ দেশগুলোকে। তবেই ঘটবে আমাদের প্রকৃত উন্নয়ন। অঙ্কের পারদর্শিতায় অগ্রগামী দেশগুলোর দিকে লক্ষ করলেই দেখা যায়, বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ১ থেকে ২০-এর মধ্যে যে দেশগুলো রয়েছে, তারাই কিন্তু জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে অগ্রসরমাণ। এই তালিকায় চীনের অবস্থান প্রথমে। আয়তনে ক্ষুদ্র হয়েও অর্থনীতি ও গবেষণায় যে দেশটি এগিয়ে আছে, তার নাম সিঙ্গাপুর। অঙ্কের পারদর্শিতায় চীনের পরেই রয়েছে সিঙ্গাপুরের অবস্থান। এছাড়া জাপান, সাউথ কোরিয়া, হংকং, তাইওয়ান, জার্মানি—এরা সবাই ১ থেকে ২০-এর মধ্যে রয়েছে। তাই বলা যায়, অঙ্ক, গবেষণা ও শিল্পের মধ্যে একটি নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সূচনা বাংলাদেশের জন্য উজ্জ্বল সম্ভাবনার হাতছানি। সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে দরকার সঠিক অনুধাবনের মাধ্যমে পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তার বাস্তবায়ন। বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষার প্রতি বেশি গুরুত্বারোপ করেছে। কিন্তু একটি বিষয় উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছি যে, কম্পিউটার টেকনোলজিতে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পাইথন প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে অ্যাপ্লিকেশন পর্যায়ে কোনো বড় কিছু করার ক্ষেত্রে একজন ছাত্র পাইথনের ফাংশনগুলো ব্যবহার করে খুব সহজে প্রোগ্রামটি করতে পারছে। কিন্তু প্রোগ্রামের ভেতরে কীভাবে হিসাবগুলো হচ্ছে সে সম্পর্কে কিছুই জানছে না, যা একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারের জন্য মোটেও কাঙ্ক্ষিত বিষয় নয়। একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার অ্যাপলিকেশন প্রোগ্রাম তৈরি করবে। নিঃসন্দেহে অ্যাপলিকেশন প্রোগ্রাম ব্যবহারের জন্যে ইঞ্জিনিয়ার দরকার হয় না। কারণ, একটি অ্যাপলিকেশন প্রোগ্রাম তৈরি থাকে এমনভাবে, যাতে সব পেশার সব মানুষই তা ব্যবহার করতে পারে। পাইথনের মতো গবেষণা-সহায়ক প্রোগ্রামগুলো সাধারণত যে কোনো ডিসিপ্লিনের ছাত্ররা ব্যবহার করবে তাদের গবেষণার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়ার জন্য। এক্ষেত্রে গবেষণায় যুক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য মুখ্য বিষয় হচ্ছে গবেষণার ফলাফল জানা। এ ধরনের প্রোগ্রামে কম্পিউটারের অভ্যন্তরে বড় বড় হিসাবগুলো কীভাবে সম্পাদিত হচ্ছে তা জানা জরুরি নয়। কিন্তু একজন কম্পিউটার টেকনোলজিতে ডিপ্লোমাধারী ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন কম্পিউটার গ্র্যাজুয়েটের জন্য জানা দরকার কীভাবে ভেতরের প্রত্যেকটি কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। কারণ, তাকে ফার্মওয়্যার বা কোর লেভেলের প্রোগ্রামিংয়ে পারদর্শী হয়ে গড়ে উঠতে হবে। সুপ্রিয় পাঠক আপনারা জেনে থাকবেন, ওরাকল এবং পাইথনের মতো আধুনিক ও ভিজুয়াল সফটওয়্যারগুলো তৈরির জন্য প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ ‘সি’ ব্যবহূত হয়েছে। সুতরাং স্ট্রাকচারড প্রোগ্রাম সিএসই ইঞ্জিনিয়ারের প্রোগ্রামিং দক্ষতাকে পরিপূর্ণ করে তোলে। সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আউট কাম বেজড এডুকেশনের (ওবিই) সিলেবাস তৈরি করা হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই বিভাগের সিলেবাসে স্ট্রাকচারড প্রোগ্রামিং সিলেবাস থেকে সম্পূর্ণরূপে বাদ দেওয়া হয়েছিল। শুধু অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং রাখা হয়েছিল। যেখানে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের সিলেবাসের সবগুলোতেই এক সেমিস্টার স্ট্রাকচার প্রোগ্রামিং পড়ানো হয়, সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বাদ দেওয়াটা যৌক্তিক হয়েছিল কি? অবশ্য অনেক যুক্তিতর্কের পর অবশেষে এক সেমিস্টারে চার ক্রেডিট থিওরি কোর্স সংযুক্ত করে তার দু্ই ক্রেডিট স্ট্রাকচারড প্রোগ্রামিং ও দুই ক্রেডিট অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং রাখা হয়েছে। ব্যাবহারিক ক্লাস আকারে ১.৫ ক্রেডিট যুক্ত করা হয়েছে অর্থাত্ প্রতি গ্রুপের জন্য সপ্তাহে একটি করে ব্যাবহারিক ক্লাস থাকবে। এতে আমি ব্যক্তিগতভাবে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই। আমার মতে স্ট্রাকচারড প্রোগ্রামিংয়ের জন্য এক সেমিস্টারে তিন ক্রেডিট থিওরি ও ১.৫ ক্রেডিট ব্যবহারিক ক্লাস থাকা উচিত। অনুরূপভাবে অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিংয়ের জন্যও অন্য কোনো সেমিস্টারে তিন ক্রেডিট থিওরি এবং ১.৫ ব্যাবহারিক ক্লাস থাকা উচিত। তাহলেই সিলেবাস পরিপূর্ণতা পাবে। অন্যথায় এর সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাব আমাদের প্রাণপ্রিয় ছাত্রদের ওপর ভবিষ্যতে পড়বে। কোনো একটি বহুজাতিক কোম্পানির চিফ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বলেছিলেন, ‘প্রোগ্রামিংয়ের লজিক এবং প্রোগ্রামিং পারদর্শিতা দুর্বল হলে, তাকে বিশ্বমানের গ্র্যাজুয়েট বলা যায় না।’ লজিক গঠনে কোর প্রোগ্রামিংয়ের বিকল্প নেই। তাই আইসিটি সিলেবাসে কোর প্রোগ্রামিং করার সুযোগ যত বেশি রাখা হবে ততই দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি হবে বলে আমি মনে করি।
প্রোগ্রামিংয়ে পারদর্শী জাতি গড়ার ক্ষেত্রে স্কুল ও কলেজে অঙ্কের জ্ঞানকে শানিত করতে হবে। অঙ্কের জ্ঞানকে শানিত করার লক্ষ্যে অনুসরণ করতে হবে সেই সব দেশকে যারা প্রোগ্রামিংয়ে বিশ্ব র্যাংকিংয়ে সেরা। এক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়ার কথা বলা যেতে পারে। কারণ, পৃথিবীতে প্রোগ্রামিং দক্ষতায় এই দেশ দুটি প্রথম ও দ্বিতীয়। যেখানে আমেরিকার অবস্থান ২৮তম। শুধু চতুর্থ শিল্পবিপ্লব নয় যে কোনো ক্ষেত্রে মানসম্মত গবেষণা করতে হলে অঙ্ক বিষয়ে গভীর জ্ঞানের বিকল্প নেই। আমেরিকানরা বর্তমান সময়ে উন্নত জাতি হলেও অঙ্কের ক্ষেত্রে চায়না ও রাশিয়াকে অনুসরণ করতে একটুও কার্পণ্য করছে না। এরই ধারাবাহিকতায় আমেরিকায় চালু হয়েছে স্টুডিও অব এনগেজিং ম্যাথ, রাশিয়ান স্কুল অব ম্যাথমেটিকস ইত্যাদি। এই প্রতিষ্ঠানগুলো স্কুলপড়ুয়া আমেরিকান শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীষণ আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। বিশ্বায়নের এই যুগে আমরা পিছিয়ে থাকব কেন? গণিতের উত্কর্ষ সাধনের নিমিত্তে আমাদেরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্রষ্টা ও প্রকৃতির ভাষা হলো অঙ্ক। এই ভাষাকে অনুধাবন করেই উন্মোচন করতে হবে প্রকৃতি ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির রহস্য। তবেই ঘটবে গবেষণা ও মানবসম্পদের প্রকৃত উন্নয়ন।
n লেখক :অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০৭

