পারিবারিক সহিংসতা ও তার প্রতিকার

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২১, ২২:০০

 ‘সাম্যের গান গাই—আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই! বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ কবির ভাষায় বলতে গেলে বিশ্বে যা-কিছু আছে প্রত্যেকটির পেছনে নারীর অবদান কম নয়। সে যদি সরাসরি কাজে সম্পৃক্ত না-ও থাকে কিন্তু নেপথ্যে যে শক্তি, সাহস, উত্সাহ, উদ্দীপনা যোগান দিচ্ছে সেটাই সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। বাবার গৃহে কন্যা সন্তান হিসেবে জন্মগ্রহণ করার পর বাবা-মার আদরে বেড়ে ওঠার পরে যৌবনে কারো স্ত্রী হিসেবে অনেক স্বপ্ন নিয়ে স্বামীর গৃহে প্রবেশ। শুরু হয় নতুন জীবন, এক পর্যায়ে মমতাময়ী মা হয়। অচেনা পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে চলতে হয়।

কিন্তু তার চলার পথ এতটা মসৃণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী, দেবর, ননদ, শ্বশুর, শাশুড়ি জায়া কর্তৃক অনেক গঞ্জনা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হতে হয়। গত ১০ বছরে প্রতিদিনে গড়ে ১১ নারী সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে দেশে। তাছাড়া বাংলাদেশে স্বামীর দ্বারা কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হন ৮৭.০৭ শতাংশ নারী। এর মধ্যে ৮১.০৬ শতাংশ মানসিক ৫৩.০২ শতাংশ অর্থনৈতিক, ৩৬.০৫ শতাংশ যৌন, আর ৬৪.০৬ শতাংশ নারী শারীরিক নির্যাতন ভোগ করেন (তথ্য সূত্রঃ বিবিএস জরিপ ২০১১)। নারী ও শিশুর প্রতি নির্মমতা ও নির্ঘাত হতবাক ও ক্ষুব্ধ হচ্ছেন বিবেকবান মানুষ। ঘটনাগুলো চার দেওয়ালের মধ্যে আটকা থাকে। অথচ এ আটকা-আটকির কারণে অনেক সংসারে অশান্তি দেখা দিচ্ছে। এ অশান্তি সমাজেও ছড়িয়ে পড়ছে। নারীদের আত্মহত্যা বা বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনাও ঘটে থাকে। সন্তান ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব হয়, মামলা হয়—আরো কত কী?

এর প্রতিকারকল্পে ২০০৩-এ নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিকার আইনটি প্রণয়ন করা হয়। আইনে দুই মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। পারিবারিক সহিংসতার বিষয়গুলো এ আইনে কাভার করে না। অর্থাত্ এর বিস্তারিত ব্যাখাও নেই। তাই সরকার নারীর ও শিশুর অধিকার নিয়ে আরো গভীরভাবে ভাবতে থাকে। আমরা সেটাও জানি—জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত নারীর সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ, ১৯৭৯ ও শিশু অধিকার সনদ, ১৯৮৯-এর স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত নারী ও শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে পরিবার থেকে নারী ও শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পারিবারিক সহিংসতা আইন, ২০১০ প্রণয়ন করা হয়। যা পরিবারে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। উক্ত আইনে পরিবারের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে জন্মগত, বৈবাহিক সূত্র এবং দত্তক হিসেবে পরিবারে অবস্থান। নারীর যে কোনো বয়স হতে পারে, তবে শিশুর ক্ষেত্রে ১৮ বছরের নিচে। আইনে সহিংসতার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে নিম্নরূপ : (ক) শারীরিক নির্যাতন (খ) মানসিক নির্যাতন (গ) যৌন নির্যাতন এবং (ঘ) আর্থিক নির্যাতন। শারীরিক নির্যাতন দেখানো যায়, মানসিক নির্যাতন দেখানো যায় না—এক্ষেত্রে ভয়ভীতি দেখানো, কটাক্ষ করা, অধিকার হরন করা, স্বাধীনতা খর্ব করা এর অন্তর্ভুক্ত। যৌন হয়রানি পরিবারের যে কোনো লোক কর্তৃক হতে পারে। নারীকে পরিবারের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করা, তাছাড়া বিবাহের সময় দেনমোহরের পাওনা ব্যতীত যে উপহারসামগ্রী পেয়েছে তা থেকে বঞ্চিত করা, ব্যাংক ব্যালেন্সের প্রাপ্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, সেটা অর্থনৈতিক নির্যাতনের আওতায় পড়ে। আর শিশুদের ক্ষেত্রে তার বেড়ে ওঠার বেলায় চাপ সৃষ্টি করা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া এক ধরনের নির্যাতন। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা ২০১০-এর আওতায় মামলা করতে পারবেন। যদি মামলা করার কারণে পরিবার কর্তৃক গৃহচ্যুত হন, কোর্ট তাকে আলাদা বাসা নিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেবে। মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পরে প্রতিপক্ষ থেকে বাসায় থাকা, খাওয়া, চিকিত্সার খরচ আদায় করে দেবে। যদি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি প্রতিপক্ষ কর্তৃক আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, তিনি সুস্থ থাকা অবস্থায় যে টাকা আয় করতে পারতেন, সে পরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রতিপক্ষ থেকে আদালত আদায় করে দিতে পারবে। যদি প্রতিপক্ষ ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতে অপারগতা প্রকাশ করে বা গড়িমসি করে, যদি তিনি সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে থাকেন, তাহলে সে প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের প্রধানের কাছে নোটিশ দিতে পারবে তার বেতন থেকে টাকা আদায় করার জন্য। আদালত তার অপরাধের জন্য ছয় মাসের শাস্তি দিতে পারে। যদি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে তাহলে দুই বছরের সাজা দিতে পারে এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানাও ধার্য করতে পারে। যেহেতু এটা পারিবারিক বিষয়ক আইন—তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে আপসরফার কথা বলা আছে। আমার ব্যক্তিগত অভিমত—যেহেতু পরিবারে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের জন্য এ আইন, মামলা-মোকদ্দমার পরিস্থিতি যাহাতে সৃষ্টি না হয়, উভয় পক্ষকে সেটা লক্ষ্য রাখতে হবে, মামলায় জড়ালে শিশুদের মনস্তাত্ত্বিকের ওপর প্রভাব ফেলে। সামাজিকভাবে উভয়কেই হেয়প্রতিপন্ন হতে হয়। পরিবারে অশান্তি হলে সমাজেও অশান্তি বাড়ে। অনেক নারী পারিবারিক সহিংসতা আইনটি সম্বন্ধে অবগত নন, তার অধিকারের জন্য এটা জানা থাকা দরকার। আসুন পরবর্তী প্রজন্মের দিকে লক্ষ্য রেখে পারস্পরিক সহনশীল হয়ে ভালোবাসার পরিপূর্ণ একটি সুন্দর সাবলীল পরিবার গড়ে তুলি, ভালোবাসা যেন কোনো বিশেষ দিবসে নয়—সারা বছর সারাক্ষণ বিদ্যমান থাকে, ‘পরিবারের সবার জন্য,’ তাহলেই সেখানে থাকবে শুধু শান্তির বারতা, শান্তির সমাজ—তখন দেশও শান্তিময় হতে বাধ্য।

n লেখক :ব্যাংকার