বিষয়টি হলো—সূর্যের তেজ কমাও। অর্থাত্—ডিম দি সান। গ্রীষ্মকালে সূর্যের দাপটের কথা কে না জানে; কিন্তু কীভাবে কমানো সম্ভব হবে সূর্যের তেজ? জানালায় ভারী পর্দা লাগিয়ে বা ভেজা জামাকাপড়-গামছা ইত্যাদি ঝুলিয়ে গরম হাওয়াকে ফিল্টার করে ঘরের ভেতরে শীতল হাওয়া ঢোকানো, অথবা ‘এসি’ লাগিয়ে ‘প্রিমিটিভ’ ব্যবস্থাকে আরো জোরদার করার কথা ভাবছেন? না, সেরকম কিছু নয়! বরং আমরা নতুন একটি প্রযুক্তির কথা আজকে বোঝার চেষ্টা করব। এটি হলো নবমার্গের প্রযুক্তি। পোশাকি নাম ‘জলবায়ু প্রকৌশল’ বা ‘ক্লাইমেট ইঞ্জিনিয়ারিং’।
জলবায়ু প্রকৌশলের সাদামাটা অর্থ হলো বুদ্ধি-বিবেচনা প্রসূত লাগসই আইডিয়া দিয়ে বিস্তৃত পরিসরে পৃথিবীর প্রাকৃতিক জলবায়ু-সিস্টেমে হস্তক্ষেপ করো এবং প্রাকৃতিক জলবায়ু-সিস্টেমকে আমাদের সুবিধা মতো করে নাও। এই মুহূর্তে পশ্চিমা জগতে অত্যন্ত আলোচিত উদ্বেগের বিষয়টি হলো—‘বৈশ্বিক উষ্ণায়ন’ বা ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’। উষ্ণায়নকে থামাতে পশ্চিমা বিশ্ব মরিয়া। এ কাজ তারা করতে চাইছে জলবায়ু প্রকৌশলের সাহায্যে; কিন্তু ‘হস্তক্ষেপ’ শব্দটি কেমন গোলমেলে হতে পারে ভেবে জলবায়ু প্রকৌশলের বদলে প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য ‘ভূপ্রকৌশল’ বা ‘জিয়োইঞ্জিনিয়ারিং’ কথাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রকৌশলের পছন্দতম সাবক্যাটাগরি হলো—‘সৌর বিকিরণ বা সূর্যালোক ম্যানেজমেন্ট’ এবং ‘কার্বন ডাইঅক্সাইড হটাও’; কিন্তু কীভাবে করবে? সূর্যালোক ম্যানেজমেন্টের আওতায় পৃথিবীর জন্য ‘এত সূর্যালোকের প্রয়োজন নেই’ বলে সূর্যালোককে প্রতিফলন করে মহাশূন্যের দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে; এবং কার্বন ডাইঅক্সাইডকে দীর্ঘ মেয়াদের ভিত্তিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে হটিয়ে দেওয়া হবে। অর্থাত্ জিয়োইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অন্তর্গত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পৃথিবীর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ ও গুণাবলিকে দরকার মাফিক পরিবর্তন করা। এর একটি উদাহরণ হলো—‘ক্লাউড সিডিং’; আমরা যেমন উদ্ভিদের চারা করতে মাটিতে বীজ বপন করি, অনেকটা সেভাবেই মেঘ থেকে বৃষ্টি ঝরাতে, মেঘের মধ্যে ‘বীজ’ বপন করা হয়, মেঘের এই ‘বীজ’ রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি হয়—সিলভার আয়োডাইড, পটাশিয়াম আয়োডাইড, শুকনো বরফ (কঠিন ‘কার্বন ডাইঅক্সাইড’), তর প্রোপেইন। ব্যাস! বীজ বপন সম্পন্ন হলে মেঘ ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি হয়ে ঝরবে। আরেকটি উদাহরণ হলো—‘কার্বন’কে বন্দি করা বা ‘কার্বন ক্যাপচার’; কয়লাচালিত পাওয়ার প্ল্যান্টে যে ‘কার্বন নিঃসারণ’ বা এমিশন হয় সেগুলোকে বন্দি করে (পরে ব্যবহারের জন্য) মজুত করে রাখা। ক্লাউড সিডিং ও ‘কার্বন ক্যাপচার’ প্রজেক্ট পর্যায়ে রয়েছে, তবে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধসের পরের অনেকগুলো বছর ‘কার্বন নিঃসারণ’ বা এমিশন বন্ড আন্তর্জাতিক শেয়ার মার্কেটে ঈর্ষণীয় পরিমাণ টু-পাইস কামিয়ে নিয়েছিল কিন্তু।
পৃথিবী নামক ধরিত্রীকে ’বাসোপযোগী’ করার জন্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে বা পৃষ্ঠভাগে সূর্যালোকের অবাধ প্রবেশকে বাধা দেওয়ার কায়দাকানুন বের করার জন্য গবেষকরা ‘সোলার বা সৌর জিয়োইঞ্জিনিয়ারিং’ নামক ছত্রছায়ায় জমায়েত হয়েছেন। এবং সূর্যালোককে ঠেকাতে তারা বেশ কিছু টেকনিকও উদ্ভাবন করেছেন। গবেষকরা অনেক বিচারবিবেচনার পরে সিদ্ধান্তে আসেন যে, বায়ুমণ্ডলে অ্যারোসোল-কণিকা ছড়িয়ে দিলে অ্যারোসোলের ভাসমান কণিকাগুলো সূর্যালোককে পৃথিবী থেকে প্রতিফলিত করবে এবং মহাজগতের দিকে পাঠিয়ে দেবে, আমরা যেমন মশা দমনের জন্য অ্যারোসোল স্প্রে ব্যবহার করি, অনেকটা সেরকম কায়দার।
যেমন ভাবা তেমনি কাজ! হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের দ্বিতীয় স্তর ‘স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে’ ক্যালসিয়াম কার্বোনেট তথা চকের গুঁড়া ছড়িয়ে দিয়ে সূর্যালোকের তেজ কমাতে ‘স্ট্র্যাটোফেরিক কন্ট্রেল্ড পারটারবেশন এক্সপেরিমেন্ট’, সংক্ষেপে ‘স্কপএক্স’ (SCoPEx) নামক একটি পরীক্ষা দাঁড় করিয়েছেন। চকের গুঁড়া অ্যারোসোল কণিকার কাজ করবে। চৌদ্দটি ফাউন্ডেশন ছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে বিল গেটস (বিজি) এই সৌর জিয়োইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উত্সাহী সমর্থক। (তাছাড়াও হার্ভার্ডের ‘ফান্ড ফর ইনোভেইটিভ ক্লাইমেট অ্যান্ড এনার্জি রিসার্চ’-কে তিনি কম করে ৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছেন। সম্প্রতি ‘বিজি’ জলবায়ুজনিত বিপর্যয় মোকাবিলার ওপরে একখানা বই লিখেছেন। তার মতে, এই বিপর্যয়কে ঠেকানোর সমাধান আমরা জানি, প্রয়োজন হলো সেগুলোকে বলবত্ করা। যেমন—ধনী দেশগুলোকে তিনি সিনথেটিক গোমাংস খেতে বলেছেন। তাবত্ স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার জুড়ে চকের গুঁড়া ছড়িয়ে সূর্যালোককে বশে এনে পৃথিবীকে শীতল করার বিষয়টিও রয়েছে।
পৃথিবীকে শীতল করতে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে কত কিলো চকের গুঁড়া ছড়াতে হবে এবং সূর্যালোক আদৌ দমিত হবে কি না—গবেষকরা জানেন না। ‘স্নোপিয়াসর’ (Snowpiercer) নামক ফিল্মটি যারা দেখেছেন তারা বুঝতে পারছেন যে, কি রকম মহাফ্যাসাদে পড়েছেন এখন গবেষকরা! ফিল্মে বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রক্রিয়াকে থামাতে জলবায়ু-প্রকৌশলের মাধ্যমে সূর্যালোককে ঠেকানো হয়; সূর্য আড়ালে চলে যায়; পৃথিবীব্যাপী নেমে আসে নতুন এক ‘বরফযুগ’। এই বরফযুগে যে যিকঞ্চিত্ হোমো সেপিয়ান টিকে যান, তারা সশস্ত্র গার্ডের পাহারাধীনে ট্রেনযোগে বিশ্ব টহলে (ভ্রমণে নয়) বের হন...। নেটফ্লিক্সে ফিল্মটি দেখে নিন।
কাজেই, ফ্যাসাদমুক্ত হতে তাই ঠিক হয় যে, এ বছরের (২০২১) জুন মাসে সুইডেনের সুমেরু অঞ্চলের নিরিবিলি শহর ‘কিরুনা’য় সুইডিশ স্পেস করপোরেশন চকের গুঁড়াভর্তি বেলুন নিয়ে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে একটি টেস্ট ফ্লাইটে যাবে। সেখানে সীমিত পরিবেশে সরেজমিনে পৃথিবীমুখী সূর্যালোকের ওপরে কী রকম প্রভাব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে তা সরেজমিনে পরীক্ষা করবে। ‘স্কপএক্স’ তার ওয়েবসাইটে ‘মানুষজন বা পরিবেশের ওপরে কোনো শোচনীয় ঝুঁকি নেই’ লিখেছে বটে; কিন্তু সুইডেনের আদিবাসী ‘সামি সম্প্রদায়’ এবং স্থানীয় অ্যাকটিভিস্টরা খোলা চিঠির মাধ্যমে উদ্যোগটির বিরোধিতা করে বসে। ‘সামি’দের আবার সমস্যা হলো যে ‘সোলার ইঞ্জিনিয়ারিং’-এ তাদের আস্থা নেই। তারা বলছে যে, ‘সূর্যালোকের তেজ কমানোর নামে আকাশে বিরামহীনভাবে চকের গুঁড়া ছড়িয়ে ছড়িয়ে আগ্নেয় অগ্ন্যুত্পাতের অনুকরণ করতে চাইছে আর কি!’
‘সামি’রা জানে যে, প্রাকৃতিক অগ্ন্যুত্পাত পৃথিবীর জলবায়ুকে প্রভাবিত করে; তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়। মাউন্ট ট্যামবোরার অগ্ন্যুত্পাত (ইন্দোনেশিয়া, ১৮১৫) গ্রীষ্মকালবিহীন বছরের জন্ম দিয়েছিল’ বা আলাস্কা ও মেক্সিকোর আগ্নেয় অগ্ন্যুত্পাত স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার পর্যন্ত যে অ্যারোসোল পাঠিয়েছিল, আফ্রিকার সহেল অঞ্চলে খরা হয়েছিল। এমন আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে। ‘জিউরেসিক পার্কে’র আইকোনিক সব কয়টি ডায়নোসর কি নির্বংশ হয়নি? বা হাল আমলের পশমি ম্যামথরা? হয়েছে। ফলস্বরূপ, সুইডিশ স্পেস করপোরেশন স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের টেস্ট ফ্লাইট বাতিল করে দিয়েছে; বলেছে, জুনে ‘কিরুনা’র স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারকে ‘বিরক্ত’ করা হবে না।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, সৌর-প্রকৌশল বাতিল হয়ে গেল; ক্যালসিয়াম কার্বোনেট বা চকের গুঁড়ার হামলা থেকে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার বেঁচে গেল! সুতরাং নীল আকাশের নিচে প্রাণ ভরে দাঁড়িয়ে নিন; সুমেরু-কুমেরুর উদীচী ঊষা-অবাচী ঊষার রঙের বাহারে রোমাঞ্চিত হয়ে নিন। আর স্কুলগুলোতে সময় থাকতে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখার চকের স্টক করতে ভুলবেন না।
n লেখক : বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে বিশ্লেষক [email protected]

