গত প্রায় দেড় বছর ধরে অতিমারি করোনায় ভারতে কত লোক মারা গিয়েছে, তার সঠিক তথ্য দেশের সরকারের কাছে নেই। তারা একেক দিন একেক রকম তথ্য দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এ দিয়ে এক অদ্ভুত বিভ্রান্তি ও সংকট তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) বিজ্ঞানী সৌম্যা স্বামীনাথন ১লা জুলাই এক টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে বলেছেন, করোনায় ভারতে কত মানুষ মারা গেছেন, কত জন আক্রান্ত, কত লোক সেরে উঠেছেন সে তথ্য ঠিকভাবে দিচ্ছে না ভারত সরকার। এর ফলে সমগ্র ইউরোপ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশে এক বিভ্রান্তি ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ভারত সরকার অবিলম্বে সঠিক তথ্য প্রকাশ করুক। একই ধরনের কথা বলেছেন নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অভিজিত্ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি হার্ভার্ড থেকে ‘ইন্ডিয়া টুডে’কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ‘করোনা নিয়ে দিল্লি কী করছে বুঝতে পারছি না। আমরা এখানে একরকম তথ্য পাচ্ছি আর দিল্লি অন্যরকম তথ্য দিচ্ছে। এতে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। ভারতের সরকার এই বিভ্রান্তি কাটাতে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করুক।’ দিল্লির এইমস-এর প্রধান রণদীপ গুলেরিয়া, যিনি করোনা বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত, তিনি বলেছেন—তৃতীয় ঢেউ আসতে দেরি নেই। তার বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন ১৮ থেকে ৪৪ বছর পর্যন্ত সবাইকে টিকা দেওয়া হবে। তার আরো বক্তব্য, চলতি জুলাই মাসে প্রয়োজন হবে প্রায় দেড় কোটি ডোজ টিকা। সরকারের হিসাব, টিকা পাওয়া যাবে ৪৫ লক্ষ।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিত্ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, করোনার ফলে প্রায় ৫ কোটি মানুষ ভারতে কর্মচ্যুত হয়েছেন। এখনো পরিযায়ী শ্রমিকরা রাস্তায় পড়ে মারা যাচ্ছেন। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’, ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’, ইংল্যান্ডে ‘টেলিগ্রাফ’সহ একাধিক পত্রিকা ভারতের এই করুণ চিত্রকে তুলে ধরছে। করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থতার জন্য মোদি সরকারকে তুলোধোনা করেছে ‘ল্যানসেট’ পত্রিকা। তারা মনে করছে, আগামী মাসের মধ্যেই ভারতে করোনায় মৃতের সংখ্যা ছাড়াবে ১০ লাখ। ‘ল্যানসেট’ পত্রিকায় বলা হয়েছে, মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের ব্যর্থতাই এই বিপর্যয় ডেকে আনছে। মহামারি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতে করোনার দ্বিতীয় পর্যায়ে আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে গ্রামভারত। প্রথম পর্যায়ের তুলনায় প্রায় চার গুণ সংক্রমণ ও মৃত্যু ঘটেছে ইতিমধ্যেই। গ্রামীণ এলাকায় দ্রুত গতিতে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া অত্যন্ত গুরুতর বিষয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত সপ্তাহে বিজেপিশাসিত মধ্যপ্রদেশে এক দিনে মারা যায় ১ লাখ ৭৪ জন। সরকারি হিসাবে দেখানো হয় মাত্র সাড়ে ৪ হাজার। এনডিটিভি অন্তঃ তদন্ত করে এই তথ্য সামনে এনেছে। তৃতীয় ঢেউ আসতে আর দেরি নেই, মনে করে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক। ডেলটা প্লাস ভ্যারিয়েন্টই এই ঢেউয়ে সবচেয়ে আতঙ্কের কারণ। এদিকে বিভিন্ন রাজ্য থেকে ‘টিকা নেই টিকা চাই’ বলে কেন্দ্রকে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। এই আতঙ্কের পরিস্থিতিতে আতঙ্ক আরো বাড়িয়েছে ডেলটা প্লাস স্ট্রেন। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, একবার এই স্ট্রেন ছড়াতে শুরু করলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে। ইতিমধ্যে এই স্ট্রেনে আক্রান্ত ব্রিটেন। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, জাপানের মতো দেশে রীতিমতো চোখ রাঙাচ্ছে ডেলটা প্লাস। ভারতে এবং পশ্চিমবঙ্গেও বহু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন এই ভয়ংকর নতুন স্ট্রেনে। আরো আশঙ্কার কথা হলো, এতদিন যে পদ্ধতিতে করোনা রোগীদের চিকিত্সা হয়ে এসেছে সেই পদ্ধতি এই স্ট্রেনের ক্ষেত্রে কাজ করছে না। তাই একেবারে গোড়াতেই ডেলটা প্লাসের বিস্তারকে আটকানো না গেলে দ্বিতীয় ঢেউয়ের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠবে করোনার তৃতীয় ঢেউ। এইমস-প্রধান রণদীপ গুলেরিয়াসহ একাধিক বিশেষজ্ঞর মতে, লকডাউন উঠতেই যেভাবে কোভিড-বিধিকে অগ্রাহ্য করে মানুষ পথে নেমে পড়েছে, তাতে তৃতীয় ঢেউ অবশ্যম্ভাবী এবং আগামী এক-দেড় মাসের মধ্যেই এই ঢেউ আছড়ে পড়বে দেশে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। কিন্তু সমস্যা হলো এই বিজেপি সরকার বিরোধীদের কোনো যুক্তি-পরামর্শই কানে তোলে না।
করোনা একটি দুর্যোগ বলে শীর্ষ আদালত মনে করে। তাই আদালত মাত্র দুই দিন আগে ভারত সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে। করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে, এমন প্রত্যেক ব্যক্তির পরিবারকে ৪ লাখ টাকা করে দিতে হবে। অবশ্য শীর্ষ আদালতের এই নির্দেশ সরকার মানবে কি না, সে ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু এখনো জানা যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অ্যান্টনি ফাউসি করোনা মোকাবিলায় দিল্লি যেভাবে চলছে তার কঠোর সমালোচনা করে অভিযোগ করেছেন, ভারতে পরিচ্ছন্নতার অভাব। তিনি আরো বলেছেন, করোনা প্রতিরোধে দেশের সরকারের যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত ছিল, তা তারা করেনি। যদি তা করত, তাহলে গঙ্গায় আধপোড়া মৃতদেহ ভাসত না, আর একটা কবরে ১০-১২ জনকে কবর দেওয়ার প্রয়োজন হতো না। সুতরাং করোনা নিয়ে প্রথমদিকে ভারতে যেভাবে হেলাফেলা করা হয়েছিল, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ভয়ংকর বিপর্যয় তারই ফল। যদিও ভারতে করোনা সংক্রমণের হার বর্তমানে ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী এবং ইতিমধ্যে ৩০ কোটির ওপরে ভারতবাসী কমপক্ষে একটি করে করোনার ডোজ পেয়েছেন। তারপরও জনসংখ্যার নিরিখে টিকার অভাব রয়েছে সারা ভারতেই। বলা যায় টিকা নিয়ে চলছে ভয়ংকর পরিস্থিতি। লাখ লাখ মানুষ টিকার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে কিন্তু মিলছে না টিকা।
পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট চিকিত্সক কুণাল সরকার মনে করেন, হাসপাতালে করোনা রোগীরা কাতরাছে, এদিকে করোনা প্রতিরোধে টিকার অভাব। রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, রাজনীতি ভুলে আগে টিকার ব্যবস্থা করুন। মানুষকে বাঁচান। অবশ্য তার মতো বিশিষ্ট চিকিত্সকের সতর্কবাণী রাজনৈতিক নেতারা শুনবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে।
n লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক

