বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচক’ আর নয়

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:১৭

বিশ্বব্যাংক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচক ভবিষ্যতে আর প্রকাশ করা হবে না। বেশ কিছু দিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল বিশ্বব্যাংক ভবিষ্যতে আর এই সূচক প্রকাশ করবে না। তবে অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেননি যে সত্যি সত্যি ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচক প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হবে। ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচক প্রকাশের সময় বেশ কিছু অসংগতি ধরা পড়ায় বিশ্বব্যাংক এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৮ এবং ২০২০ সালের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচক প্রকাশ করা হয়, সেখানে কিছু তথ্যের গরমিল পরিলক্ষিত হয়। এরপর বিশ্বব্যাংক ইস্যুটি নিয়ে নিজেদের মধ্যে পর্যালোচনা শুরু করে। পর্যালোচনাকালে উল্লিখিত তথ্যে এমন কিছু অসংগতি পরিলক্ষিত হয়, যা বিশ্বব্যাংকের উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। গত বছর আগস্ট মাসে এই অসংগতি পরিলক্ষিত হয়। এরপর বিশ্বব্যাংক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে তারা আর এ ধরনের সূচক আর প্রকাশ করবে না। ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকের অসংগতি তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংকের তত্কালীন প্রধান অর্থনীতিবিদ পল রোমার। পরবর্তী সময়ে পল রোমার অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। পল রোমার সেই সময় অভিযোগ করেন যে, বিশ্বব্যাংকের একজন সাবেক পরিচালক জালিয়াতির মাধ্যমে এমনভাবে ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচক প্রণয়ন করেছিলেন, যা চিলির ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত্ করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছিল। তিনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে চিলির রেটিং কমিয়ে দিয়েছিলেন। এতে চিলি সরকারের ইমেজ সাংঘাতিকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ২০১৮ এবং ২০২০ সালে চাপের মুখে পড়ে কারসাজি করে চীন ও আরো কয়েকটি দেশের রেটিং এমনভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, যেন চীন ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে ওপরের দিকে থাকে। বিশ্বব্যাংক সেই সময় অতিরিক্ত পুঁজি সংগ্রহণের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছিল। তাদের ধারণা ছিল, চীনের রেটিং ভালো দেখানো হলে চীন বিশ্বব্যাংকের জন্য পুঁজি সরবরাহে এগিয়ে আসতে পারে। তাই তারা কোনোভাবেই চীনকে চটাতে চায়নি। তারা পরিকল্পিতভাবে চীনের রেটিং বাড়িয়ে দেখানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিশ্বব্যাংক সারা বিশ্বে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য ‘ছবক’ দিয়ে আসছে অনেক দিন ধরেই। তারা বিশেষ করে দরিদ্র দেশের ক্ষেত্রে উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিল শর্তারোপ করে থাকে। শক্তিশালী দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের শর্ত থাকে বরাবরই সহনীয়। কিন্তু দরিদ্র দেশের ক্ষেত্রে তাদের শর্ত সব সময়ই কঠিন হয়ে থাকে। প্রসঙ্গক্রমে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজের সময় বিশ্বব্যাংকের আচরণের বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে। পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে কথিত দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করে বিশ্বব্যাংক এই সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন থেকে দূরে সরে যায়। বাংলাদেশ তখন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজের উদ্যোগ নিলে বিশ্বব্যাংক কিছু দিন পর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফর করেন এবং বাংলাদেশকে বর্ধিত আকারে আর্থিক সহায়তা প্রদানের অঙ্গীকার করেন। বাংলাদেশ এখন বৈদেশিক সাহায্য ছাড়াই তার উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম। বাংলাদেশ যদি ’৮০-এর দশকের অবস্থায় থাকত তাহলে বিশ্বব্যাংক হয়তো অন্যরকম আচরণ করত। কথায় বলে, ‘গরিবের বউ সবারই ভাবি’। কোনো দেশ যদি অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র এবং শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে সেই সব দেশের ওপর উন্নয়ন সহযোগীরা নানা শর্তারোপ করে। কিন্তু দেশটি যদি উন্নত এবং শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তারা সেই দেশের ক্ষেত্রে কোনো শর্তারোপের আগে দুইবার চিন্তা করে। বিশ্বব্যাংক পৃথিবীব্যাপী সততা-নৈতিকতার শিক্ষা দেয় আর সেই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সূচক জালিয়াতির যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে তা খুবই নিন্দনীয়। বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এতে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সূচক জালিয়াতির কারণে বিশ্বব্যাংকের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়েছে ঠিকই কিন্তু তাই বলে ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায়নি।

একটি দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যের বিদ্যমান সুবিধা যাচাই করার একটি সহজ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হচ্ছে বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে প্রতি বছর প্রণীত ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচক।’ প্রতিটি দেশই তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিবেশ নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে। তারা এমনভাবে ইস্যুটি উপস্থাপন করে থাকেন, যেন তাদের দেশের মতো ব্যবসায়-বাণিজ্যের সুন্দর পরিবেশ বিশ্বের আর কোথাও নেই। এসব তথ্য-উপাত্ত দেখে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা থাকে। তারা তখন নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে বিনিয়োগ পরিবেশ যাচাই করতে চান। বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচক হচ্ছে সেই পরিবেশ যাচাইয়ের একটি গ্রহণযোগ্য পন্থা। বিশ্বব্যাংকের সূচক নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে অনিয়ম হয়েছে তা দূরীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। মাথাব্যথা হচ্ছে তার সরানোর জন্য ওষুধ দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ, মাথা কেটে ফেলা নয়।  

বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা অন্য কোনো দেশে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচক’ যাচাই করেন। কিন্তু সেই ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচক’ প্রণয়ন নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ উত্থাপিত হবার কারণে বিশ্বব্যাংক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ভবিষ্যতে আর এই সূচক প্রকাশ করা হবে না। অভিযোগ উঠেছে যে, বিশ্বব্যাংকের কয়েক জন কর্মকর্তা পরিকল্পিতভাবে চীন এবং এ ধরনের আরো কয়েকটি দেশকে সূচকের পরের দিকে নিয়ে আসে। ফলে বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচক’ নিয়ে অন্যদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা বিশ্বব্যাংকের এই কর্মকাণ্ডকে ধিক্কার জানাতে থাকেন। এটা বিশ্বব্যাংকের ইমেজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়েছে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভবিষ্যতে আর এমন সূচক প্রকাশ করবে না। উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংক ২০০৬ সাল থেকে বিশ্বের ১৯০টি দেশকে বিবেচনায় রেখে প্রতি বছর ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচক’ প্রকাশ করে চলেছে। এর আগে এই প্রতিবেদন নিয়ে তেমন কোনো আপত্তি উত্থাপিত হয়নি। এই প্রতিবেদন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি গাইডলাইন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু সেই গাইডলাইনের স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, যা খুবই দুঃখজনক। কোনো কোনো দেশকে ইচ্ছে করে রেটিং ভালো দেখানো হয়। আবার কাউকে মন্দ দেখানো হয়। এটা দেশগুলোর ইমেজের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

কিন্তু তার পরও কথা থেকে যায়। বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচক’ বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিস্থিতি জানার জন্য একটি সহজ এবং গ্রহণযোগ্য মাধ্যম। এতেযে সব অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে তা নিয়ে পর্যালোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তা না করে পুরো প্রক্রিয়াটাই বাতিল করা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করার সুযোগ আছে। কারণ বিশ্বব্যাপী বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচক বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখে। একই সঙ্গে তারা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকও বিবেচনায় নেন। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে উন্নতি সাধনের জন্য নানা ধরনের সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু এই সূচক প্রকাশ বন্ধ হয়ে গেলে সেই সংস্কার কার্যক্রমও কিছুটা না কিছুটা বিঘ্নিত হবে। কোনো দেশের সরকারই স্বীকার করবে না যে তাদের দেশে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত নয়। এতে বিনিয়োগের পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে। তাই ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচক বন্ধ না করে তাকে নতুনভাবে ঢেলে সজানো যেতে পারে। প্রয়োজনে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ইত্যাদি সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করে ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচক প্রণয়ন ও প্রকাশ করা যেতে পারে। এটা করা হলে দুর্নীতির মাধ্যমে সূচকের ওঠানামা অনেকটাই বন্ধ হতে পারে। ভবিষ্যতে করোনা-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে। সেই সময় উন্নত দেশের উদ্বৃত্ত পুঁজির মালিকগণ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে। সেই অবস্থায় তারা যদি উদ্দিষ্ট দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ভালো ধারণা না পায়, তাহলে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসুবিধা হতে পারে। তাই ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচক বন্ধ না করে তাকে নতুনভাবে দুর্নীতিযুক্ত করে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক