ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম
বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ। এ দেশের এক-তৃতীয়াংশই যুবসম্প্রদায়। সে অনুসারে দেশে এখন ৫ কোটির বেশি যুবক-যুবতী রয়েছেন। ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত হিসাবে যুবক-যুবতীর সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যুবসম্প্রদায়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
যুবসম্প্রদায়ের বড়ো একটি অংশ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। প্রতিবছর ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে ঢুকছেন। তাদের মধ্যে ১৩ লাখ কাজের সুযোগ পান। বাকি ৭ লাখ বেকার থাকছেন। অর্থাত্, বিভিন্ন কারণে যুবসম্প্রদায়ের ৩০ শতাংশের বেশি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারছে না। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর ১৯৮১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অধিদপ্তরের অধীনে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ৪৫ লাখ ১৫ হাজার ১৪১ জন যুব বয়সি নারী-পুরুষ। এর মধ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ করতে পেরেছেন ২০ লাখ ৮ হাজার ২৯৮ জন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনে ৭৪টি বিষয়ে (ট্রেডে) প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এক থেকে ছয় মাস মেয়াদি। অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ হয় ৭ থেকে ২১ দিন মেয়াদি। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সিরাই কেবল যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীন প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। পরিকল্পিত উপায়ে তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারলে দেশের উন্নতি ও অগ্রগতি সুদূর পরাহত। যুবসম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হচ্ছে বেকারত্ব। এই পরিস্থিতি তাদের মধ্যে উত্কণ্ঠা ও হতাশা সৃষ্টি করছে, যা তাদের প্রতিভার সুষ্ঠু বিকাশের পথে অন্তরায়। তাই বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য সামাজিক প্রয়োজনের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ রাখা একান্ত প্রয়োজন। যুবসম্প্রদায়কে সচেতন করতে হলে সর্বাগ্রে তাদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে। উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতায় সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার এখনই সময়। শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতায় যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারলে দেশ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করবে। শুধু তা-ই নয়, আধুনিক ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারলে তারা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়বে।
বর্তমান যুবসম্প্রদায়ের এক উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন ধরনের নেশায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। সুষ্ঠুধারার বিনোদন না থাকা, অধিক হারে ইন্টারনেটে আসক্ত হওয়া ইত্যাদি কারণে দিনের পর দিন মাদকাসক্ত যুবসম্প্রদায়ের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তারা তাদের সোনালি স্বপ্নকে মাদকতার অতল গহ্বরে নির্বাসন দিচ্ছে। ফলে দেশ মেধাবী নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে। মাদক, সন্ত্রাস, পর্নোগ্রাফি যুবসম্প্রদায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে বিপর্যস্ত করছে। এসব থেকে তাদের মুক্ত থাকার জন্য গঠনমূলক উদ্যোগ নিতে হবে। বিপন্ন ও বিপথগামী যুবদেরকে সঙ্গে নিতে ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পরিবারের পাশাপাশি সমাজ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও এ ব্যাপারে যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।
দেশের মোট যুবসম্প্রায়ের অর্ধেকই হচ্ছে যুবতী। তাদের প্রতিভার সুষ্ঠু বিকাশ উন্নয়নের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবার ও সমাজে যুবক-যুবতীর মর্যাদাগত অবস্থান যুব অসন্তোষের জন্য বহুলাংশে দায়ী। সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে ভবিষ্যতে আমাদের যুবসম্প্রদায় আরো এগিয়ে যাবে। আমাদের যুবসম্প্রদায়ের একটি বড়ো অংশ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে। এদের মধ্যে অধিকাংশই দরিদ্র, নিরক্ষর কিংবা শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের মান নিম্নতর, পশ্চাত্মুখী ও মূল্যবোধে আড়ষ্ট। ফলে উন্নয়নে তাদের অবদান খুবই সামান্য। দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে এদেরকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে গ্রাম পর্যায়ে সংগঠিত করতে হবে।
সর্বাগ্রে তাদের শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষ করে তুলতে হবে। দক্ষ যুবসম্প্রদায় দেশ গঠনে নিঃসন্দেহে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে। অদক্ষ যুবসম্প্রদায়কে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার কোনো বিকল্প নেই। গবেষণা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইত্যাদি সব জায়গায় তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। বরং সম্পৃক্ত করতে না পারাটাই হবে আমাদের ব্যর্থতা। প্রযুক্তিকে গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করে কীভাবে অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। সেই সঙ্গে প্রযুক্তির ক্ষতিকর দিকগুলোতে যাতে প্রবাহিত না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ রাখতে হবে। ক্ষমতায়ন এবং সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে তারা দেশের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
পরিশেষে যুবসম্প্রদায়ের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর অঙ্গীকার থাকলে তারা শক্তিশালী ও ইতিবাচক পরিবর্তনের দিশারিতে পরিণত হবে। এতে তারা নিজেদের ক্ষমতায়নের জন্য প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের অগ্রগতির জন্য কাজ করতে পারবে। আমাদের যুবসম্প্রদায়কে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশ সামগ্রিক উন্নয়নে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করবে। তারাই হচ্ছে একটি দেশের কর্ণধার। তারাই পারে একটি সমাজকে, একটি দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে। কারণ আজকের যুবসম্প্রদায় বাংলাদেশের ভবিষ্যত্।
n লেখক :সাবেক পুলিশ ও র্যাব কর্মকর্তা

