অধ্যাপক ড. নাসিম বানু
বাংলাদেশে এখন শুদ্ধিকরণ কর্মসূচি চলছে, প্রশাসনের ভাষায় বলা যায় দুর্নীতিদমন চলছে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা নিয়ে। প্রায়শই দেশের সাধারণ মানুষকে বলতে শোনা যায় রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতি ঢুকে গেছে। একটা হতাশার কথা শোনা যেত কিন্তু সংঘবদ্ধ হয়ে দুর্নীতি নির্মূল করার চেষ্টা কয়েকটি বিশেষ বিচ্ছিন্ন নজির স্থাপন ছাড়া দেখা যায়নি। এর ধারাবাহিকতা ছিল না। অবশেষে ব্যাপক আকারে দুর্নীতিদমনের উদ্যোগটা সরকারকে নিতে হলো। নিয়মমাফিক সরকারেরই নেওয়ার কথা, তবে এটা বলা যত সহজ তা বাস্তবে রূপ দেওয়া অনেক বড়ো চ্যালেঞ্জের বিষয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সেটা শুরু করেছে এবং জনগণ বিশ্বাস করেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত করে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবেন। ফলে দেশে সুশাসন নিশ্চিত হবে। একটা নির্বাচিত সরকার এবং দল কতটা আত্মবিশ্বাসী এবং গণতান্ত্রিকমনা হলে শুদ্ধিকরণের যাত্রাটা তার নিজ দল এবং মতের সমর্থকদের দিয়ে শুরু করতে পারে। একটা দলীয় সরকারের অধীনে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান সম্ভব আওয়ামী লীগ সেটা প্রমাণ করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা থাকলে বাংলাদেশ যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে। সকলেই বলছে সরকার দুর্নীতির বিষয়ে জানত, সবটুকু না জানলেও কিছুটা অবশ্যই জানত, তবে একটা সঠিক সময়ের অপেক্ষা করেছিল। তা না হলে শ্রুদ্ধিকরণের প্রশ্ন আসবে কেন? এর থেকে বোঝা গেল আওয়ামী লীগ তার কর্মী-সমর্থকদের সমস্ত কার্যকলাপের মোটামুটি একটা তথ্য রাখে। ফলে যারা দুর্নীতি করছে তারা যেমন সচেতন এবং সংশোধন হয়ে যাবে, তেমনি যারা ত্যাগী ও কর্মী, যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাস করেন, শুধু আদর্শের জন্য দলকে সমর্থন করেন, যারা নিঃস্বার্থভাবে দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, তারা অনুপ্রাণিত হবেন। তারা দ্বিগুণ উত্সাহ নিয়ে দেশ ও জাতির জন্য কাজ করবেন।
সবগুলো স্পোর্টিং ক্লাবের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে কোথায় ক্যাসিনো চলছে আর কোথায় চলছে না। ‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’ এই একটা কথা আমরা ছোটোবেলা থেকেই শুনে আসছি। যাদের ওপরে দেশের খেলোয়াড় তৈরি করার দায়িত্ব ছিল, দেশের জনগণের সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা বিধান করার দায়িত্ব ছিল, তারাই দেশে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর জুয়াড়ি তৈরি করছে এটা বুঝতে সময় লাগার কথা। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শুধু বর্তমান উপাচার্য নয় বিগত উপাচার্যদের কার্যকলাপের ন্যায়-অন্যায়ের পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসবে, শিক্ষার গুণগতমান বাড়বে। দেশে যোগ্য এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে, যে মানবসম্পদ ভবিষ্যতে দেশ ও জাতি গঠন করবে, বাংলাদেশের উন্নয়নে নেতৃত্ব দিবে। সরকারের বর্তমান শুদ্ধিকরণের প্রক্রিয়া ভবিষ্যত্ বাংলাদেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। স্থিতিশীল উন্নয়ন মানে হলো বর্তমানের চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যতের ৭ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বসবাসযোগ্য করে যেতে হবে। বর্তমান সরকার ভবিষ্যত্ ৭ প্রজন্মের জন্য দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে দিয়ে যাবে। বাংলাদেশের সকল নাগরিকের দায়িত্ব হলো সরকারের এই উদ্যোগের সমালোচনা না করে সহযোদ্ধা হওয়া। বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয় দেশের সকল নাগরিকের। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুদূর আমেরিকাতে বসে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন এই শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া চলতে থাকবে। তিনি বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত করবেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে অভিযান চলছে, ক্যাসিনো ব্যবসা দিয়ে শুরু। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এত লোক জুয়াড়ি এটা ভাবতে ভয় হয় এবং অসম্ভব মনে হয়। এর মানেই হলো আমাদের সমাজে অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। দেশের জনগণের অর্জিত অর্থ দেশের উন্নয়নে ব্যয় না হয়ে জুয়ার আড্ডা থেকে বিদেশে চলে যাচ্ছে, যার পরিমাণ প্রতিদিন কল্পনাতীত হারে বাড়ছে। হোয়াইট কালার ক্রিমিনালদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। দেশে কালো টাকা সাদা করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। বিদেশে পাচারকৃত কালো টাকা দেশে ফিরিয়ে এনে শিল্পখাতে ব্যয় করতে হবে। এতে বাংলাদেশ দ্রুত শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হবে। এত বিপুল পরিমাণ অর্থ!! যে অর্থ দিয়ে কৃষিকে শিল্পে রূপান্তরিত করা সম্ভব। যা বাংলাদেশের কৃষিতে বিপ্লব ঘটাতে পারবে। সর্বক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করতে হবে। যাতে অর্থের অপচয় না হয়। উদাহরণস্বরূপ: এক ফুটপাত থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ যেন কিছুদিন পর পর করতে না হয়। প্রতিষ্ঠানের নিজের দায়িত্ব তার দুর্বলতা দূর করা। এতে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়বে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। যা দুর্নীতিদমনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
সরকারের এই শুদ্ধিকরণের প্রক্রিয়াকে বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো অভিনন্দন জানিয়েছেন। তার মানে শুদ্ধিকরণের প্রক্রিয়া দেশে একটা ইতিবাচক জনমত তৈরি করতে পেরেছে। আর জনমত হলো দেশের গণতন্ত্র বাস্তবায়নের অন্যতম একটি প্রধান মাধ্যম। রাজনৈতিক দলগুলো বুঝতে পারছে কর্মী-সমর্থক নেওয়ার আগে যাচাই করে নিতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে দুর্বৃত্তের অনুপ্রবেশ ঠেকানো যায়। রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় মনে করে অনুপ্রবেশকারীদের নিজের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে নিবে কিন্তু সবক্ষেত্রে সেটা সফল হয় না। কারণ অনুপ্রবেশকারীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সুবিধাবাদী হয়ে থাকে। রাজনীতিবিদদের এই ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের মানুষকে রাজনীতিবিমুখ করে ফেলছে। যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি স্বরূপ। এতে গণতন্ত্র বিপর্যস্ত হতে পারে। এই মুহূর্তে দেশের রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব আগের থেকে অনেক বেশি বেড়ে গেল। যাতে অবাধ অর্থ দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ এবং রাজনীতিবিদদের মূল্যবোধ নষ্ট করে দিতে না পারে। প্রবীণ রাজনীতিবিদদের এই বিষয়ে দায়িত্বশীল এবং দক্ষতার সঙ্গে ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্মোহ এবং নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে। এই কথা জোর দিয়ে বলা যায় বাংলাদেশে যে দক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আছে সেটা পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের থেকে দক্ষ বাহিনী। বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ এবং মৌলবাদের উত্থান দমনে সফল হয়েছে, ইউএন মিশনে শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের জনগণ বিশ্বাস করতে চায়, নির্ভর করতে চায় যে, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দক্ষতার সঙ্গে দুর্নীতি দমনে সফল হবে। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো দুর্নীতি দমনে বাংলাদেশ আগে কখনো শতভাগ সফল হয়নি বলে এখনো সফল হবে না এটা বলা যাবে না। কারণ ভালো কাজ যে কোনো সময় নতুন করে শুরু করা যায়, ভালো কাজ করার কোনো সময় নেই। ভালো কাজকে মূল্যায়ন করতে হবে, অনুপ্রাণিত করতে হবে, ভালো কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে। ভালো কাজ বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিতে হবে।
দুর্নীতিবাজদের কোনো দল বা মত থাকে না। তাদের একটাই আদর্শ সেটা হলো তাদের নিজের স্বার্থ উদ্ধার করা। এই স্বার্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়াতে দেশ এবং জাতি ক্ষতি হলো কি না বা সামাজিক মূল্যবোধ নষ্ট হলো কি না সেটা তাদের ভাবনার বিষয় নয়। দেশ জাতি এবং সামাজিক মূল্যবোধ কখনোই তাদের বিবেচনায় থাকে না। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ জনগণকে দেশ, জাতি এবং সামাজিক মূল্যবোধের কথা বিবেচনা করতে হবে। দেশ জাতি এবং সামাজিক মূল্যবোধকে রক্ষা করতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে পরিবার একটা বড়ো ভূমিকা পালন করতে পারে। এই কথা অনস্বীকার্য যে প্রতিটি পরিবার একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান যা সামাজিক মূল্যবোধ ধরে রাখার একটি অন্যতম প্রধান মাধ্যম। প্রতিটি পরিবারই পারে তাদের পারিবারিক সদস্যদের কার্যকলাপের তদারকি করতে। বিশেষত শিশু এবং যুবকদের, যারা জাতির ভবিষ্যত্। পরিবার তার প্রতিটি সদস্যদের, শিশু এবং যুবকদের ন্যায়-অন্যায়ের তফাত্টা পরিবার থেকে শিক্ষা দিতে পারে। আর এই শিক্ষা দিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের দুর্নীতি বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোর এবং মূল্যবোধের যেটুকু ক্ষতি করেছে সেটা পূরণ করে দিয়ে সামাজিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। বাংলাদেশে একটা সুষ্ঠু সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। পরিবার থেকে সমাজ আর সমাজ থেকে রাষ্ট্র শুদ্ধিকরণের এই প্রক্রিয়াটা যদি তিনটি পর্যায়ে একই সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শুরু করা যায় তাহলে দুর্নীতিমুক্ত উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। অসম্ভব কোনো কিছু নয়।
n লেখক : ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ

