লকডাউনে যুবকদের যেভাবে কাটছে রমজান

লকডাউনে যুবকদের যেভাবে কাটছে রমজান
লকডাউনে যুবকদের যেভাবে কাটছে রমজান।ছবি:সংগৃহীত

দ্রুতই রমজানের দিনগুলো কেটে যাচ্ছে। রমজান সবার জন্যই শান্তির বার্তা নিয়ে আসে। তবে যুবকদের সংশোধনের জন্য রমজান বিশেষ গুরুত্ব রাখে। কোন জাতির মেরুদণ্ড হচ্ছে যুব সমাজ। আজকের তরুণ সমাজ আগামী দিনের দেশ ও জাতির কাণ্ডারি। একটি দেশ ও জাতির জন্য যৌবন হচ্ছে একটি আদর্শ স্বপ্ন। যে জাতির যুব সমাজ যত দক্ষ এবং উন্নত চরিত্রের অধিকারী সে জাতি তত বেশি দ্রুত উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে।

বিশ্বময় মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে সবারই এবারের রমজান কাটছে একটু ভিন্নরূপে। যারা রমজানের রোজা তেমন একটা রাখতেন না, বিশেষ করে যুব শ্রেণিকে রমজানে কম রোজা রাখতে লক্ষ্য করতাম কিন্তু তারাও এবার রোজা পালন করছেন। করোনা পরিস্থিতির কারণে এই লকডাউনের দিনগুলোতে যুবকদের কেমন কাটছে রমজান। তা জানার জন্য কথা বলি কয়েকজন যুবকের সাথে। জানতে চাই তাদের অভিব্যক্তি।

লকডাউনে কেমন কাটছে রমজান এমন প্রশ্ন রেখে জানতে চাইলে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী মুন্না বাবর বলেন, ‘কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস নামে পরিচিত পৃথিবীব্যাপী মহামারির রূপ ধারণ করে। এরই মাঝে এসেছে পবিত্র মাহে রমজান। করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও লকডাউন চলছে। সরকারি বিধি অনুযায়ী সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে মসজিদে মুসল্লিদের পাঁচজনের বেশি নামাজ পড়তে যাওয়া নিষেধ করা হয় প্রথমে, যা একজন মুসলমান হিসেবে মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তা আমাদেরকে অবশ্যই মানতে হয়। সে অনুযায়ী ইবাদত-বন্দেগি ঘরেই আদায় করি।’

তিনি আরো বলেন, ‘সম্প্রতি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এবং নিয়ম-নীতি মেনে মসজিদে নামাজের অনুমতি দিয়েছে। এখন মসজিদেই তারাবিসহ ওয়াক্তের নামাজ আদায় করতে পারছি। লকডাউনের কারণে যেহেতু বাহিরে গিয়ে সময় নষ্ট করার কোন সুযোগ নেই, তাই বলা যায় অন্যান্য বছরের তুলনায় এবছর প্রত্যেকটি রোজা রাখার, সময়মত নামাজ আদায় এবং কোরআন পাঠসহ অন্যান্য ইবাদতও মনে হচ্ছে পূর্বের তুলনায় বেশি করার তৌফিক পাচ্ছি।’

এ বিষয়ে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া কমিউনিকেশন বিষয় নিয়ে অধ্যয়নরত ইমতিয়াজ ইসলাম রকি বলেন, ‘এবারের রমজান মাসটা আমার জীবনে একটু ব্যতিক্রম হয়েই আসলো। তা কেবল করোনা ভাইরাসের কারণে উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতির কারণেই না। বরং এর কারণ হলো আমি জীবনে কখনোই রমজানের সবক’টি রোজা রাখার সৌভাগ্যে সৌভাগ্যমন্ডিত হতে পারিনি। এবারই আমার জীবনে প্রথম রমজান, যেখানে শুধু সবগুলি রোজা পালন করার সফলতাই লাভ করছি না বরং রমজানের শেষ ১০ দিনে ইতিকাফে বসারও ইচ্ছা রাখছি।’

তিনি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে লকডাউনে থেকে রোজা পালন করা সহজতর হচ্ছে এটা ঠিক। কিন্তু পারিবারিক পরিবেশের বাইরে, আত্মীয়-স্বজন থেকে দূরে, খাদ্য দ্রব্যাদির সীমিত অবস্থা বা রুচিমাফিক বিলাসবহুলতার অপ্রতুলতার মাঝে থেকে এবারের রমজান পালন করা একটু কষ্টসাধ্য হওয়ার কথা ছিল বা আমার আত্মীয় স্বজনেরা তদ্রুপ ধারনাই পোষণ করবে এটাই স্বাভাবিক! কিন্তু আল্লাহতায়ালার রহম যে, আমার মাঝে কোনো প্রকার কষ্টসাধ্যতা প্রকাশ পায়নি, আলহামদুলিল্লাহ।’

আরো পড়ুন: গুনাহ মাফের মাস রমজান

লকডাউনে কেমন কাটছে রমজান এমন প্রশ্ন রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সম্মান চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মো. হেদায়েতুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ! সমস্ত বিশ্বের মুসলমানরা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে পুনরায় আরেকবার পবিত্র ও বরকতপূর্ণ রমজান মাস লাভ করার তৌফিক পেয়েছে। তবে এবারের রমজান মাসটি আমাদের কাছে এসেছে এক সঙ্কটময় পরিবেশে। সারা বিশ্বের সকল মানুষ এখন করোনা ভাইরাস নামক মহামারির ভয়ে আতঙ্কিত। প্রতিদিনই বিশ্বে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছেই। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এ সময়টায় সারা বিশ্ব নতুন করে আইসোলেশন, লকডাউন, হোম কোয়ারেন্টাইন ইত্যাদি বহুল নতুন শব্দের সহিত পরিচিতি লাভ করেছে। আমরাও বর্তমানে লকডাউনে আছি আর পবিত্র মাস এভাবেই কাটছে।

তিনি আরো বলেন, ‘আমি মনে করি লকডাউন আমার কাছে আশীর্বাদস্বরূপ। কারণ লকডাউন থাকায় শুধুমাত্র অতীব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের হওয়া লাগছে না। বাসায় বসে নিয়মিত ইসলামী বিভিন্ন বই-পুস্তক পড়ছি। এবার যেহেতু বাসায় বন্দি সেহেতু রমজান মাস শুরুর আগে নিয়ত করেছিলাম অর্থসহ কোরআন খতম দিবো। আগেও কয়েকবার রমজানে কোরআন খতম দিয়েছিলাম কিন্তু অর্থসহ খতম কখনোই দেয়া হয়নি। আলহামদুলিল্লাহ এখন পর্যন্ত অর্থসহ ২৩ পারা পাঠ করে শেষ করেছি।

আমার বাবা সিনিয়র সহকারী শিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই কখনোই বাবাকে বেশি সময়ের জন্য কাছে পাইনি। সকালে টিউশনি, তারপর স্কুল, আবার সন্ধ্যার পর টিউশনি, এই রুটিন অনুসরণ করে দিনগুলো যাচ্ছিল। কিন্তু আমার ২৫ বছরের জীবনে শুধুমাত্র লকডাউনের আশীর্বাদে বাবাকে অনেক সময়ের জন্য কাছে পেলাম। এই সুবর্ণ সুযোগটা হেলায় হারিয়ে যেতে দেয়নি। যখন মসজিদও লকডাউন হয়ে গেল তখন বাবা, আমি আর ছোট ভাই মিলে ৫ ওয়াক্ত নামাজের সময়সূচি তৈরি করে ঘরে ঝুলিয়ে দিয়েছি। এতে করে সময়মত ৫ ওয়াক্ত বাজামাত নামাজ পড়া হচ্ছে নিয়মিত। পেছনে মা ও বোনও নামাজ পড়ছে আমাদের সাথে। রমজানের চাঁদ দেখার পর থেকে প্রতিদিন তারাবির নামাজও পড়ছি পরিবারের সবাই মিলে। মানে আমরা বাড়িকেই একটি মসজিদ বানিয়ে ফেলেছি।’

তিনি বলেন, ‘ঈদের নামাজ মসজিদে গিয়ে আদায় করব আর আশা রাখি ততদিনে পরিস্থিতি অনেক উন্নতি হয়ে যাবে। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সকলকে রমজানের বাকি দিনগুলোতে সুস্থতার সাথে নিরবচ্ছিন্ন সাধনায় আত্মনিয়োগের তৌফিক দান করুন।’

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত