বৈধ পথে গেলেও চোরাইপথে একাধিকবার দেশে ফেরেন কাদের খান

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০১৯, ২০:০৪

এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন- এমন অকাট্য প্রমাণ রাখতে ভিসা-পাসপোর্টে বৈধভাবে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে গত বছর ১৯ অক্টোবর ভারতে যান এবং চলতি বছর ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি ভারতে অবস্থান করেন কাদের খান। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে তিনি একাধিকবার চোরাই পথে দেশে ফেরেন। এমপি লিটন হত্যার মিশনটি সফল করতেই তার এই কূটকৌশল।

এছাড়া উপজেলার একাধিক মন্দিরে প্রতিমা ভাংচুর ও হামলা চালিয়ে নব্য জেএমবি হিসেবে দায় স্বীকার করে একটি হাতে লেখা হুমকিপত্র রেখে যান। সুন্দরগঞ্জ জেএমবি প্রভাবিত এলাকা প্রমাণ করতেই কাদের খান সুপরিকল্পিতভাবে এসব কাজে তার ভাতিজা ফয়সাল খান ফাগুনসহ নিজস্ব লোকজনদের ব্যবহার করেন। ফলে একদিকে পুলিশ ব্যস্ত হয়ে পড়ে নব্য জেএমবি তথা জামায়াত-শিবিবের অস্থিরতায়, অন্যদিকে লিটনের হত্যার দায় গিয়ে বর্তে অন্যদিকে। আর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন কাদের খান।  

এমপি লিটন হত্যা মামলা পুলিশের তদন্তে প্রথম দিকে এ রকম চিত্র উঠে আসে বলে জানান, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সুন্দরগঞ্জ থানার তৎকালীন পরিদর্শক আবু হায়দার মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান।  

তিনি আরও জানান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাতে কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া কিলাররা গ্রেপ্তার হয়ে হত্যাকাণ্ডের সব কিছু স্বীকার করায় এবং ওই ঘটনার যথেষ্ট আলামত ও তথ্য উপাত্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে থাকায় বাধ্য হয়ে সবকিছু স্বীকার করেছেন কাদের খান। 

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সুন্দরগঞ্জ থানার তৎকালীন পরিদর্শক আবু হায়দার মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান ও তদন্ত কাজে অংশ নেওয়া পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, ভারতের আসাম রাজ্যের একটি স্থলবন্দর দিয়ে চোরাই পথে কয়েক দফা বাংলাদেশে আসেন কাদের খান। সর্বশেষ চোরাই পথে কাদের খান বাংলাদেশে এসে ৩১ ডিসেম্বর সুন্দরগঞ্জের নিজ বাড়িতে থেকে এমপি লিটন হত্যা মিশন সফল করেন। পরে কিলারদের বগুড়ার নিজ বাড়িতে রেখে তাদের ঢাকায় পাঠানোর পর তিনি আবারো চোরাই পথে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান। পরবর্তীতে তিনি চলতি বছর ৬ জানুয়ারি পাসপোর্ট-ভিসায় বৈধভাবে ভারত থেকে দেশে ফেরেন। 

আরও পড়ুন: কুড়িয়ে পাওয়া ম্যাগজিনের সূত্র ধরে বের হলো লিটন হত্যার রহস্য

কে এই কাদের খান?
সাজাপ্রাপ্ত কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খাঁন সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপরহাটি ইউনিয়নের পশ্চিম ছাপরহাটি (খাঁনপাড়া) গ্রামের মৃত নয়ান খাঁনের ছেলে। ২০০৪ সালে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। পরে তিনি জাতীয় পার্টির (এরশাদ) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্যও ছিলেন। ওই দল থেকে তিনি ২০০৮ সালে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পেশায় চিকিৎসক আবদুল কাদের খানের বগুড়াতে আছে একটি বহুতল ভবন। সেই ভবনের চার তলায় তার বাড়ি ও বাকিগুলোতে তার নিজের পরিচালিত গরীব শাহ ক্লিনিক। তিনি পরিবার নিয়ে বগুড়া জেলা শহরের সেই বাড়িতে বসবাস করতেন। তিনি বগুড়া থেকে ‘দৈনিক উত্তরের খবর’ নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন। এছাড়া গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল ছাপরহাটি ইউনিয়নের পশ্চিম ছাপরহাটি (খাঁনপাড়া) গ্রামেও রয়েছে বিলাসবহুল একটি বাড়ি।

অন্য আসামীদের পরিচয়:
মামলার অপর আসামি চন্দন কুমার রায় উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মনমথ গ্রামের সুশীল চন্দ্র সরকারের ছেলে। হঠাৎ করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-দপ্তর সম্পাদকের পদ পেয়েই জিরো থেকে হিরো হয়ে ওঠেন। অথচ তার দরিদ্র পিতা কাঠুরে হিসেবে এখনও জীবিকা নির্বাহ করছেন। চন্দন ওই এলাকার কয়েকজন নামধারী সাংবাদিক এবং সন্ত্রাসীদের নিয়ে একটি চাঁদাবাজ গ্রুপ তৈরি করেন। তার নেতৃত্বে এই গ্রুপটির কাজই ছিলো মূলত নানা বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করে পরবর্তীতে টাকা নিয়ে তা মীমাংসা করা। কাদের খান যখন এমপি ছিলেন তখন এমপির বিশেষ বরাদ্দের কয়েকটি প্রকল্পের বিরুদ্ধে চন্দন এবং তার অনুসারীদের স্বাক্ষরে বিভিন্ন দপ্তরে কয়েকটি অভিযোগ দাখিল করে। এ ব্যাপারে তদন্ত শুরু হলে কাদের খানের লোকজন তার নির্দেশে চন্দনকে ম্যানেজ করে নেয়। এভাবেই কাদের খানের সাথে তার বিশেষ সখ্যতা গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে এমপি লিটনের সাথে তার সখ্যতা গড়ে উঠে। কিন্তু লিটন তার এই সমস্ত চাঁদাবাজি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে এবং তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। এই ক্ষোভে চন্দন সরকার সে সময়কার লিটন বিরোধী আওয়ামী লীগের অন্য গ্রুপটির সাথে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং এমপি লিটনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে নানা অভিযোগ করতে শুরু করে। পরবর্তীতে লিটনকে খুন করতে কাদের খানের সাথে সোর্স হিসেবে সম্পৃক্ত হন। 

আর কারাগারে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া আসামি সুবল চন্দ্র রায় পেশায় ছিলেন একজন কসাই। চন্দন কুমার রায়ের ভগ্নিপতি। চন্দনের হাত ধরে তিনি এই হত্যাকাণ্ডে যুক্ত হন। তারা দুইজনেই ছিলেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটনার সোর্স। সুযোগ, সময় ও পরিকল্পনায় তারা যুক্ত ছিলেন।

আব্দুল কাদেরের দুর সম্পর্কের ভাগ্নে ও কাদের খানের বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক শাহীন মিয়া (২৫) সুন্দরগঞ্জ উপজেলার উত্তর সমস কবিরাজটারী গ্রামের ওসমান গনি ভুট্টুর ছেলে। রিকশাচালক পরবর্তীতে কাদের খানের কাজের লোক মেহেদী হাসান (২৬) একই গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে। আনোয়ারুল ইসলাম ওরফে রানা (২৯) সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভেলারায় কাজীর ভিটা গ্রামের তমশের আলীর ছেলে ও ঢাকার একটি পোষক তৈরির কারখানার শ্রমিক ছিলেন। গাড়ির চালক আব্দুল হান্নান (৩০) বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার কামারপাড়া আব্দুর রহমান প্রামাণিকের ছেলে। কাদেরের ঘনিষ্ঠজন হিসাবে পরিচিত আব্দুল হান্নান দীর্ঘ ৮ বছর থেকে তার গাড়ির চালক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। 

ইত্তেফাক/এসি