ঢাকা শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২৭ °সে

আতাইকুলার ১০ বীরাঙ্গনা পেলেন মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা

আতাইকুলার ১০ বীরাঙ্গনা পেলেন মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা
মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ৬ বীরাঙ্গনার ৫ জন। ছবি: ইত্তেফাক

অবশেষে স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর ১০বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা পেলেন। তারা নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। মুক্তিযোদ্ধাদের সমান সকল সুযোগ-সুবিধা পেতে যাচ্ছে স্বামী, সন্তান ও সম্ভ্রম হারানো এই বীরাঙ্গনারা।

তবে এই ১০বীরাঙ্গনার মধ্যে ইতিমধ্যে ৪জন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আর বয়সের ভারে নুয়ে পড়ে বেঁচে আছেন আর ৬বীরাঙ্গনা। বানী রানী পাল, ক্ষান্ত রানী পাল, রেনু বালা ও সুষমা সূত্রধর রোগে আক্রান্ত হয়ে অভাব-অনটনের সংসারে উন্নত চিকিৎসার অভাবে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আর বয়সের ভারে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কোনমতে বেঁচে আছেন মায়া রানী সূত্রধর, রাশমনি সূত্রধর, সন্ধ্যা রানী পাল, কালীদাসী পাল, সন্ধ্যা রানী ও গীতা রানী পাল।

সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি গেজেটের মাধ্যমে তাদের নাম প্রকাশ করেন। এতে করে বর্তমান সরকার ৪৭বছরের লালন করা দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন বাস্তবায়ন করলো বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

একাত্তরের সেই দুর্বিসহ যন্ত্রনা ও সামাজিক বঞ্চনার পাশাপাশি অনেকটা দুঃখ-দুর্দশার অভাব-অনটন আর অসুস্থ্যতার মধ্যেই চলছে তাদের জীবন সংগ্রাম।

রাণীনগর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে নওগাঁর ছোট যমুনা নদীর তীরে ছায়ায় ঘেরা শান্ত আতাইকুলা পালপাড়া গ্রাম। ১৯৭১ সালের ২৫এপ্রিল পাক-হানদার বাহিনীর স্থানীয় দোসর রাজাকার ও আলবদরদের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নির্যাতন চালায় এই পালপাড়া গ্রামের সনাতন ধর্মের মানুষদের ওপর। এই সময় গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নীসংযোগ, লুটপাটসহ জঘন্য ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সংখ্যালঘু পরিবারের কিশোর, যুবক, মাঝ বয়সী, ও বিভিন্ন বয়সী নারীদের ধরে ওই গ্রামের সুরেস্বর পালের বাড়ির বারান্দায় একত্রিত করে 'জয়বাংলা বলতে হ্যায় নৌকামে ভোট দিতে হ্যায়' এভাবে পাক সেনারা ব্যাঙ্গোক্তি করতে করতে ব্রাশ ফায়ার করে। তারা হত্যা করে গবীন্দ চরণ পাল, সুরেশ্বর পাল, বিক্ষয় সূত্রধর, নিবারণ পালসহ ৫২জন মুক্তিকামী মানুষকে। এ সময় পাক হানদার বাহিনী গণহত্যা, লুটপাট ও নারী নির্যাতনের মতো ধ্বংসলীলা থেকে বিশেষ করে নারীরা স্বামী সন্তানদের প্রাণে বাঁচানোর শেষ আকুতিটুকু করলেও পাক হানাদারদের মন তা গলাতে পারেনি। উল্টো তারা নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে নওগাঁ জেলা শহরের উদ্দেশে চলে যায়।

৫২ শহীদের তাজা রক্তে সে দিন নওগাঁর ছোট যমুনা নদীর পানি লাল হয়ে গিয়েছিল। নির্যাতিত নারী ও স্বজনদের হৃদয় বিদারক আর্তনাদ ও কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল।

চোখের জল ফেলতে ফেলতে বীরাঙ্গনা কালী দাসী পাল (৭৫) বলেন, 'ওই দিন সকালে যখন আমাদের গ্রামে পাঞ্জাবী আসে তখন আমার স্বামীসহ বাড়ির দরোজা লাগিয়ে আত্মগোপনের চেষ্টা করি। কিন্তু স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগীতায় গেটের দরোজা ভেঙে আমার স্বামীকে টেনে হিঁচড়ে পাঞ্জাবীরা রাইফেল দিয়ে মারতে মারতে যোগেন্দ্রনাথের বারান্দায় ফেলে রাখে। স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা চাইতে গিয়ে আমার কথা না শুনে চোখের সামনে আমার স্বামীসহ ৫২জনকে হত্যা করে উল্টো আমার উপরও তারা নির্যাতন চালায়। আমার এক ছেলে আছে। অভাবের সংসারে সে দিনমজুরের কাজ করে। আমিও পেটের তাগিদে কখনও ধান কুড়িয়ে, বয়লারের চাতালে কাজ করে, কিংবা অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে দুমুঠো ডাল ভাত খেয়ে কোনোমতে বেঁচে আছি। ভেবেছিলাম বেঁচে থাকতে আর মনে হয় স্বীকৃতি পাবো না। তবে অবশেষে এই স্বীকৃতি পেয়ে আমি অনেক খুশি। এই সরকারকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।'

বীরাঙ্গনা সন্ধ্যা রাণী পাল (৭০) বলেন, 'ওই দিন সকাল নয়টার দিকে আমার স্বামী বাড়িতে কাজ করছিলো। এ অবস্থায় তাকে পাঞ্জাবীরা ধরে নিয়ে যায়। সুরেশ্বর পালের বাড়িতে নিয়ে লাইন করে রাখে। এই দিকে পাঞ্জাবীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে লুটপাট ভাংচুড় ও অগ্নিসংযোগসহ নানা ধরণের নির্যাতন চালায়। আমি ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে পাশের বাড়ির এক বড়ো মাটির ডাবরের ভিতর আশ্রয় গ্রহণ করি। বাচ্চার কান্না পাঞ্জাবীরা শুনতে পেয়ে আমাকে সেখান থেকে বের হওয়ার কথা বলে। তখন আমি পালিয়ে মাঠের মধ্যে দৌড়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগীতায় পাক-বাহিনীরা এই গ্রামের মেয়েদের সঙ্গে অনেক খারাপ আচরণ করেছে। আমাদের অবশেষে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনেক ধন্যবাদ। স্বামী হারানোর পর থেকে ৪৭টি বছর অভাব-অনটনের মধ্যে জীবন কাটালাম। তাই স্বীকৃতির পাশাপাশি সকল সুযোগ-সুবিধা যদি দ্রুত আমাদের দেওয়া হতো তাহলে যে কদিন বাঁচি তা ভোগ করে যেতে পারতাম।'

রাণীনগর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এ্যাড. ইসমাইল হোসেন বলেন, 'অনেক চেষ্টার পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার অবশেষে আতাইকুলাগ্রামের ১০বীরঙ্গনাকে স্বীকৃতি প্রদানের লক্ষ্যে নাম গেজেটভুক্ত করেছেন। এই স্বীকৃতি প্রাপ্তির সকল প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। বরাদ্দ এলেই আগামী বিজয় দিবসে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হবে বলে আমি আশা করছি।'

আরও পড়ুন: পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পথে শিক্ষার্থীকে কুপিয়ে জখম

নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রাণীনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো: ইসরাফিল আলম বলেন, 'বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবার ও বীরাঙ্গনাদের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক। অবশেষে আমাদের সবার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের এই বীরাঙ্গনারা মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা পেয়েছেন। এটি আমাদের অনেক বড়ো একটি সফলতা। যে কজন বীরাঙ্গনারা এখনও বেঁচে আছেন তারা অনন্ত তাদের নায্য প্রাপ্যটুকু একটু হলেও ভোগ করে ও স্বীকৃতির মুকুট মাথায় নিয়ে সমাজে বেঁচে থাকতে পারবেন।'

ইত্তেফাক/নূহু

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন