পানিপথে মালয়েশিয়া: সাত বছরেও খোঁজ মেলেনি ওদের

পানিপথে মালয়েশিয়া: সাত বছরেও খোঁজ মেলেনি ওদের
চৌগাছায় নিখোঁজ ৬ ব্যক্তি। ছবি: ইত্তেফাক

চৌগাছায় দালালের খপ্পরে পড়ে দীর্ঘ প্রায় সাত বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছেন একই পরিবারের চারজনসহ সাত ব্যক্তি। মালয়েশিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হয়ে তারা আর ফিরে আসেননি।

ঘটনার প্রায় সাত বছর পর রবিবার রাতে এক দালালকে চৌগাছা শহর থেকে ধরে পুলিশে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ওই রাতেই নিখোঁজ অমিত হাসান মুকুলের বাবা আতিয়ার রহমান চৌগাছা থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের ৭ ধারায় মামলা করেন। পুলিশ এ মামলায় পরিবারের লোকদের হাতে আটক দালাল ফজলুর রহমান রাজুকে (৪৮) গ্রেফতার দেখিয়েছে।

থানায় দায়ের হওয়া মামলায় ভুক্তভোগী পরিবারের লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পাতিবিলা ইউনিয়নের মুক্তদাহ গ্রামের একই পরিবারের আতিয়ার রহমানের ছেলে অমিত হাসান মুকুল (৩০), হায়দার আলীর ছেলে আজিজুর রহমান (৪০), মৃত বদর উদ্দিনের ছেলে ফুলজার হোসেন (৪৬), মৃত ছবেদ আলীর ছেলে শরিফুল ইসলাম খোকন (৪০), একই গ্রামের মৃত আত্তাপ হোসেনের ছেলে শফিকুল ইসলাম (২৭), রোস্তমপুর গ্রামের মৃত সেকেন্দার আলীর ছেলে রমজান আলী (৪৫) এবং ফুলসারা ইউনিয়নের দুর্গাবরকাটি গ্রামের উসমান আলীর ছেলে লিটন হোসেন (২৭) ২০১৩ সালের ১ জুন মালয়েশিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর থেকে তারা নিখোঁজ রয়েছেন।

নিখোঁজ ব্যক্তিরা ছিলেন স্ব-স্ব পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তারা না ফেরায় নিখোঁজদের সাত পরিবারে নেমে এসেছে চরম হতাশা। উৎসব-পার্বন এলেই কান্নার রোল পড়ে যায় বাড়িগুলোতে। দীর্ঘদিন তারা নিখোঁজ থাকায় চরম দারিদ্র্য গ্রাস করেছে পরিবারগুলোকে। ফলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।

অল্প টাকায় (সে সময়ে জনপ্রতি ৩ লাখ টাকা) মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রলোভনে গরীব পরিবারের এসব ব্যক্তি আদম ব্যাপারির খপ্পরে পড়েন। মুক্তদাহ গ্রামে বিয়ের সূত্রে বসবাসকারী সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার রতনপুর ইউনিয়নের গোয়ালপোতা গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে ফজলুর রহমান রাজু তাদেরকে ফুঁসলিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাঠানোর পর থেকে আজো তারা নিখোঁজ।

২০১৩ সালের ১ জুন বাড়ি থেকে একযোগে বের হয়েছিলেন ওই হতভাগ্যরা। ১২ জুন অমিত হাসান মুকুল বাড়িতে ফোন করে বলেন, ‘আমরা সবাই পানিপথে মালয়েশিয়া যাচ্ছি। ট্রলারে উঠেছি, এখনই রওনা দেবো।’ এটিই ছিল তার পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা।

মুকুলের স্ত্রী চামেলি খাতুন বলেন, ‘যে নাম্বার থেকে ফোন দিয়েছিল, সেই নাম্বার পরে বন্ধ পেয়েছি। বারবার চেষ্টা করেও ফোনে কাউকে পাওয়া যায়নি। এরপর ছয়টি বছর কেটে গেলেও স্বামীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। অতিকষ্টে দিন কাটছে আমাদের।’

নিখোঁজ রহমানের মা মনোয়ারা বেগম (৬০) হতাশ কণ্ঠে বলেন, অনেক চেষ্টা করেও নিখোঁজদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ আজিজুর রহমানের স্ত্রী দুটি সন্তান ফেলে চলে গেছেন। দাদীর কাছে থেকে শিশু দুটি অতি কষ্টে বেড়ে উঠছে। তাদের বাবা আদৌ বেঁচে আছেন কি-না তাও জানে না অবুঝ এই শিশুরা।

নিখোঁজের তিন মাস পর তারা মুক্তদাহ গ্রামের ঘরজামাই আদম ব্যাপারি রাজুর কাছে যান। স্বজনদের ফেরত পেতে চাপ দিতে থাকেন। এ সময় রাজু তার সহযোগী চট্টগ্রামের টেকনাফের অপর আদম ব্যাপারি রাশেদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দেন। টেকনাফের দালাল রাশেদুল তাদেরকে বলেন, ‘কোনো সমস্যা নেই, ওরা দুই-এক দিনের মধ্যেই মালয়েশিয়া পৌঁছে যাবে।’

কিছুদিন পরই মুক্তদাহ গ্রামের ঘরজামাই দালাল রাজু তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে রাতের আঁধারে আত্মগোপনে চলে যান। পরে টেকনাফ ও মুক্তদাহ গ্রামের দালালের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর রাজু একই উপজেলার মাধবপুর গ্রামের আতিয়ার রহমানের মেয়ে রনি বেগমকে বিয়ে করেন। সেখানে যাতায়াত করলেও নিখোঁজদের পরিবারগুলো তা জানতো না। দীর্ঘ প্রায় সাত বছর পর রোববার রাতে রাজুকে চৌগাছা বাজারে দেখতে পেয়ে ওই পরিবারের সদস্যরা ধরে মুক্তদাহ গ্রামে নিয়ে যান। পরে তাকে চৌগাছা থানায় সোপর্দ করা হয়।

এ ঘটনায় অমিত হাসান মুকুলের বাবা আতিয়ার রহমান চৌগাছা থানায় মানব পাচার, প্রতিরোধ ও দমন আইনের ৭ ধারায় মামলা করেন। মামলায় টেকনাফের দালাল রাশেদুল ইসলাম এবং আরেক দালাল আলমকে আসামি করা হয়। পুলিশ মামলায় ফজলুর রহমান রাজুকে গ্রেফতার দেখিয়ে সোমবার দুপুরে আদালতে পাঠিয়েছে।

নিখোঁজ মুকুলের বাবা আতিয়ার বলেন, ‘ঘটনার প্রথম দিকে সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনেক খোঁজ করেছি। কিন্তু আদম ব্যাপারিদের কোনো সন্ধান পাইনি। আমার ছেলেসহ চৌগাছার সাতজন ছাড়াও ঝিকরগাছা উপজেলার আরো আটজন এই দালালদের খপ্পরে পড়ে পানিপথে মালয়েশিয়ায় রওনা দেয়। সাত বছর পার হতে চললেও কারো সন্ধান পাওয়া যায়নি। অবশেষে রবিবার সন্ধ্যায় দালাল রাজুকে চৌগাছা বাজারে দেখতে পেয়ে কৌশলে আমাদের গ্রামে নিয়ে যাই। অনেক জিজ্ঞাসাবাদেও সে কোনো জবাব দেয়নি। পরে আমরা তাকে পুলিশে দিয়েছি, মামলাও করেছি।’

আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার 'খ্রীষ্টিয়ান মেমোরিয়াল হাসপাতাল'-এ ভুল চিকিৎসা বাড়ছেই

চৌগাছা থানার ওসি রিফাত খান রাজীব আটক দালাল রাজুকে মানব পাচার প্রতিরোধ আইনের মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন।

ইত্তেফাক/নূহু

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত