করোনার সঙ্গী বৈরী আবহাওয়া বোরো ধান কাটা নিয়ে শঙ্কা

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২০, ০৪:০৫

বৃহত্তর সিলেটের চার জেলার মাঠে মাঠে সোনালি ধানের সমারোহ। এবার এই অঞ্চলের প্রধান ফসল বোরোর ফলনও হয়েছে ভালো। কিন্তু প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ কৃষি পরিবারসহ সিলেটের ১ কোটি ১৪ লাখ মানুষের মনে প্রশ্ন, সারা বছরের খোরাকি সোনার ফসল তারা ঘরে তুলতে পারবেন কি! একদিকে বৈরী আবহাওয়া, অন্যদিকে করোনার ভয়ে ধান কাটার শ্রমিকসংকট। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনসহ এলাকাবাসীর ঘুম নেই। সবার এখন এক চিন্তা—কীভাবে দ্রুততম সময়ে ধান গোলায় তোলা যায়।

 

তবে এরই মধ্যে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে ছাত্র-শিক্ষকসহ এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বেশ কিছু হাওরে ধান কাটতে নেমেছেন। তবে কৃষকরা বলেছেন দ্রুত ধান কেটে আনতে বেশি কৃষিযন্ত্রের প্রয়োজন। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার দিনভর সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বিভিন্ন হাওরে কৃষক ও স্বেচ্ছাসেবীদের ধান কাটা তদারক করেন।

কৃষি বিভাগ জানায়, এবার সিলেটের চার জেলায় ৪ লাখ ৭৪ হাজার ১৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়। এ থেকে উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৮ লাখ ৬৪ হাজার ২০৬ টন। রবিবার পর্যন্ত মাত্র ১০ ভাগ বোরো কাটা হয়েছে সিলেট অঞ্চলে। কিন্তু উত্পাদিত ধান ঘরে তোলা না গেলে খাদ্যসংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, সিলেটে প্রায় রাতেই ঝড় ও বজ্রবৃষ্টি হচ্ছে। এরই মধ্যে বজ্রপাত কেড়ে নিয়েছে ৯ কৃষকের প্রাণ। আবহাওয়া বার্তা বলেছে, মঙ্গলবার থেকে আগামী শনিবার পর্যন্ত হাওরে ভারী বৃষ্টিপাত ও নদনদীর পানি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২৬, ২৮ ও ২৯ এপ্রিল দিনে কিছু সময়ের জন্য রোদ থাকতে পারে। সিলেট আবহাওয়া বিভাগের আবহাওয়াবিদ আবু সাঈদ চৌধুরী জানালেন, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে বেশি পরিমাণে বৃষ্টিপাত হবে।

এর আগে গত সোমবার সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ, আগাম বন্যা মোকাবিলায় করণীয় ও ধান কাটা বিষয়ে জরুরি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আগামী দুই সপ্তাহে সুনামগঞ্জে টানা বৃষ্টিপাত, বন্যা ও হাওরাঞ্চলের ধান বিনষ্টের আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়। এই পরিস্থিতিতে উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধান কাটা শ্রমিক আসতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা, ন্যায্য মজুরি ও ত্রাণ প্রদান এবং স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে সাত দিনের মধ্যে উত্পাদিত ফসলের শতভাগ আহরণের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক শ্রী নিবাস ইত্তেফাককে জানান, দ্রুত ধান কাটার জন্য সিলেট বিভাগের জন্য ৯৬টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ১০০টি রিপার বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে ৫৬টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ২০টি রিপার মাঠে কাজ করছে। বাকিগুলোও এর মধ্যে এসে যাবে। উপপরিচালক সফর উদ্দিন জানালেন, স্ব স্ব উপজেলা থেকে স্বাস্থ্য সনদ নিয়ে ইতিমধ্যে ৩ হাজার ২০০ ধান কাটার শ্রমিক এসেছে। আরো ১২ হাজার ২৯৪ জন শ্রমিক আসবে।

এদিকে করোনা, অকালবন্যা, বজ্রপাতের ভয়ে অনেকেই আগাম ধান কাটতে নেমেছেন। তারা কাচা-পাকা ধান কেটে আনছেন। এলাকার সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের উত্সাহ জোগাচ্ছেন। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শামীমা শাহরিয়ারও পাগনার হাওরে ধান কাটা শ্রমিককে উত্সাহিত করতে সাবান, গামছা বিতরণ করেন।

শাল্লা উপজেলা চেয়ারম্যান আলামিন চৌধুরী জানালেন, তার উপজেলায় চার জনের মধ্যে তিন জন কৃষক নিজেই ধান কাটছেন। তার পরও নেত্রকোনা, ময়ময়সিংহের কিছু শ্রমিক, গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিক্ষার্থী ধান কাটতে নেমেছেন। গার্মেন্টস শ্রমিকদের স্কুল-মাদ্রাসায় কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। অনেককে নদীর পাড়ে তাঁবু করে রাখা হয়েছে।

ইত্তফাক/এসি