একাধিক জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা করতোয়া নদী থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক বালু লুটে নিচ্ছেন। নদীপাড়ের বেশ কয়েকটি স্থানে প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের এক লাখ ট্রাক বালু তুলে মজুদ করে রাখা হয়েছে। নদীটির জয়ন্তীপুর ঘাটে নির্মাণাধীন জয়ন্তীপুর ব্রিজের নিচ থেকে থেকে প্রায় ৫০ হাজার ট্রাক বালু নদী পাড়েই মজুদ করা আছে। অপরদিকে বালু ভর্তি ট্রাক চলাচল করায় পাকা ও কাঁচা রাস্তা ভাঙ্গছে, ভাঙ্গছে জমি। বালু তোলায় আসছে বর্ষা মৌসুমে কয়েকটি ঘাট দিয়ে রংপুর-দিনাজপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থা নাজুক হয়েছে বলে গ্রামবাসী জানিয়েছেন।
সরেজমিনে, রংপুর-দিনাজপুর জেলার পীরগঞ্জ, নবাবগঞ্জ, ঘোড়াঘাটের প্রায় ২৫টি গ্রামের ভিতর দিয়ে বয়ে গেছে করতোয়া নদী। নদীটির তলদেশে বিভিন্ন স্থানে বোমা এবং শ্যালোমেশিন বসিয়ে বালু তোলার তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। এতে নদীপাড়ের জমি, রাস্তা-ঘাট ভেঙ্গে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় ভুক্তভোগী এলাকাবাসী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কাছে অসংখ্য লিখিত অভিযোগ করেছেন। সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসন বালু উত্তোলন বন্ধে মাইকিং করলেও বালুখেকোরা তা শুনছেন না। নদীটির টুকুরিয়া ইউনিয়নের জয়ন্তীপুর নামক ঘাটে নির্মাণাধীন জয়ন্তীপুর ব্রিজের নিচ থেকে একাধিক বোমা মেশিন দিয়ে উপজেলার মদনখালী গ্রামের সুলতান মাহমুদ প্রায় ৫০ হাজার ট্রাক বালু উত্তোলন করে ঘাটেই মজুদ করে রেখেছেন।
বালু উত্তোলনকারী সুলতান মাহমুদ জানান, আমার সাথে উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা সালমান সিরাজ রিজুর পার্টনারশিপ রয়েছে। আমার নানা-মামার জমিতে বালুর মজুদ করেছি। নদীপাড়ে কয়েক একর জমির ওপর বালুর বিশাল মজুদের ব্যাপারে ব্রিজটির শ্রমিকরা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ব্রিজের নিচ থেকে আমরা বালু তুলতে নিষেধ করেছি। কিন্তু না শুনে হুমকি দেয়।

জানা যায়, টুকুরিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ দুর্গাপুর ও বিছনা গ্রামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী খননের উত্তোলনকৃত বালু নিয়ে দু’গ্রুপের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের পর উপজেলা প্রশাসন উল্লেখিত স্থানে অনির্দিষ্টকালের জন্য বালু উত্তোলন বন্ধে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করেন। কিন্তু তা না মেনে উপজেলা চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মণ্ডলের ভাই মোস্তাফিজার রহমান মানিক এবং এক ভাইস চেয়ারম্যান জাফরপাড়া গ্রামের জনৈক উজ্জলের নেতৃত্বে বিছনা গ্রামে বালু উত্তোলন করে মজুদ করে রেখেছেন।
অপরদিকে নদীটির বড়আলমপুর ইউনিয়নের বাঁশপুকুরিয়ায় (মধ্যপাড়া) মদনখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্পাদক সেলিম মিয়া ও তার ভাই শামীম মিয়া, উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা সালমান সিরাজ রিজু, যুবলীগ নেতা ইকবাল হোসেন এবং জামরুল মেম্বারসহ উপজেলার এক শীর্ষস্থানীয় জনপ্রতিনিধি প্রায় ৩০ হাজার ট্রাক বালুর মজুদ করে রেখেছেন। বাঁশপুকুরিয়া মন্ডলপাড়ায় উপজেলা যুবলীগ নেতা গোলাম রব্বানী এবং এনছার মেম্বারের ভাই শামিম প্রায় ১০ হাজার ট্রাক বালু মজুদ এবং প্রতিদিনই বিক্রিও করছেন। বড়আলমপুর ইউনিয়নের শালপাড়া ঘাটের উত্তরে নদীটি থেকে ইউনিয়নটির চেয়ারম্যান হাফিজার রহমানের সমর্থক জাহিদ, শামীম ও নুরু মিয়াসহ ১৭/১৮ জন বালু তুলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতি মাহেন্দ্র ছয়শ টাকায় বিক্রি করছেন। রাস্তাঘাট ভাঙ্গন ও জমি রক্ষায় এলাকাবাসী বালু উত্তোলনে বাঁধা দিলে তাদের হুমকি দেওয় বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী গ্রামবাসীরা জানান, জয়ন্তীপুর ঘাট থেকে গোপীনাথপুর মাদ্রাসার মোড় পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার পাকা রাস্তা ভেঙ্গে গেছে। এখন আর পাকা রাস্তা নেই, কাঁচা রাস্তা হয়ে গেছে।
ইউএনও টিএমএ মমিন বলেন, বালু উত্তোলন বন্ধে সম্প্রতি মাইকিং করা হয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করার পরও বালু তোলা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইত্তেফাক/এসি

