ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬
৩০ °সে


রংপুর মেডিক্যাল কলেজে যন্ত্রপাতি কেনায় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ

রংপুর মেডিক্যাল কলেজে যন্ত্রপাতি কেনায় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ
ফাইল ছবি

রংপুর মেডিক্যাল কলেজে উপকরণ ক্রয়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে দরপত্রে উপকরণের মূল্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে বিপুল পরিমাণ সরকারি টাকা আত্মসাত্ করা হয়েছে। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে টেন্ডার কমিটির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইমমিনুসারি অ্যানালাইজার টেন্ডারে ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি টাকা, প্রকৃত বাজার মূল্য মাত্র ২০ লাখ টাকা। একইভাবে ভিডিও অ্যান্ডোসকোপি টেন্ডারে ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে এক কোটি ৩৭ লাখ টাকা অথচ প্রকৃত বাজার মূল্য মাত্র ৩৫ লাখ টাকা। এভাবে সব মালামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ আর্থিক দুর্নীতি করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. কান্তা রায় রিমিকে কন্ডাক্টিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগে জানা গেছে, রংপুর মেডিক্যাল কলেজের ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড আদারস ইন্সট্রুমেন্টসহ প্রায় পাঁচ কোটি টাকার উপকরণ দরপত্রের মাধ্যমে ক্রয় করা হয়। যোগসাজশের মাধ্যমে দরপত্রে প্রতিটি পণ্যের মূল্য ৪-৫ গুণ বাড়িয়ে প্রায় ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়।

টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী তিনটি কোম্পানির মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিকেল কোম্পানিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, দরপত্রে কাটাকাটি করে বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিকেল কোম্পানিকে সর্বনিম্ন দরদাতা বানানো হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই টেন্ডারে জেনারেল কোম্পানির দুইটন ক্ষমতা সম্পন্ন ৩২টি এসি কেনা হয়েছে। প্রতিটির মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। অথচ প্রকৃত বাজার মূল্য ৯০ হাজার টাকা।

এছাড়া বায়োকেমিস্ট্রি অ্যানালাইজার টেন্ডারে ক্রয়মূল্য ৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। প্রকৃত বাজার মূল্য এক লাখ ২০ হাজার টাকা। ডায়েটারমাই মেশিন টেন্ডারে ক্রয়মূল্য ২৫ লাখ টাকা। কিন্ু্ত প্রকৃত বাজার মূল্য ১০ লাখ টাকা। আলট্রাসাউন্ড মেশিন ফর সাইথেরাপি টেন্ডারে ক্রয়মূল্য ১৪ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্ু্ত প্রকৃত বাজার মূল্য ৪ লাখ টাকা।

শর্ট ওয়েভ ফর সাইথেরাপি টেন্ডারে ক্রয় ৬১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। কিন্ু্ত প্রকৃত বাজার মূল্য ১২ লাখ টাকা। বায়োলজিকেল মাইক্রোস্কোপ টেন্ডারে ক্রয়মূল্য এক লাখ ৫৫ হাজার টাকা প্রকৃত বাজার মূল্য ৫৫ হাজার টাকা। ইলেকট্রলেট অ্যানালাইজার টেন্ডারে ক্রয়মূল্য ৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, প্রকৃত বাজার মূল্য এক লাখ ২০ হাজার টাকা। এতে মোট ২ কোটি ৬৬ লাখ ৭ হাজার টাকা আত্মসাত্ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

আল আরাফাহ ইন্টারন্যাশনালসহ মেডিক্যালের যন্ত্রপাতি বিক্রয়কারী বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজে সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতিগুলোর কোম্পানি ও মডেল নম্বর অনুযায়ী প্রকৃত মূল্য জানা গেছে।

সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি অধ্যাপক মো. এ কে এম হাবিবুল্লাহ অভিযোগ আকারে একটি আবেদনপত্র স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিত্সা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন) বরাবর দাখিল করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৬ মে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. কান্তা রায় রিমিকে কন্ডাক্টিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

অধ্যাপক ডা. কান্তা রায় রিমি বলেন, রংপুর মেডিক্যাল কলেজের তত্কালীন দরপত্র কমিটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করার জন্য তাকে কন্ডাক্টিং অফিসার হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দরপত্র কমিটির কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। তারা অল্প সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রদান করবেন।

রংপুর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নূর ইসলাম বলেন, নিয়ম মেনে টেন্ডারের মাধ্যমে উপকরণ কেনা হয়েছে। টেন্ডার কমিটির পক্ষ থেকে কোনো দুর্নীতি করা হয়নি। একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য নানা তত্পরতা চালাচ্ছে।

মূল্য যাচাই কমিটির আহ্বায়ক ডা. হূদয় রঞ্জন রায় বলেন, রংপুর এবং ঢাকার বাজার যাচাই করে তারা যন্ত্রপাতিগুলোর প্রকৃত সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণ করে টেন্ডার কমিটির কাছে জমা দিয়েছেন। কিন্তু তাদের প্রদত্ত ক্রয়মূল্য আর টেন্ডারের ক্রয়মূল্য এক কি না সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে তিনি স্বীকার করেন, দুইটন ক্ষমতা সম্পন্ন এসির মূল্য ২ লাখ ৬৪ হাজার হওয়ার কথা নয়। টেন্ডার কমিটির সদস্য রংপুরের সিভিল সার্জন জাকিরুল ইসলাম লেলিন সাংবাদিকদের জানান, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবের কারণে তিনি সেখানে যাননি। টেন্ডার কমিটির অপর একজন সদস্য জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি সহকারী কমিশনার অতীশ দশী চাকমাকে টেন্ডার সম্পর্কে কোনো কিছু না জানানোর কারণে তিনি কোনো কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেননি।

আরও পড়ুন: ছাত্রদলের ফের তাণ্ডব

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রংপুর মেডিক্যাল কলেজের একজন শিক্ষক জানান, এ টেন্ডারে এমন কিছু যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে যা মেডিক্যাল কলেজে প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ওসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। তাছাড়া, যে ডিপার্টমেন্টের যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে সেই ডিপার্টমেন্টের কোনো শিক্ষককে কমিটিতে রাখা হয়নি।

ইত্তেফাক/নূহু

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ জুলাই, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন