শূন্য আসন নিয়ে এরশাদ পরিবারের দ্বন্দ্ব

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:২০

জাতীয় পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর রংপুর-৩ আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। রবিবার রংপুর (৩) আসনে উপ-নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ৫ অক্টোবর ভোট গ্রহণের দিন রেখে উপ-নির্বাচনের তফসিল দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু আসনে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দ্বিধা-বিভক্ত জাপার সিনিয়র নেতারা। এরশাদ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রার্থিতা চাচ্ছেন অন্তত চারজন। ফলে পারিবারিক দ্বন্দ্বে আসন হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে বলে দলের তৃণমূল নেতারা আশংকা করছেন।

পরিবারের বাইরে থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন- প্রেসিডিয়াম সদস্য শিল্পপতি এসএম ফখর-উজ-জামান ও রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সেক্রেটারি এসএম ইয়াসির।

রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা এসএম ইয়াসিরকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। তারা বলেন, সাদের মনোনয়ন প্রশ্নে রওশন এরশাদ আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে ছেলের জন্য আশীর্বাদ নিয়ে এসেছেন। সাদের প্রশ্নে স্থানীয় কিংবা কেন্দ্রীয় অনেক নেতা গোপনে আপত্তি করলেও রওশনের সামনে গিয়ে বলার মতো শক্তি সাহস অনেকেই রাখেন না। এমনকি জিএম কাদের জোর দিয়ে কিছু করতে গেলে হিতের বিপরীত ঘটতে পারে। তেমনটা হলে রংপুর সদরে প্রার্থী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে ভাঙনের মুখে পড়তে পারে প্রয়াত এরশাদের জাতীয় পার্টি।

রংপুর-৩ আসনের উপ-নির্বাচনে রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী চূড়ান্ত করা হলে তার পক্ষে মাঠে না থাকার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য, রংপুর ও সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। মঙ্গলবার দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি এই ঘোষণা দেন।

আরো পড়ুন: প্রেমিকের ফাঁদে পড়ে গণধর্ষণের শিকার প্রেমিকা, গ্রেপ্তার ৩

তিনি বলেন, ‘রংপুরের এই আসনটি গুরুত্বপূর্ণ আসন। যার ভারত্ব আছে তাকেই এই আসনে প্রার্থী করতে হবে। রংপুরের সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ রয়েছে এমন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে হবে। এটাতো ১৯৯১ বা ৯৬’র প্রেক্ষাপট নয়। এখন যে কাউকে ধরে এনে প্রার্থী করা হলে তা দলের জন্য ক্ষতি ডেকে আনবে।’

মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ‘জননন্দিত, জন সমর্থিত, পরিচ্ছন্ন মানুষকে এরশাদ স্যারের আসনে প্রার্থী ঘোষণা করতে হবে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় তিনজন প্রার্থী রয়েছে, যাদেরকে কমবেশি সবাই চিনে ও জানে। এদের কাউকে প্রার্থী করা হলে কোন আপত্তি থাকবে না।’

কয়েক জন জাপা নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা ও এরশাদের সহধর্মিণী রওশন তার ছেলে সাদ এরশাদকে এই আসন থেকে এমপি হিসেবে দেখতে চান। কিন্তু দলের অনেক সিনিয়র নেতা ও স্থানীয় জাপার নেতাকর্মীরা তা মানতে নারাজ। তারা চান রংপুরের তৃণমূলকে প্রাধান্য দিয়ে প্রার্থী নির্বাচন হোক। এতে দল আরও বেশি শক্তিশালী হবে। সেই সঙ্গে দলে নিজেদের অবস্থান আরও বেগবান হবে বলে মনে করেন স্থানীয় নেতারা।

জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, এরশাদ পরিবারই এখনও রংপুর-৩ আসনে মনোনয়নের বিষয়ে একমত হতে পারেনি। পরিবার থেকে মনোনয়ন দৌড়ে এরশাদপুত্র রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদ ছাড়াও ভাতিজা- সাবেক এমপি আসিফ শাহরিয়ার, ভাতিজা (মামাত ভাইয়ের ছেলে) মেজর (অব) খালেদ আখতার, ভাগনি (মেরিনা রহমানের মেয়ে) মেহেজেবুন্নেছা রহমান টুম্পাও  রংপুরের নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।পরিবারের বাইরে রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসিরকে মনোনয়ন দেয়ার দাবি জানিয়ে ইতোমধ্যে আল্টিমেটাম দিয়েছেন রংপুর (৩) আসনের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এ আসনে মনোনয়ন পেলেই বিজয়ী হবেন এমনটা চিন্তা করেই লবিং-তদবির বাড়িয়ে দিয়েছেন প্রার্থীরা। অনেকেই পার্টির চেয়ারম্যান মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতাদের কাছে ধর্না দিচ্ছেন।

আরো পড়ুন: জামিনে মুক্তি, অ্যাম্বুলেন্সযোগে বাসায় গেলেন মিন্নি

জাতীয় পার্টির বিশ্বস্ত এক সূত্র জানায়, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচন করার আগ্রহ রয়েছে প্রয়াত এরশাদের সহোদর ও পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের। সেক্ষেত্রে এ আসনে অনেক হিসেব-নিকেশ করে মনোনয়ন দিতে চান তিনি।

এ বিষয়ে পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের জন্য একটি বোর্ড গঠন করে দিয়েছি। তারাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।বোর্ড গঠনে পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সিনিয়রিটি মানা হয়নি এমন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন,সিনিয়রদের নিয়েই করতে হবে এমনটি অত্যাবশ্যকীয় নয়। প্রয়োজনে গঠনতন্ত্রও পরিবর্তন হতে পারে।

রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন বলেন, রংপুরের মানুষ এরশাদের পরে তার পরিবারে জিএম কাদের ছাড়া আমরা চিন্তা করতে পারি না।

রংপুরের শূন্য আসনে মনোনয়ন বিষয়ে সাদ এরশাদ বলেন, দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে আমি বাবার আসনে নির্বাচন করব। এখানে বাবার অনেক কাজ অসমাপ্ত রয়েছে। ওইসব কাজ আমি শেষ করতে চাই।

এদিকে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা সাংবাদিকদের বলেছেন, জাতীয় পার্টি মহাজোটের শরীক দল হওয়ায় এ আসনে নির্বাচন জোটগতভাবে হবে এবং পার্লামেন্টরি বোর্ড আগ্রহী প্রার্থীদের আবেদন ও মাঠের অবস্থা বিশ্লেষণ করে মনোনয়ন দেবে।তবে পরিস্থিতি যা হয়েছে তাতে আসনটি নিয়ে চিন্তিত জাতীয় পার্টির তৃণমূল নেতারা। তারা মনে করছেন পারিবারিক দ্বন্দ্বের সমাধান না আসলে অন্যরা সুযোগ নিতে পারে। এমনকি জাপা আসনটি হারার আশংকা রয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ১৪ জুলাই এরশাদের মৃত্যু আসনটি শূন্য ঘোষিত হয়। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ৫ অক্টোবর ভোটগ্রহণ হবে। মনোনয়ন দাখিলের শেষ তারিখ ৯ সেপ্টেম্বর। যাচাই-বাছাই ১১ সেপ্টেম্বর, প্রার্থিতা প্রত্যাহার ১৬ সেপ্টেম্বর। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ৫ অক্টোবর। রংপুর সদর উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নিয়ে গঠিত এ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৪২ হাজার ৭২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২১ হাজার ৩১০ জন এবং ২ লাখ ২০ হাজার ৭৬২ জন নারী ভোটার।

ইত্তেফাক/বিএএফ