যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন

৬ কোটির বেশি আগাম ভোটের রেকর্ড

৬ কোটির বেশি আগাম ভোটের রেকর্ড
৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন । ছবি: ফাইল, সংগৃহীত

একদিকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে হুহু করে বাড়ছে করোনার প্রভাব। অন্যদিকে কংগ্রেসে দ্বিতীয় স্টিমুলাসেরও কোনো সুরাহা হয়নি। বেকার ১০ লাখেরও বেশি মানুষ চরম আর্থিক সংকটে দিন যাপন করছেন। সারা দেশের অর্থনৈতিক মন্দা চরমে। শেয়ার বাজারে চলছে অশনি সংকেত। এমন পরিস্থিতির মধ্যে মাত্র এক সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।

দেশের এই ক্রান্তিকাল হিসাব করলে জো বাইডেনের বিজয় নিশ্চিত হবার কথা। অথচ বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করছেন সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডেমোক্রেটিক প্রার্থী জো বাইডেন। এমনকি কেউ জোর দিয়ে বলতে পারছেন না এবারের নির্বাচনে কে জিতবেন?

২০১৬ সালের নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ইমেজ সংকটে পড়েছে। সে বছর ভোটের মাত্র দুদিন আগে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারির কথিত মেইল কেলেঙ্কারির ঘটনা সামনে আনা হয়েছিল। তখন ট্রাম্প ক্ষমতায় ছিলেন না। তাতেই সব ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল।

৩ মিলিয়ন ভোট বেশি পেয়েও হোয়াইট হাউজের বাসিন্দা হতে পারেননি হিলারি ক্লিনটন। আর এবার ট্রাম্প ক্ষমতায়। এবার নির্বাচনের আগে কোন অঘটন সামনে এসে দাঁড়ায় সেই আশঙ্কা তাড়া করছে ডেমোক্রেটিক শিবিরকে।

ট্রাম্প হারলে ক্ষমতার সুষ্ঠু হাতবদল হবে কী না, হাউজ এবং সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে এসব নানান প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। তবে যত আশঙ্কাই থাকুক না কেন, এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ভোট প্রদানের ঘটনা ঘটতে চলেছে। ইতিমধ্যে ৬ কোটিরও বেশি আমেরিকান আগাম ভোট দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভোটের ইতিহাসে এটি নজিরবিহীন ঘটনা।

এত মানুষ কেন আগাম ভোট দিচ্ছেন? ট্রাম্পকে হারাতে নাকি তাকে পুননির্বাচিত করতে? অর্থনৈতিক এই দুরবস্থা বিবেচনা করলে ভোট বাইডেনের পক্ষে পড়ার কথা। জরিপ বাইডেনের পক্ষকে ভারী করে দেখালেও কেউই সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না এবারের নির্বাচনে কে জিতবে।

ট্রাম্প হেরে গেলে ক্ষমতার পালাবদল কী সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে? সোমবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হিসাবে এমি কোনি ব্যারেট চূড়ান্ত হবার পর সুপ্রিয় কোর্টে ডেমোক্রেটদের অবস্থান একেবারে নড়বড়ে হয়ে গেছে। ৬-৩ অনুপাতে এগিয়ে রয়েছেন রিপাবলিকানরা। ফলে ট্রাম্প নির্বাচনে হেরে আদালতে গেলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে তা বলা মুশকিল।

অনেকে এবারের নির্বাচনের ফলকে ২০০০ সালের নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করছেন। ওই নির্বাচনে আদালতের রায়ে মাত্র এক ভোটে জিতেছিলেন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। প্রতিদ্বন্দ্বী আল গোর হার মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প কী তার দ্বিতীয় মেয়াদের পরাজয় মেনে নেবেন?

এ ব্যাপারে অবশ্য তিনি যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলছেন। এমনকি নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে তড়িঘড়ি করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ দিলেন, যেখানে ডেমোক্রেট তীব্র আপত্তি ছিল।

ডেমোক্রেটরা বলছেন, যেখানে ৬ কোটিরও বেশি মানুষ তাদের রায় দিয়েছেন, নির্বাচনের ফল পরিবর্তনের জন্য এই বিপুল ভোটই যথেষ্ট। ট্রাম্প হেরে গেলে বিচারক নিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ হবে। কিন্তু ট্রাম্প কোনো এক অজানা আশঙ্কা থেকে বিচারক নিয়োগ চূড়ান্ত করলেন তা কারো কাছেই বোধগম্য নয়।

৩ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজের ৪৩৫টি এবং উচ্চকক্ষ সিনেটের ৩৩টি আসনে ভোট হবে। ডেমোক্রেটরা আশা করছেন তারা হাউজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার পাশাপাশি সিনেটেরও নিয়ন্ত্রণ নেবেন। ফলে ট্রাম্প ইলেকটোরাল ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও তিনি পুতুল প্রেসিডেন্ট হয়ে যাবেন।

অন্যদিকে বাইডেন প্রেসিডেন্ট হলেও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ না পেলে ডেমোক্রেটদের অবস্থা তেমন একটা বদলাবে না। এ কারণে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হাউজ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকবে এটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যমান সমস্যার মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে না বেড়েছে সেই প্রশ্নের উত্তর নেই কারো কাছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি আমেরিকানদের কাছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বেড়েছে অনেকাংশে। আগে কোনো রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে বাংলাদেশিদের জোরালো সমর্থন দিতে দেখা যায়নি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশিরা ট্রাম্পের পক্ষে সভা-সমাবেশও করছেন।

তাদের ভাষ্যমতে, ট্রাম্প সত্যিকারের জনদরদী প্রেসিডেন্ট। তিনি নাগরিকদের দুর্দিনে আর্থিক সুবিধা দিচ্ছেন। আর বাইডেন আমেরিকায় আনডকুমেন্টেডদের বৈধতা দেবেন বলছেন। বাংলাদেশি রিপাবলিকান সমর্থক শাহজাহান আকন্দ বলেন, আনডকুমেন্টেডরা এদেশে অবৈধভাবে এসেছেন। তারা আয় করলেও কখনো আয়কর দেন না। যারা এ দেশে কর দেন তাদের অর্থ বিনাশ করেন।

অন্যদিকে, ডেমোক্রেট সমর্থকরা পাল্টা জবাবে বলছেন, বাংলাদেশিরা সবসময় ডেমোক্রেট সমর্থক। কংগ্রেসে ডেমোক্রেটরা বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। অথচ এবার এর ব্যতিক্রম দেখছি। বাংলাদেশি ডেমোক্রেট সমর্থক জুয়েল আমিন বলেন, কিছু বাংলাদেশি মনে করেন যে ট্রাম্প তাদের বেকার ভাতা ও স্টিমুলাস চেক দিয়েছেন। শুধুমাত্র এ কারণে তারা ট্রাম্পকে সমর্থন দিচ্ছেন। অথচ বেকার ভাতা ও স্টিমুলাস ট্রাম্পের একক অবদান নয়। বরং ট্রাম্প অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে আসার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন।

রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটদের বাইরে সাধারণ আমেরিকানরা বলছেন, আমেরিকানরা রাজনীতিবিদদের নোংরা রাজনীতির শিকার। একসময় যে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা বিশ্বে উদাহরণ ছিল, এখন বিশ্ববাসীর জন্য তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ব্যবস্থাই এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

বাংলাদেশি আমেরিকান আশরাফ উদ্দিন পিয়াস বলেন, আগে নির্বাচনে কে জয়ী হবে তা বোঝা যেত। কিন্তু ২০১৬ সালের নির্বাচন সবকিছু ভুল প্রমাণ করেছে। করোনা ভাইরাসে ২ লাখেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। অথচ সাধারণ মানুষ এ ব্যাপারে নিশ্চুপ। ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকানরা একে অপরকে দোষারোপ করছে। এই দোষারোপের রাজনীতি কখনো যুক্তরাষ্ট্রে ছিল না।

এ কারণে ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে আমেরিকানরা, বিশেষ করে দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যের ভোটাররা কার কথা বিশ্বাস করে ভোট দেবেন, আর শেষ হাসি কে হাসবেন তা এখন সত্যিই বলা মুশকিল। এখন অপেক্ষা করতে হবে ৩ নভেম্বরের নির্বাচন ও পরবর্তী কয়েকদিন ফল গণনা পর্যন্ত। গত নির্বাচনে রাতারাতি ফল জানা গিয়েছিল। কিন্তু এবার রেকর্ডসংখ্যক আগাম ভোট পড়ায় ফল প্রকাশে কিছুটা দেরী হবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়।

ইত্তেফাক/জেডএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত