বিপন্ন মানবতা, জলদস্যুতা ও ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক সরবরাহব্যবস্থা

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৪, ০৫:০৫

বিশ্বব্যাপী হঠাৎ করে জলদস্যুতা বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক নিরাপত্তার অভাব প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ার জলদস্যুদের দ্বারা একটি বাংলাদেশি জাহাজ আক্রমণের শিকার হওয়ায় আমাদের দেশে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা। এছাড়া লোহিতসাগরে হুতিদের আক্রমণে বৈশ্বিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা আমাদের সবারই জানা। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যৌথভাবে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর পরও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি।

জলদস্যুদের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পড়েছে চাপের মুখে। এজন্য পণ্যের বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে আমদানি-রপ্তানিকারকদের। বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ এবং জলদস্যুদের কারণে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। জলদস্যুদের খপ্পরে পড়ে বাংলাদেশি নাবিকেরা অমানবিক ও অমর্যাদাকর পরিবেশে রয়েছেন। তারা আছেন জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে। তাদের পরিবার-পরিজনও আছে নানামুখী সমস্যায় ও আতঙ্কের মধ্যে।

পৃথিবীতে জলদস্যুতা নতুন নয়, যুগ যুগ ধরে এই প্রবণতা চলে আসছে। নৌপথের গুরুত্ব যেমন এই আধুনিককালেও ফুরিয়ে যায়নি, তেমনি জলদস্যুতাও নিঃশেষিত হয়নি। জাহাজে, ডাকাতি, অপহরণ, সহিংতা, ধর্ষণসহ নানাবিধ ঘটনাপ্রবাহ বিশ্ব মানবতার জন্য দুঃখজনক। সোমালিয়ায় জলদস্যুতা বাড়ার নানা কারণ রয়েছে। নব্বইয়ের দশক থেকে দেশটিতে স্বৈরতন্ত্র যত বেড়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জলদস্যুতাও। সোমালিয়ার ভূমির অবক্ষয়, তাদের কৃষি খাতের নাজুক অবস্থা, দেশ জুড়ে মেরুকরণ, খরা এবং পশুসম্পদ ও মত্স্য সম্পদে ঘাটতি দেশটির জনগণকে ভোগাচ্ছে। দেশটি অনুর্বর হয়ে পড়ায় সোমালিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনমান নিম্নমুখী। সোমালিয়ার দুর্নীতিও একটি বড় সমস্যা। ফলে জলদস্যুতা সেই দেশের অনেক মানুষের নেশা ও পেশায় পরিণত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্ববাসী।

গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে ইয়েমেনের হুতিরা লোহিতসাগর ও এডেন উপসাগরে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক জাহাজসমূহের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন আক্রমণ চালিয়ে আসছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সুরক্ষার অভাব দেখা দিয়েছে এবং সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। পণ্যবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে নাবিকসহ যারা দায়িত্বশীল রয়েছেন, তাদের জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অবাধ চলাচল ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে এবং এটা নৌচলাচল অধিকার ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করছে। হুতিরা যে ধরনের ঘৃণ্য ও অন্যায় আচরণ করছে, তা অবশ্যই বিশ্ব আদালতে বিচার্য বিষয়। দুর্নীতি ইয়েমেনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী ১৮০টি দেশের মধ্যে ইয়েমেন দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসাবে ১৭৬তম। ২০১৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত দেশটি মাথাপিছু প্রকৃত গ্রোস ডমেস্টিক প্রোডাক্ট বা মোট দেশজ উত্পাদনের ক্ষেত্রে দুঃখজনক হলেও সত্য, ৫২ শতাংশ সংকোচনের সম্মুখীন হয়েছে এবং ইয়েমেনবাসীর ২১.৬ মিলিয়ন ব্যক্তি মানবিক সহায়তার মুখোমুখি। জলদস্যুতার নামে নৌপথ, সমুদ্রপথকে জরাগ্রস্ত ও জিম্মি করা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। জলদস্যুতা, সশস্ত্র ডাকাতি, সমুদ্রে সংঘর্ষ, তথাকথিত বিদ্রোহ ইত্যাদির ব্যাপারে জাতিসংঘকে আরো সচেতন হতে হবে। হুতি ও সোমালিয়ান জলদস্যুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিশ্বনেতাদের উদ্যোগী হতে হবে। সেখানে প্রয়োজনে পাঠাতে হবে শান্তিবাহিনী।

সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে সমুদ্রে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায়। কিন্তু সশস্ত্র জলদস্যুরা শোনে না ধর্মের কাহিনি। সোমালিয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায়, মানবাধিকার-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের ক্রমাগত ব্যত্যয় ঘটছে সেখানে। বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ নানাবিধ বেআইনি কর্মকাণ্ড, নির্বিচারে পশুর মতো মানব হত্যা, সে দেশের সরকার কর্তৃক নির্যাতন এবং অমানবিক নিষ্ঠুরতা, অবমাননাকর আচরণ; শাস্তির কঠোর বিধান, বিনা বিচারে কারাগারে পাঠানো এবং রাজনৈতিকভাবে বন্দিত্বের ঘটনা বাড়ছে। ফলে সোমালিয়ায় অরাজকতার মধ্যে জলদস্যুতাও বেড়ে গেছে। জলদস্যুতা দেশটির আয়ের অন্যতম মূল উেস পরিণত হয়েছে। এমনকি সে দেশের সরকারও মোটা অঙ্ক পায় বলে কথিত আছে। তাই জাতিসংঘের উচিত সোমালিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। আন্তর্জাতিকভাবে জলদস্যুতা বন্ধে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি। এ ব্যাপারে বিশ্বনেতাদের উদ্যোগী হতে হবে। এজন্য আইএসপিএস কোডের প্রয়োজন অনুসারে একটি সফল জাহাজ নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করা এবং সম্মিলিতভাবে তার বাস্তবায়ন করা উচিত। এজন্য গ্রহণ করতে হবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগও।

জলদস্যুতার ক্ষেত্রে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নেভিগেশন ও উত্তরণ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে পরামর্শ প্রদান করতে হবে। জাহাজের ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনের উদ্যোগ গ্রহণ, জিম্মিদের আহার ও চিকিত্সার ব্যবস্থাকরণ, জিম্মিদের অবস্থান চিহ্নিতকরণ, ক্ষেপণাস্ত্র, মাইন ও ড্রোন হামলার জন্য প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়াসহ বোর্ডে আক্রমণের ক্ষেত্র অনুসরণের জন্য জরুরি নির্দেশিকা প্রয়োজন। একটি জাহাজ নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য রূপরেখা প্রয়োজন। মুক্তিপণ ছাড়া যাতে মুক্তি পায়, সেজন্য উদ্যোগ গ্রহণ এবং যোগাযোগ ও মিডিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক। হুতি বিদ্রোহের কারণে প্রকৃতপক্ষে পানিপথের অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে, সমুদ্রবন্দর অবোরধ এবং অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত লোকজন বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতা সেই পরিবেশকে করে তুলেছে আরো ভয়ংকর। ইয়েমেনে অভ্যন্তরীণ পরিবেশের কারণে সুপেয় পানির অভাব, দুর্ভিক্ষ, নানাবিধ রোগব্যাধি এবং অভিবাসনের মতো সমস্যাগুলো আরো নিম্নমুখী হতে থাকবে।

গত ১২ মার্চ সোমালিয়ার দস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ। এই জাহাজ মোজাম্বিক থেকে দুবাইতে কয়লা নিয়ে যাওয়ার পথে তাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। জাহাজটি সর্বশেষ খবর অনুযায়ী সোমালিয়ার উপকূল থেকে ৫০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ছিল বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। জাহাজটি এক শ সশস্ত্র জলদস্যু কর্তৃক আক্রান্ত হয়। জাহাজটি দখল করার পর সোমালিয়ার উপকূলের দিকে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই যে আক্রমণ, দখল বাণিজ্য, এটি একটি বর্বরতম ঘটনা। ইতঃপূর্বে ২০১০ সালেও এমভি জাহান মণি নামের আরেকটি বাংলাদেশি জাহাজ সোমালিয়ান জলদুস্যরা দখল করেছিল এবং দীর্ঘ তিন মাস পর ২৬ জন নাবিককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। বস্তুত, এ ধরনের ঘৃণ্য তত্পরতা অমানবিক। জলদস্যুরা মানবতার শত্রু। গত কয়েক দশক ধরে ভারত মহাসাগরে সোমালি জলদস্যুরা নিষ্ঠুর ও নির্মম কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তিপণ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত। প্রকৃতপক্ষে এখানে আধুনিক জলদস্যুতা ১৯৯৫ সালে শুরু হয়। জলদস্যুদের জন্য বিদেশি জাহাজ দখল নিয়ে মুক্তিপণ আদায় করা একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ২০০৫ সালে ‘এমভি ফেসটি’ নামে একটি পেট্রোলিয়াম ট্যাংকার আটক করে ৩ লাখ ১৫ হাজার মার্কিন ডলার মুক্তিপণ আদায় করেছিল তারা। ‘এমভি পানজিয়া’ নামের একটি জাহাজ সোমালিয়ার জলদস্যু কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছিল, যা সোমালিয়ার উপকূল থেকে ৯০ নটিক্যাল মাইল দূরে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। ২০০৮ সালে ভারত মহাসাগরে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর আক্রমণ করে তারা। জাহাজের এক নাবিককে জিম্মি করে রেখেছিল ৪৭ দিন পর্যন্ত। তারপর ৬ লাখ ৭৮ হাজার মার্কিন ডলার মুক্তিপণ পেয়ে তারা তাকে ছেড়ে দেয়। ২০১৭ সালে ইরানের মাছ ধরার জাহাজাও তারা আক্রমণ করে। তাদের হাতে জিম্মি অবস্থায় ৬২ জনের বেশি মারা গেছে। এছাড়া তারা ২৫ জনকে হত্যা করেছে বলে জানা যায়।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মিলিত উদ্যোগে এই জলদস্যুতা মোকাবিলা করতে হবে। এ ব্যাপারে জাতিসংঘকে শক্তিশালী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করতে হবে। সোমালিয়ার জলদস্যুদের হাতে আটক বাংলাদেশি নাবিকদের উদ্ধারে সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে। এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু পদক্ষেপ জরুরি।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, আইটি বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক উপাচার্য, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন