অবশেষে মুক্তি পেল পুঠিয়া শ্রমিক নেতা হত্যায় গ্রেফতার ‘নিরপরাধ’ কিশোর

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৭:৩০

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলায় গ্রেফতার ‘নিরপরাধ’ কিশোর জামিনে মুক্তি পেয়েছে। গত ১৬ জুন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল। প্রায় ছয়মাস কারাভোগ করার পর রবিবার রাতে সে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পায়। এদিকে সোমবার সকালে নিজ গ্রাম পুঠিয়ার রামজীবনপুর গ্রামের মানুষ তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে। এ সময় সে আবেগে কাঁদতে শুরু করে।

পরে ছেলেটি নিহত নুরুল ইসলামের কবর জিয়ারত করে। নুরুল ইসলামের মেয়ে নিগার সুলতানা ছেলেটিকে নিজের বাবার কবর চিনিয়ে দেয়।

জানা যায়, গত ১১ জুন পুঠিয়ার কাঁঠালবাড়িয়া এলাকার একটি ইটভাটা থেকে শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলামের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওইদিনই নিহতের মেয়ে নিগার সুলতানা বাদী হয়ে পুঠিয়া থানায় আটজনকে আসামি করে এজাহার দেন। ওই এজাহারে বলা হয়, মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বীরা এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। কিন্তু ওই এজাহারটি গ্রহন করেননি পুঠিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিল উদ্দিন আহমেদ।

নিগারের অভিযোগ, পরবর্তীতে তাকে থানায় ডেকে নিয়ে জব্দ তালিকা, সুরতহাল প্রতিবেদনসহ কিছু সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেয় পুলিশ। পরে ওই সাদা কাগজেই এজাহার টাইপ করে থানায় মামলা রেকর্ড করা হয়। পরে ১৬ জুন ১৫ বছরের ওই কিশোরকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এরপর জেলা পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নিহত শ্রমিক নেতা নুরুল ওই কিশোরের সঙ্গে যৌনাচারে লিপ্ত হতেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়েই সে ইটের আঘাতে নুরুল ইসলামকে হত্যা করেছে। এসব বিষয় স্বীকার করে সে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছে।

এদিকে যৌনাচারের জন্য কিশোরের হাতে খুন হওয়ার বিষয়টি শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছিল নিহতের পরিবার। তারা বলছে, মূল আসামিদের বাঁচাতে ও ঘটনা ভিন্নখাতে নিতেই ওই কিশোরকে ‘বলি’ দেওয়া হয়েছে। পরে বিষয়টি হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। হাইকোর্ট বিষয়টির বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তের দায়িত্ব পান রাজশাহীর চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মেহেদী হাসান তালুকদার। সরেজমিন তদন্ত করে তিনি হাইকোর্টে প্রতিবেদন দেন।

এর ভিত্তিতে গত ১ ডিসেম্বর বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ রায় দেন। এতে শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার বাদীর মূল এজাহার গ্রহণ না করে মনগড়া এজাহার সৃজনের সঙ্গে জড়িত থাকায় অভিযুক্ত হন পুঠিয়া থানার তৎকালীন ওসি সাকিল উদ্দিন আহমেদ। 

থানার দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তার এ ধরণের কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে গুরুতর অপরাধ, যা দণ্ডবিধির ১৬৬ ও ১৬৭ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেও রায় দেন হাইকোর্ট। আদালত বলেন, এ দুটি ধারার অপরাধ দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ আইনের তফসিলভুক্ত। এ কারণে ওসি সাকিলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধান প্রতিবেদন ও আনুষাঙ্গিক নথি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানোর জন্য রাজশাহীর চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

একইসঙ্গে গত ১১ জুন নিগার সুলতানার দেওয়া মূল এজাহারটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। সেদিন হাইকোর্ট বলেছেন, শ্রমিক নেতা নুরুল হত্যা মামলায় আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় এক শিশু। রাজশাহীর পুলিশ প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করে। কিন্তু শিশু আইনের ৮১ ধারা অনুযায়ী শিশুর স্বার্থের পরিপন্থী কোন ছবি বা তথ্য গণমাধ্যমে বা ইন্টারনেটে প্রচার করা যাবে না। যা দ্বারা শিশুটিকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শনাক্ত করা যায়। এ বিষয়ে রাজশাহীর পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার ব্যাখ্যা স্পষ্ট নয়।

আদালত বলেন, এ ঘটনায় একজন শিশুর জবানবন্দি প্রেস বিজ্ঞপ্তি আকারে গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করে রাজশাহীর পুলিশ-প্রশাসন দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে এবং আইন ভঙ্গ করেছে। তাই শিশু আইন সম্পর্কে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদের সচেতনতামূলক ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ প্রয়োজন। এ বিষয়ে আইজিপিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

আরও পড়ুন: বেরোবিতে 'বঙ্গবন্ধু' ও 'রোকেয়া'র প্রতিকৃতি নির্মাণের ঘোষণা

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ১ ডিসেম্বরই হাইকোর্টে ওই কিশোরের জামিন হয়। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে জামিনের আদেশের কপি এসে পৌঁছায় রবিবার বিকালে। সেদিন রাতেই তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। পরিবারটি প্রত্যাশা করছে, নিরপরাধ ওই কিশোর যেন মামলার অভিযোগ থেকে দ্রুত অব্যাহতি পায়। আর যেন আইনের আওতায় আসে মূল অপরাধীরা।

ইত্তেফাক/নূহু