মন যদি মুক্ত না থাকে, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ যদি হয় বিরুদ্ধ, তাহলে কোনো শুভকর্ম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন সম্ভব নয়। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন জঞ্জালমুক্ত অনুকূল পরিবেশ। দিব্যজ্যোতির আবাহনের জন্যও প্রয়োজন মনের স্বাধীনতা। তবেই পাওয়া যাবে পরম আলোর সাক্ষাত, অন্তরের বেদিতে অধিষ্ঠান করবেন পরম আনন্দময়ী। এ ভাবনা থেকেই শ্রীঅরবিন্দ জড়িয়েছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল প্রাচীন ভারতীয় ঋষিসভ্যতার শক্তিকে তুলে ধরা এবং তার বিস্তার ঘটানো। জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতির অন্যতম পুরোধা, স্বদেশী আন্দোলনের অগ্রসৈনিক এই শ্রীঅরবিন্দ একদিন হয়ে উঠলেন দিব্য আলোয় স্নাত আধ্যাত্মিক যোগীপুরুষ।
১৮৭২ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতার এক কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শ্রী অরবিন্দ। মা স্বর্ণলতা দেবী কলকাতার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ঋষি রাজনারায়ণ বসুর জ্যেষ্ঠা কন্যা। বাবা কৃষ্ণধন ঘোষ ছিলেন বিলাতফেরত ডাক্তার—সিভিল সার্জন। শৈশবের প্রথম পাঁচ বছর অরবিন্দ কাটান বাবার কর্মস্থল খুলনায়। পাশ্চাত্য ভাবধারায় গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ১৮৭৭ সালে শ্রী অরবিন্দকে প্রথমে দার্জিলিংয়ে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করে দেন বাবা কৃষ্ণধন ঘোষ। এরপর ১৮৭৯ সালে ছেলেকে পাঠিয়ে দেন লন্ডনে। জনৈক পাদ্রি ডুয়েট ও তাঁর স্ত্রীর কাছে, ঘরোয়া পরিবেশেই পড়াশোনা শুরু করেন। ১৮৮৪ সালে ভর্তি হন লন্ডনের সেন্ট পলস স্কুলে। কৃষ্ণধন ঘোষ আদব কায়দায় সাহেবি কেতার হলেও মনেপ্রাণে ছিলেন খাঁটি ভারতীয়। ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসকদের অত্যাচার-নিপীড়নের যেসব খবর তত্কালীন ‘বেঙ্গলী’ সংবাদপত্রে প্রকাশ পেত, সেগুলো তিনি নিয়মিত ছেলেকে পাঠাতেন। দেশবাসীর দুর্দশা শ্রী অরবিন্দের নবীন মনে গভীর রেখাপাত করে। তখন থেকেই তাঁর মনে ভারতবর্ষকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করার বাসনা জেগে ওঠে। কেমব্রিজ থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কিংস কলেজে ভর্তি হন তিনি। এ কলেজে পড়াকালীন দেশপ্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হন। এসময় ‘ইন্ডিয়ান মজলিস’ নামের একটি ভারতীয় ছাত্রসংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত হন তিনি। এসব কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বহু কবিতা লিখেছেন শ্রীঅরবিন্দ। ১৮৯০ সালে তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
১৮৯৩ সাল। বরোদার মহারাজা সয়াজি রাও গয়কোয়াড় তখন বিলেতে। শ্রী অরবিন্দের মেধা ও প্রতিভার পরিচয় পেয়ে মহারাজা তাঁকে দেশে ফিরতে বলেন। সয়াজি রাওয়ের পরামর্শে দীর্ঘ প্রবাসের পর শ্রীঅরবিন্দ দেশে ফিরে যোগ দেন বরোদা রাজ্যের দাপ্তরিক কাজে। তিনি এখানে এসে ভারতীয় বিভিন্ন ভাষা আয়ত্ত করেন এবং অবশেষে বাংলাভাষাও শিখে নেন। বরোদা রাজ্যের বিভিন্ন রাজদপ্তরে কাজ করার পর ১৯০০ সালে বরোদা কলেজে শ্রীঅরবিন্দ ফরাসি ও পরে ইংরেজি ভাষার অধ্যাপনা শুরু করেন। গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে থাকেন বেদ, উপনিষদ, ষড়দর্শন, গীতা, পুরাণসহ বিভিন্ন গ্রন্থ। পাঠের মাধ্যমে তিনি প্রাচীন ভারতের ধর্ম ও দর্শনশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন এবং যোগানুশীলনের মাধ্যমে দিব্যজীবন লাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে তাঁর মন।
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন কর্তৃক বাংলা ভাগ হয়ে যায় এবং এই ঘটনার পর তিনি জাতীয় আন্দোলন শুরু করেন। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলার মানুষ। আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয় বন্দেমাতরম্। রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ গানটি। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হলে শ্রীঅরবিন্দ বরোদার চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে বাংলায় চলে আসেন। সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন জাতীয় কংগ্রেসের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। পূর্ববঙ্গের জেলায় জেলায় ঘুরে সভা-সমিতিতে ভাষণ দিতে থাকেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, ‘পূর্ণ স্বাধীনতাই লক্ষ্য।’ শ্রী অরবিন্দই প্রথম নেতা, যিনি প্রকাশ্যে এ কথা ঘোষণা করেন।
‘যুগান্তর’ পত্রিকায় কোনো একটি রাজদ্রোহমূলক লেখা প্রকাশিত হয়েছিল, ‘বন্দেমাতরম্’ পত্রিকায় সেটির অনুবাদ ছাপা হয়। রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত হন শ্রীঅরবিন্দ। সমগ্র জাতি ক্ষোভে ফেটে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ লেখেন—
‘অরবিন্দ, রবীন্দ্রের লহ নমস্কার—
হে বন্ধু, হে দেশবন্ধু, স্বদেশ-আত্মার
১৯০৬ সালে কলকাতা কংগ্রেসে শ্রীঅরবিন্দের চেষ্টায় ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’ গৃহীত হয় অভীষ্ট হিসেবে। ‘বন্দেমাতারম্’ মামলার পর তিনি হয়ে ওঠেন জাতীয়তাবাদের অবিসংবাদিত নেতা। অরবিন্দ মনে করতেন, নিস্পৃহ প্রতিরোধ যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে সম্মুখসমরে। যদি তা-ই হয়, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা যাবে না। যুদ্ধের মুখোমুখি হতে যারা দ্বিধাগ্রস্ত থাকবে, তাদের জন্য বরাদ্দ থাকা উচিত কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধবিমুখ অর্জুনের প্রতি কৃষ্ণের সস্নেহ তিরস্কার।
১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল ম্যাজিস্ট্রেট কিংস ফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী মটরগাড়িতে বোমা নিক্ষেপ করেন। এতে আরোহী দুই ইউরোপীয় মহিলা নিহত হন। এ অপরাধে ৩ মে শ্রী অরবিন্দসহ আরো কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। সবার বিরুদ্ধে মামলা হয়। রায়ে কারো কারো শাস্তি হয়। অরবিন্দ শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হন এবং মুক্তি পান।
একটি লেখায় শ্রীঅরবিন্দ জানিয়েছিলেন, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন উপনিষদ, আর গীতা দ্বারা প্রভাবিত।
তাঁর ইংরেজি রচনাসম্ভার ৩৮ খণ্ডে প্রকাশিত। বাংলায় প্রকাশিত তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা হলো :‘ভারতের নবজন্ম’ (১৯১৫), ‘পন্ডিচেরীর পত্র’ (১৯২১), ‘কারা কাহিনি’ (১৯২১), ‘ধর্ম ও জাতীয়তা’ (১৯৩১), ‘যোগ-সাধনার ভিত্তি’ (১৯৪২), ‘ভারতে রাষ্ট্রনীতিক প্রতিভা’ ইত্যাদি। তাঁর বেশকিছু গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর এই মহাযোগী মর্তদেহ ত্যাগ করেন।
তথ্যসূত্র :স্বদেশ ও শ্রীঅরবিন্দ, সংকলন ও সম্পাদনা : রঞ্জন মিত্র; অমিয় মুখার্জীর বক্তব্য
