বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনে আন্তর্জাতিক সাড়া

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২০, ২২:০০

পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জনসাধারণের মধ্যে বাঙালিদের স্বাধীনতার পক্ষে যথেষ্ট সমর্থন থাকলেও তাদের রাষ্ট্রীয় নীতিতে তা প্রতিফলিত হয়নি। এ ব্যাপারে পাকিস্তানি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ছিল ব্যাপক ও শক্তিশালী। দেশ-বিদেশে আমাদের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলোও হয়ে উঠেছিল সক্রিয়। অথচ এক আশ্চর্য সাবলীলতায় সহস্র প্রতিকূলতার মধ্যে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি শেষ হতে না হতেই প্রায় ৫০টি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের স্বীকৃতির পথ সুগম করে দেয়। ১৯৭১ সালের ৬ ও ৭ ডিসেম্বর যথাক্রমে ভারত এবং ভুটানের পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর ঢাকা প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত আমাদের স্বীকৃতির খাতা ছিল শূন্য; কিন্তু দিল্লি বিমানবন্দরে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য উপস্থিত ছিলেন অন্তত ২০টি দেশের রাষ্ট্রদূত অথবা কূটনৈতিক প্রতিনিধি। তদানীন্তন সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রদূত ছাড়াও তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি, পশ্চিম জার্মানি (সে সময়কার), নরওয়ে ও ডেনমার্কের প্রতিনিধিরা। বঙ্গবন্ধুর ঢাকা প্রত্যাবর্তনের সঙ্গেই শুরু হলো বিশ্ব স্বীকৃতির পালা। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে, ততদিনে বাংলাদেশ ১২০টি দেশের স্বীকৃতি লাভ করেছে। এসবই সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিলেন বলেই।

বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় আমরা চীন ও সৌদি আরব ছাড়া বিশ্বের সব দেশেরই স্বীকৃতি লাভ করেছিলাম। ১৯৭১ সালে ৯ মাস কারাবাসকালে বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন তার বিচারের প্রহসন-মৃত্যুদণ্ড। পাকিস্তানের মিয়াওয়ালি জেলে অবস্থানকালে তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, সেখানে তার কবর খোঁড়ার আয়োজন। বহু বছর কারাবাসের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শেখ মুজিব জেলে বসেই স্থাপন করেছিলেন জেলের ডিআইজি শেখ আবদুর রশিদের সঙ্গে হূদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক।

এলো ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। আমাদের বিজয় দিবস। বাংলাদেশে পরাজিত জেনারেল নিয়াজির বাড়িও মিয়াওয়ালিতে। সেখানেই কারাগারে রয়েছেন বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তানের পরাজয়ের কোনো হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া যদি মিয়াওয়ালি জেলে ঘটে, সেই ভয়ে শেখ রশিদ বঙ্গবন্ধুকে স্থানান্তরিত করলেন তার বাসস্থানে। অন্তরীণ অবস্থাতেই। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভের মুহূর্ত থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গৌরবজনক আসন প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন সচেষ্ট। ৮ জানুয়ারি ১৯৭২, রাওয়ালপিন্ডি থেকে লন্ডনে পদার্পণের পর থেকে ১০ জানুয়ারি ঢাকায় তার জনসভায় ভাষণদান পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৫০ ঘণ্টার কিছু বেশি; কিন্তু সে সময়টুকুর মধ্যে বন্দিত্ব থেকে মুক্তির আস্বাদ লাভের সেই প্রথম প্রহরগুলোতে আন্তর্জাতিক সমাজে বাংলাদেশকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ডের বিবরণ আগ্রহ-উদ্দীপক। কারণ, সেই আবেগপূর্ণ সময়টির মধ্যেও এক আশ্চর্য সাবলীলতায় তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে সক্ষম হয়েছিলেন।

১০ জানুয়ারি ১৯৭২, বঙ্গবন্ধুর দিল্লি পৌঁছানোর সেই স্মরণীয় প্রভাতে মুজিব আর ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে হয়েছিল পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। তার একটি বিষয় সম্পর্কে তিনি সেই অপরাহ্নে দেশবাসীকে অবহিত করেছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন সদ্য স্বাধীন তার দেশবাসী সে বিষয়টি সম্পর্কে হয়তো বা রয়েছেন উদ্বিগ্ন। তিনি ঢাকার রেসকোর্সের সেই সভায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘তাঁর (ইন্দিরা গান্ধী) সঙ্গে আমি দিল্লিতে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করেছি। আমি যখনই চাইব ভারত বাংলাদেশ থেকে তার সৈন্যবাহিনী ফিরিয়ে নেবে।’ তার দুই মাসের মধ্যেই ১২ মার্চ ১৯৭২, ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ থেকে শেষ ভারতীয় সৈন্যদের বিদায় ছিল সমতার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে লন্ডনে পৌঁছেই সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বিবৃতিতে বিশ্ববাসীর কাছে বঙ্গবন্ধু জানান দুইটি আবেদন— ‘বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করুন’ আর ‘আমার ক্ষুধার্ত কোটি প্রাণের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসুন’। ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অ্যাডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে তার সেদিন হয়েছিল ঘণ্টাব্যাপী সাক্ষাত্। তিনি সেই সাক্ষাতে বাংলাদেশকে যথাসম্ভব শিগিগর স্বীকৃতি ও সাহায্য প্রদানের জন্য ইংল্যান্ডের প্রতি আবেদন জানিয়েছিলেন। হোটেলে সেদিন তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছিলেন ইংল্যান্ডের তদানীন্তন বিরোধী দলের নেতা হ্যারল্ড উইলসন। পরবর্তী সময়ে দেখেছি যে তার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর গড়ে উঠেছিল প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। কমনওয়েলথ সেক্রেটারি জেনারেল আরনল্ড স্মিথও তার সঙ্গে সেদিনই দেখা করেছিলেন। তার কাছে বঙ্গবন্ধু ব্যক্ত করেছিলেন কমনওয়েলথ যোগদানের অভিপ্রায়। এপ্রিল ১৯৭২, বাংলাদেশ কমনওয়েলথের সদস্যপদ লাভ করেছিল।

বঙ্গবন্ধু স্বীকৃতি-ভিক্ষায় কোনো দেশে যাননি কখনো। ১৯৭২ সালে তিনি লন্ডনে তার অস্ত্রোপচারের পর জেনেভায় ছিলেন দ্রুত আরোগ্যের পথে। মিশরের রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত তাকে সেখানে বাংলাদেশে ফেরার পথে কায়রো সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। কিন্তু মিশর তখনো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। তবু সাদাত জানালেন যে কায়রোতে তিনি বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানাবেন আর বাংলাদেশকে তখনই প্রদান করবেন স্বীকৃতি। মনে পড়ে, স্বীকৃতি কামনায় কারো কাছে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যাওয়াকে বঙ্গবন্ধু অশোভন বিবেচনা করেছিলেন। তার শরীরের অবস্থা উল্লেখ করে মিশর সফরের অপারগতা তিনি কূটনৈতিক ভাষায় রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাতকে জানিয়েছিলেন। তার দুই বছর পর ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রপতি সাদাতই প্রথম বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তারপরই গিয়েছিলেন ফিরতি রাষ্ট্রীয় সফরে মিশরে। দেশের সম্মান রক্ষায় আপসহীন ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক শেখ মুজিব।

nলেখক :রাজনৈতিক বিশ্লেষক