গ্রামের নাম মাহমুদাবাদ। নরসিংদীর রায়পুরায় এই গ্রাম। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নীলকুঠি বাসস্ট্যান্ডের উত্তর দিকে একটি কাঁচা মেঠো পথে তিনশ গজ যেতেই চোখে পড়ে একটি চিমনি। কাছে যেতেই একজন বৃদ্ধা দূর থেকে প্রতিবেদককে দেখে এগিয়ে এলেন। পরিচয় জানতে চাইলে বললেন, তার নাম জয়নাল আবেদিন মিস্ত্রি। তার কাছে জানতে চাওয়া হয় চিমনীটির ইতিকথা।
জয়নাল আবেদিন মিস্ত্রি বললেন, এটি নীলকুঠির চিমনি। দুইশ বছর আগে ইংরেজদের কুঠি ছিল এখানে। তারা এখানে নীল আবাদ করত। এখানকার মাটি নীল চাষের জন্য খুব উপযোগী। রায়পুরার বটতলী, মির্জানগর, হাইরমারা, চরসুবুদ্ধি, আগারনগর, মাহমুদাবাদ ও দৌলতকান্দি রেললাইন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় তখন নীল চাষ হতো। পরে এই কুঠির নাম থেকেই এখানে বাসস্ট্যান্ড ও বাজার হয়। নরসিংদী জেলা সদর থেকে ৩৮ কিলোমিটার দূরে এ জায়গা।
মিস্ত্রিবাড়ি
জয়নাল আবেদিন মিস্ত্রি আরও জানালেন, তার পূর্ব পুরুষদের আদি ভূমি ছিল যশোরে। এককালে এখানে কোনো জনবসতি ছিল না। জনমানবহীন জায়গাটিতে তিন ইংরেজ বসতি গড়ে তুলতে মনস্থ করেন। তাদের নাম জিপি ওয়াইজ, ডাব্লিউ ওয়াটস ও জর্জ লেমন। ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে জাহাজ ভিড়িয়ে কুঠি স্থাপন করেন। নীল উৎপাদনের জন্য তাদের দরকার ছিল দক্ষ শ্রমিক। তখন এখানে সে রকম দক্ষ শ্রমিক ছিল না। তাই ইংরেজরা যশোর জেলা থেকে একজন দক্ষ মিস্ত্রি নিয়ে আসেন। তার নাম ছিল মনোহর মিস্ত্রি। তার হাত ধরেই এ অঞ্চলে নীল উৎপাদন শুরু। পরে তিনি এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেই মনোহর মিস্ত্রি থেকেই আজকের এই মিস্ত্রিবাড়ি।
পাতা থেকে নীল
প্রাপ্তবয়স্ক নীলগাছের পাতার অংশবিশেষ কেটে বড়সড় পাত্রে ভিজিয়ে রাখা হতো। তারপর পানি ছেঁকে আরেকটি পাত্রে ঢালা হতো। অনেকক্ষণ পানি নাড়লে নীল রং বেরিয়ে আসে। তারপর চুল্লির আগুনে গরম করলে পানি বাষ্পীভূত হয়ে নীল নিচে জমা হতে থাকে। তখন চিমনি দিয়ে উড়ে যেতো সাদা ধোঁয়া। জয়নাল মিস্ত্রি বললেন, কৃষকরা নীল চাষ করতে চাইতেন না। কিন্তু তারা নীলকরদের থেকে দাদন নিয়ে আটকে যেতেন। কোনো কোনো সময় তারা ঘরবাড়ি ছেড়েও পালাতেন। তখন নীলকররা কৃষকদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিতো। একসময় এখানকার কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে নীল বিদ্রোহ শুরু করেছিলেন। ইংরেজরা তাদের পেছনে লাঠিয়াল বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছিল। কোনো কোনো বিদ্রোহী কৃষককে জ্বলন্ত চুল্লিতে পুড়িয়ে মারার ঘটনাও ঘটেছে।
কুঠির চিমনি
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে আজও নীলচাষের ইতিহাস বহন করে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চিমনিটি। একবারের ভূূমিকম্পে এর খানিকটা দেবে গিয়েছিল। চিমনির উচ্চতা ৭৫ফুট। এটি ইটের তৈরি। প্রস্থ ১০ ফুট। দেওয়াল ২ ফুট পুরু। চিমনির দেওয়ালে অনেক গর্ত। একশর বেশি টিয়া পাখি ঐসব গর্তে বাসা বেঁধেছে। কুঠির দক্ষিণ দিকে পুরনো দালানে বাস করেন আবুল কালাম মিস্ত্রি। তিনি জানান, অযত্ন-অবহেলায় চিমনিটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটি ইতিহাস ধরে রেখেছে। এর সংরক্ষণে সবার সহযোগিতা দরকার।
ইত্তেফাক/এসি
