দুইটি পার্কের একটি সংস্কারাধীন ** আনন্দ বিনোদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ২০ লাখ শিশু!
সৈয়দ আবদুল ওয়াজেদ, চট্টগ্রাম অফিস
চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রায় ২০ লাখ শিশু যাবে কোথায়, এই প্রশ্ন এখন প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। এই মহানগরীতে নামেমাত্র যে দুটি শিশু পার্ক রয়েছে তার একটি এখন দীর্ঘদিনের জীর্ণতার কারণে সংস্কারাধীন। অপরটিতে শিশুদের আনন্দ-বিনোদনের নেই পর্যাপ্ত সুযোগ। সব মিলিয়ে নগরীতে যে ৫/৬টি পার্কের কথা বলা হয়, সেগুলোতেও শিশুদের জন্য নেই পৃথক সুযোগ-সুবিধা। তার ওপর প্রতিটি পার্ক আয়তনে এতই ছোট যে, সেগুলো ৭০ লাখ নগরবাসীর মুক্ত পরিবেশে বিচরণের চাহিদা মেটাতে সক্ষম নয়।
মহানগরীতে বসবাসকারী বিশিষ্টজনরা নগরীতে পর্যাপ্ত শিশু পার্ক না থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ, বাংলাদেশ সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রকৌশলী আলী আশরাফ ইত্তেফাককে বলেন, সত্যিকার অর্থে চট্টগ্রাম মহানগরীতে কোনো শিশু পার্ক নেই। একটি আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় জনসংখ্যা বিবেচনায় প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে শিশু পার্ক থাকা প্রয়োজন। সে অনুসারে এই মহানগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে ৪১টি শিশু পার্ক কিংবা খেলার মাঠ দরকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো এখানে তা নেই। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে সর্বশেষ মাস্টারপ্ল্যান হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। তাতে শিশু পার্ক বলা না হলেও নগরীর বিভিন্ন স্থানে সব বয়েসি মানুষের খোলা বাতাসে ও খোলা আকাশের নীচে বিচরণ ও বিনোদনের সুবিধার জন্য ‘কমিউনিটি রিক্রিয়েশনাল এক্টিভিটিজ’ শিরোনামে কিছু জায়গা চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে। সেসব জায়গায় পার্ক, হাসপাতাল এবং খেলার মাঠ হতে পারত। কিন্তু নগরীর কর্তৃপক্ষ গত ২৫ বছরেও মাস্টাপ্ল্যানের এই নির্দেশনা অনুসরণ করেনি।
চট্টগ্রামের পরিবেশবাদী সংগঠন পিপলস ভয়েসের প্রেসিডেন্ট শরিফ চৌহান ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রামে কোনো কালেই পর্যাপ্ত শিশু পার্ক ছিল না। জাম্বুরি মাঠে যা আছে তা পর্যাপ্ত নয়, তাছাড়া সেটিতে নগরীর সব শিশু যেতে পারে না। নগরীর কাজীর দেউড়িতে পুরানো সার্কিট হাউজের সামনে যে শিশু পার্কটি রয়েছে সেটি খুবই ছোটো। এটির সংস্কার কাজ চলায় এতে শিশুরা যেতে পারছে না। ১৮ বছর বয়স ঊর্ধ্বের তরুণদের খেলাধুলা এবং ক্রিকেট প্র্যাকটিসের একটিমাত্র স্থান ছিল আউটার স্টেডিয়াম। এই মাঠটিরও অর্ধেক দখল করে নেওয়া হয়েছে। বাকি অর্ধেকে সারাবছর চলে নানা ধরনের মেলা। অথচ এসব মেলা এখানে না করে সিআরবির খোলা মাঠেও করা যায়। নগরীর প্রাণকেন্দ্রে মেলা করতে হবে এমনতো কোনো কথা নেই। কাজেই নগরীর নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যত্ নিয়ে যারা ভাবে না তাদেরকে আমরা আধুনিক মানুষ বলতে পারি না। তিনি বলেন, নগরীতে একদিকে উন্নয়ন অন্যদিকে জায়গা দখলের চলমান প্রক্রিয়ায় শিশু পার্ক করার আর জায়গা নেই।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামসুজ্জোহা ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে মূলত দুটি শিশু পার্ক রয়েছে। একটি কাজির দেউরিতে, অন্যটি আগ্রাবাদের জাম্বুরি ময়দানে। ২৫ বছর হয়ে যাওয়ায় কাজির দেউরি শিশু পার্কটিকে যুগোপযোগী করে তোলার লক্ষ্যে সংস্কার চলছে, নতুন করে সাজানো হচ্ছে। অন্যদিকে জাম্বুরি মাঠে গণপূর্ত বিভাগের উলটোদিকে রয়েছে সিটি করপোরেশন পরিচালিত আরেকটি শিশু পার্ক। এর প্রতিষ্ঠাকাল ২৩/২৪ বছর হয়ে যাওয়ায় এটিকেও যুগোপযোগী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ষোলশহর বিপ্লব উদ্যানের সংস্কার কাজ শেষে সম্প্রতি সেটি নতুন আঙ্গিকে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এখানে শিশুদের জন্য প্লে-কর্নার রাখা হয়েছে। বিপ্লব উদ্যানে সবুজ লতাগুল্ম আচ্ছাদিত চারটি শেড ৫/৬ মাসের মধ্যেই সৌন্দর্য নিয়ে প্রকাশিত হবে।
এছাড়া মুজিববর্ষের আলোকে সিটি করপোরেশন নগরীর সবুজায়ন, সৌন্দর্যায়ন এবং আলোকায়নে অনেকদূর অগ্রসর হয়েছে। দৃষ্টিনন্দন করা হয়েছে মিড আইল্যান্ডগুলোকে। জাতিসংঘ পার্কটি সিটি করপোরেশনের অধীনে রয়েছে। কিছু জটিলতা রয়েছে এই পার্কটিকে ঘিরে গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে। তবে এটিও সর্বসাধারণের স্বার্থে উন্মুক্ত হবে। তিনি বলেন, বহদ্দারহাটের স্বাধীনতা পার্কটি একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। এটি সিটি করপোরেশন পরিচালনা করেছিল ৫ বছর। এই পার্কটি মূলত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরিচালনাধীন।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অথারাইজেশন অফিসার-১ মনজুর হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, সিডিএর পরিচালনায় নগরীর ৫টি পার্কের মধ্যে কোনোটিই নেই। তবে সিডিএ পতেঙ্গায় একটি বাটারফ্লাই পার্ক করেছিল ২০০৭-৮ সালের দিকে। একটি বেসরকারি সংস্থাকে দেওয়া হয়েছিল সেটি পরিচালনার দায়িত্ব। বর্তমানে এটি পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। তা নিরসনের চেষ্টা চলছে।
