ফেব্রুয়ারির দুটি সপ্তাহ ধরে চলছিল একুশে ফেব্রুয়ারির প্রস্তুতি। অলি আহাদের ভাষ্য মতে, সরকার একুশে ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশন আহ্বান করেছিলেন। একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল ঐ অধিবেশনে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের তরফ থেকে এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
একুশ ফেব্রুয়ারির আগে সভা ও মিছিলগুলোর কারণে কেবল ছাত্রদের মধ্যে নয়, সাধারণ মানুষের মনেও সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছিল। সবাই প্রতিরোধ ও সংগ্রামের প্রত্যক্ষ কর্মসূচিই প্রত্যাশা করছিলেন। এরকম অবস্থায় পূর্ববঙ্গ সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে সমাবেশ ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করে দেন।
সরকারি এক নির্দেশে বলা হয়, ‘ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ১৪৪ ধারার আদেশ জারি করিয়া এক মাসের জন্য ঢাকা শহরে সভা, শোভাযাত্রা প্রভৃতি নিষিদ্ধ করিয়াছেন। আদেশ জারির কারণ সম্পর্কে বলা হয়, একদল লোক শহরে সভা, শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের প্রয়াস পাওয়ায় এবং তদ্বারা জনসাধারণের শান্তি ও নিরাপত্তা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকায় এ ব্যবস্থা অবলম্বিত হইয়াছে। কোতোয়ালি, সূত্রাপুর, লালবাগ, রমনা ও তেজগাঁও থানার অন্তর্গত সমুদয় এলাকায় ইহা প্রবর্তিত হইয়াছে।
জনমনে ভীতি ও ত্রাস সঞ্চারের চিরাচরিত পন্থাই সরকার গ্রহণ করেছিল। ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১৪৪ ধারা জারি করার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সরকার একটি গুজবও ছড়িয়ে দেন যে হাসপাতালে নাকি অনেক শয্যাও খালি করা হয়েছে, যাতে একুশে ফেব্রুয়ারি শান্তিভঙ্গের কারণে যারা আহত হবেন তাদের ভর্তি করা যায়।
অলি আহাদ তখন একটি কথাও উল্লেখ করেছিলেন যে, জহুর হোসেন চৌধুরী তখন মুসলিম লীগের বাংলা মুখপত্র ‘দৈনিক সংবাদ’ এর যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। সেই সূত্রে সরকারি মহলে তার যোগাযোগ ছিল ভালো। একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে সরকারের মনোভাব যে কঠোর ছিল তা তিনি জানতেন। অলি আহাদকে তিনি খুব স্নেহ করতেন। একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখটি যত এগিয়ে আসছিল জহুর হোসেন চৌধুরী ততই তাদের আইন ভঙ্গ করার চিন্তা বাদ দিতে বলছিলেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি তার বাসায় তিনি অলি আহাদকে জানান, আন্দোলন দমন করতে সরকার প্রয়োজনে সেনাবাহিনী তলব করবে, ট্যাংক ব্যবহার করবে। অলি আহাদ সেদিন উত্তরে বলেছিলেন, ‘দাসত্বের চেয়ে মৃত্যু ভালো।’
ইতিহাসের শিক্ষাও তাই। মানবজাতির ইতিহাস এটা বারবার দেখেছে যে, নিরস্ত্র সংঘবদ্ধ মানুষের কাছে রাষ্ট্রবাহিনী পরাভব স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
জহুর হোসেন চৌধুরী রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। তিনি আশঙ্কা করছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের দমন করতে গিয়ে সরকার হয়তো গণতন্ত্রের আন্দোলনকেই দমন করে ফেলতে পারে। কিন্তু তা যে সম্ভব হয়নি ইতিহাসই তার সাক্ষী।

