করোনা মহামারিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামাজিক বিপর্যয় বলে আখ্যায়িত করেছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান। একটি অদৃশ্য ভাইরাস স্তম্ভিত করে দিয়েছে সমগ্র মানবজাতিকে। স্থবির হয়ে গেছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। শ্লথ হয়ে গেছে বিশ্ব অর্থনীতি। প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা জনগণকে নিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মোকাবিলায় উদ্বিগ্ন। মহাপরাক্রমশালী দেশগুলোও হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে এই সমস্যা মোকাবিলায়। দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল।
এই মহাদুর্যোগের দিনে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংকট মোকাবিলার জন্য যে অসীম ধৈর্য, সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। জাতির উদ্দেশে তার ভাষণে শুনিয়েছে আশার বাণী, দিয়েছেন দিক নির্দেশনা ও আমাদের করণীয় ঘোষণা করেছেন। দুর্যোগ মোকাবিলায় সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধা প্যাকেজ।
করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব উত্তরণে নতুন করে ৬৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে তৈরি পোশাক খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। নতুন চারটিসহ পাঁচটি প্যাকেজে আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৫২ শতাংশ।
প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সমাজের প্রায় সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ অন্তর্ভুক্ত হলেও শিক্ষাখাত এখনো তার বাইরে রয়ে গেছে। শিক্ষা মানুষের অন্যতম মৌলিক মানবিক চাহিদা। শিক্ষাকে বলা হয় জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষাই মানব সংস্কৃতির বিকাশ এবং সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই খাতটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
করোনা মহামারির ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশে এখন ‘লকডাউন’ চলছে। অফিস, আদালত, সরকারি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবকিছুর ছুটির মেয়াদ তৃতীয়বারের মতো বৃদ্ধি করা হয়েছে। করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষার জন্য সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী গত ১৭ মার্চ থেকে বাংলাদেশের অর্ধলক্ষাধিক বেসরকারি স্কুলগুলোও বন্ধ রয়েছে। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রায় সকল বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বর্তমানে আমাদের কোমলমতি শিশুরা তাদের বাসার চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। স্কুলের মুক্ত পরিবেশে ছুটে বেড়ানোর ফুরসত তাদের নেই। এই সীমাবদ্ধতা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য ইতিবাচক নয়, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাই বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে তাদের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সহায়তা নিয়ে বিরতিহীন চালিয়ে যাচ্ছে এবং দূর-দূরন্তে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের প্রায় শতাংশ এই অনলাইন কার্যক্রমে রয়েছে। সরকারি কোনো সাহায্যা ছাড়া ছাত্র-ছাত্রীর মাসিক ফি থেকে বেসরকারি স্কুলগুলো পরিচালিত হয়। ৯৯ শতাংশ ভাড়া বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলোর মাসিক সম্পূর্ণ আয়ের ৩০ শতাংশ ঘর ভাড়া, ৫০ শতাংশ সম্মানিত শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা, বাকি ২০ শতাংশ বা তারও বেশি গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়ে যায়। অনেক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ভর্তুকি দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। স্কুল বন্ধ থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের উৎস ছাত্র-ছাত্রী থেকে মাসিক ফি আদায় করতে পারছে না। এ কারণে স্কুল কর্তৃপক্ষরা শিক্ষকদের মাসিক বেতন দিতে পারছে না বা উদ্যোক্তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী পুরো বেতনের কোনো একটা অংশ প্রদান করছে। বেতন না পেয়ে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্দশাগ্রস্ত। পাশাপাশি অর্থনৈতিক মহা সংকটে পড়ে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ আজ দিশেহারা!
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলসহ সকল বেসরকারি স্কুলগুলো শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখছে এবং সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে সরকারের। সময়োপযোগী ও মানসম্মত শিক্ষার পাশাপাশি দেশের বেকার সমস্যা দুরীকরণে ৪০ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এই বেসরকারি শিক্ষাখাত। দেশে অর্ধ-লক্ষাধিক ইংলিশ মিডিয়ামসহ বেসরকারি স্কুলে শিক্ষাগ্রহণ করছে দুই কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী। বিশেষ করে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো মানসম্মত এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে মেধাবী, কর্মঠ ও আত্মবিশ্বাসী শিক্ষকদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে এবং তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী উচ্চ বেতন প্রদান করে পাঠদান অব্যাহত রেখে চলেছে। শিক্ষা সেক্টরে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো স্ব-উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এবং বাংলাদেশ সরকারের সকল নির্দেশনা ও ব্রিটিশ কাউঞ্চিল, ক্যামব্রিজ, এডেক্সেল পিয়ারসন সিলেবাস ও পরামর্শে পরিচালিত হয়। ইতিমধ্যে ইংলিশ মিডিয়ামে বিশ্বের সর্বজন গৃহীত ও সমাদৃত ব্রিটিশ কারিকুলামে পড়ে আমাদের অনেক ছাত্রছাত্রীরা দেশের মুখ উজ্জ্বল করছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখা ও নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলসহ অন্য বেসরকারি স্কুলগুলো কখনোই কোনো সরকারি অনুদান পায় না বা পাওয়ার আবেদনও করে না। কিন্তু বর্তমানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে পুরো বিশ্ব যখন দিশেহারা, দেশের অর্থনীতির টালামটাল অবস্থা। ঠিক এই দুঃসময় নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত ইংলিশ মিডিয়ামসহ অন্য বেসরকারি স্কুলগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে লাখ লাখ বেকার হয়ে পড়ার বিরাট আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ আছে। আর কতদিন বন্ধ থাকবে সেটাও সবার অজানা। এর মধ্যে সামনে সমাগত মাহে রমজান এবং পবিত্র ঈদুল ফিতর। দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মকে মানুষ বানানোর গুরু দায়িত্ব পালন করা স্কুলগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীরা আজ দুর্দশাগ্রস্ত। আশঙ্কা করছি যতই দিন যাবে ততই দেশে বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপকতর সংকটে নিপতিত হবে। এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রেখে এখনই ইংলিশ মিডিয়ামসহ সকল বেসরকারি বেসরকারি স্কুলগুলোর জন্যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা প্রয়োজন। আশা করছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মানবজাতির মৌলিক চাহিদার অন্যতম এই শিক্ষাখাতের বর্তমান আর্থিক সংকট ও ভবিষ্যতের ঘনায়মান আর্থিক দুরবস্থা বিবেচনা করে অতি দ্রুত কোনো না কোনো ধরনের আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করবেন।
লেখক: মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও হেড অব স্কুল, এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল।
ইত্তেফাক/বিএএফ

